এক টুকরা পিৎজার ভেতর লুকিয়ে থাকা ইতিহাস
গরম ধোঁয়া ওঠা এক টুকরা পিৎজা সামনে এলেই কার না ভালো লাগে। গলে যাওয়া চিজ, টক-মিষ্টি টমেটো সস, আর ওপরে ছড়িয়ে থাকা নানা টপিং, মুখে তুললেই স্বাদের আর কমতি নেই। আগে এটি শুধু শহরের দোকানগুলোয় দেখা যেত। এখন শহর-গ্রাম সব জায়গায় পিৎজা জনপ্রিয়। দেখে মনে হবে, এটি বুঝি আমরা কতকাল ধরে খাচ্ছি। অথচ এই পিৎজার ভেতর লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস। নানা সভ্যতার মধ্য দিয়ে আমাদের হাতে এসেছে এই খাবার।
সময়টা হাজার বছর আগের। ইতালির নেপলস শহরের সরু গলি, ব্যস্ত রাস্তার পাশে ছোট ছোট চুল্লিতে ভাজা হচ্ছে পাতলা রুটি। সেখানেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে আধুনিক পিৎজা। তবে গল্পটা শুধু নেপলসেই থেমে নেই। আরও অনেক আগে মেসোপটেমিয়া, ইজিপ্ট, পার্সিয়া আর গ্রিসের মানুষও রুটির ওপর নানা উপকরণ দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছিল। কোনো সভ্যতা থেকে এসেছে পাতলা রুটি বানানোর কৌশল। কেউ দিয়েছে ইস্ট দিয়ে খামির কীভাবে ফোলাবে তার বুদ্ধি। আবার কেউ যোগ করেছে টপিংয়ের মজা। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে একটু একটু করে তৈরি হয়েছে আজকের পিৎজা।
‘পিৎজা’ নামটাও বেশ রহস্যময়। ৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ইতালির গেটা শহরের এক লাতিন নথিতে প্রথম এই শব্দের দেখা মেলে। কেউ বলেন, এটি এসেছে ‘পিনসা’ থেকে, যার মানে চ্যাপটা রুটি। আবার কেউ বলেন, ‘বিজ্জো’, মানে এক কামড় খাবার থেকে। নাম যেখান থেকেই আসুক, স্বাদের গল্প কিন্তু তখনই শুরু হয়ে গেছে।
অবাক করা বিষয় হলো, আজকের পিৎজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান টমেটো কিন্তু শুরুতে ছিলই না! কলোম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের আগে ইউরোপের মানুষ টমেটো চিনত না। তখন পিৎজা তৈরি হতো রসুন, চিজ, লবণ আর চর্বি দিয়ে। অনেকটা সাদামাটা, কিন্তু তাতেই ছিল একধরনের স্বাদ। পরে অষ্টাদশ শতাব্দীতে নেপলসের গরিব মানুষেরা প্রথম পিৎজায় টমেটো যোগ করল। আর সেই ছোট্ট পরিবর্তনই বদলে দিল পুরো ইতিহাস।
একসময় পিৎজা ছিল একেবারেই রাস্তার খাবার। নেপলসের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষ গরম–গরম পিৎজা কিনে বাড়ি নিয়ে যেত। কিন্তু ১৮৩০ সালে যখন ইতালির নেপলসে অবস্থিত বিশ্বের প্রাচীনতম পিৎজারিয়া ‘অ্যানটিকা পিজেরিয়া পোর্টালবার’ দরজা খুলল, তখন পিৎজা খাওয়ার অভিজ্ঞতাই বদলে গেল। টেবিলে বসে, গল্প করতে করতে পিৎজা খাওয়ার নতুন সংস্কৃতি শুরু হলো।
এরপর এল সেই বিখ্যাত ঘটনা ঘটল, যা পিৎজাকে সাধারণ মানুষের খাবার থেকে রাজকীয় মর্যাদায় তুলে আনল। ১৮৮৯ সালে ইতালির রানি মার্ঘেরিতা অব সেভয় নেপলস ভ্রমণে এলেন। তিনি চাইলেন স্থানীয় খাবার খেতে। তখন বিখ্যাত পিৎজা নির্মাতা রাফায়েল এসপোসিতো তাঁর জন্য তৈরি করলেন তিন ধরনের পিৎজা।
একটি পিৎজায় ছিল টমেটো, মোজারেলা চিজ আর বেসিলপাতা, যার রং লাল, সাদা আর সবুজ। ঠিক ইতালির পতাকার রঙের মতো! রানি সেই পিৎজা খেয়ে এত মুগ্ধ হলেন যে এর নামেই রাখা হলো ‘মার্গারিটা পিৎজা’। সেই মুহূর্ত থেকে পিৎজা আর শুধু গরিবের খাবার রইল না, হয়ে উঠল রাজকীয় স্বাদের প্রতীক।
সময়ের সঙ্গে পিৎজা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বে। এখন নিউইয়র্ক থেকে ঢাকা—সব জায়গাতেই পিৎজার নিজস্ব স্টাইল তৈরি হয়েছে। কোথাও মোটা ক্রাস্ট, কোথাও পাতলা; কোথাও মাংসের ভরপুর আয়োজন, আবার কোথাও নিরামিষ স্বাদের পিৎজা পাবে তুমি।
এই দীর্ঘ যাত্রার স্বীকৃতিও মিলেছে। ২০১৭ সালে ইউনেসকো নেপলসের ঐতিহ্যবাহী পিৎজা তৈরির শিল্পকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।