ড্রোন দিয়ে হারিয়ে যাওয়া পোষা প্রাণী উদ্ধার করে দেন যিনি

যুক্তরাষ্ট্রের মানাসকোয়ানভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘ইউএসএআর ড্রোন টিম’–এর প্রতিষ্ঠাতা ৬৪ বছর বয়সী মাইকেল পারজিয়ালনিউইয়র্ক পোস্ট

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির একটি শহর জার্সি শোর। সেখানের এক রেস্তোরাঁমালিক হারিয়ে যাওয়া পোষা প্রাণী খুঁজে দিতে দারুণ এক উদ্যোগ নিয়েছেন। কুকুর ও বিড়াল, এমনকি একটি হারিয়ে যাওয়া গরুও উদ্ধার করে দিয়েছেন তিনি। এই কাজের জন্য ১৮টি আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের মানাসকোয়ানভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘ইউএসএআর ড্রোন টিম’–এর প্রতিষ্ঠাতা ৬৪ বছর বয়সী মাইকেল পারজিয়াল। গত দুই বছরে নিউ জার্সিজুড়ে হারিয়ে যাওয়া ১২২টি প্রাণীকে উদ্ধার করেছেন তিনি।

এই কাজের পেছনের কারণ জানিয়ে মাইকেল পারজিয়াল বলেন, ‘আমার বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আর দুই দাদা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়েছিলেন। তাঁদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতেই আমি এই উদ্যোগ নিয়েছি। দেশের প্রবীণ যোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর এটিই আমার নিজস্ব উপায়।’

মাইকেল পারজিয়াল আরও জানান, ‘আমরা বিনা মূল্যে প্রবীণ সামরিক যোদ্ধাদের ড্রোন চালানোর পেশাদারি প্রশিক্ষণ দিই। আর এই প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই হারিয়ে যাওয়া পোষা প্রাণী উদ্ধারের কাজ করা হয়। এখান থেকে কাজ শিখে তাঁরা পরে আকাশপথে তথ্য সংগ্রহ, কৃষিকাজে ওষুধ ছিটানো, ছবি তোলা, ভবন পরিদর্শন ও উদ্ধারকাজের মতো বিভিন্ন পেশায় যোগ দিতে পারেন।’

আরও পড়ুন

জার্সি শোর কাছাকাছি টমস রিভার এলাকায় তিন দিন ধরে নিখোঁজ থাকা এক মানসিক প্রতিবন্ধী মানুষকে খুঁজে পেতে সাহায্য করার পরই পারজিয়ালের মাথায় এই ড্রোন টিমের ভাবনাটি আসে।

পারজিয়াল সেই ঘটনার কথা মনে করে বলেন, ‘এক ব্যক্তি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন সেই মানুষকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে। আমি মাত্র ১ ঘণ্টা ১৮ মিনিটের মধ্যেই তাঁকে একটি জলাভূমিতে খুঁজে পাই। তীব্র ঠান্ডায় তাঁর শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়েছিল। আর কয়েক ঘণ্টা দেরি হলে হয়তো তিনি মারা যেতেন।’

গত দুই বছরে নিউ জার্সিজুড়ে হারিয়ে যাওয়া ১২২টি প্রাণীকে উদ্ধার করেছেন
নিউইয়র্ক পোস্ট

এ ঘটনার কিছুদিন পর একজন পারজিয়ালকে তাঁর হারিয়ে যাওয়া পোষা প্রাণী খুঁজে দেওয়ার অনুরোধ জানান। সেই অভিযানে সফল হওয়ার পরই তিনি চারপেয়ে এই পোষা প্রাণীদের খুঁজে বের করার কাজে নজর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

পারজিয়াল জানান, ‘ধীরে ধীরে আমাদের পুরো কাজটিই প্রাণীদের ঘিরে গড়ে ওঠে। কারণ, আমি এই কাজে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছিলাম।’ তাঁর এই অলাভজনক সংস্থার সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজও দ্রুত বাড়তে থাকে।

পারজিয়াল একজন পেশাদার ও অনুমোদিত ড্রোন পাইলট। ‘গো–ফান্ড–মি’ নামের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আসা অনুদান থেকে তিনি বয়স্ক মানুষের হারিয়ে যাওয়া পোষা প্রাণী খোঁজার খরচ জোগান। কারণ, অনেক সময় এই প্রিয় প্রাণীরাই তাঁদের একমাত্র সঙ্গী হয়ে থাকে। পুরো বিষয়টিই তিনি জনসেবা হিসেবে করেন। পারজিয়াল বলেন, মানুষের দেওয়া প্রতিটি টাকা এই উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা হয়।

পারজিয়ালের দুই ছেলে। ২৭ বছর বয়সী মাইকেল জন ও ১৭ বছর বয়সী জোনাথন এবং পাঁচ–ছয়জনের একটি স্বেচ্ছাসেবক দল নিয়ে কাজ পরিচালনা করেন। তিনি জানান, হারিয়ে যাওয়া প্রিয় পোষা প্রাণীকে ফিরে পাওয়ার পর মালিকদের চোখে আনন্দের কান্না দেখা যায়।

উদ্ধার করা এক প্রাণীর মালিকের কথা মনে করে পারজিয়াল বলেন, ‘এক নারী তো খুশিতে আমার কাঁধে মাথা রেখে এত কান্না করেছিলেন যে আমার শার্ট ভিজে গিয়েছিল। এই মানুষগুলোর কাছে পোষা প্রাণী আসলে নিজের সন্তানের মতোই।’

আরও পড়ুন

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জিনা মানফ্রেডি নামের এক নারীর পাঁচ মাস বয়সী কুকুরছানা হারিয়ে যায়। ‘শেড’ নামের কুকুরছানাটিকে নিয়ে রাতে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ একটা শব্দে ভয় পেয়ে কুকুরছানাটি অন্ধকারের মধ্যে দৌড়ে পালিয়ে যায়। জিনা জানান, চারপাশ দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসছিল। তীব্র বাতাস আর বরফ পড়ার কারণে বেশ ঠান্ডা ছিল।

এই কাজের জন্য ১৮টি আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করেন তিনি
নিউইয়র্ক পোস্ট

২৪ ঘণ্টা ধরে খোঁজাখুঁজির পর জিনা প্রায় দিশাহারা হয়ে পড়েন। তখন একজন তাঁকে এই ড্রোন টিমের কথা জানান। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মাইকেল পারজিয়ালকে ফোন করেন। পারজিয়াল দ্রুত তাঁর বাড়ি পৌঁছান এবং মাত্র ৪১ মিনিটের মধ্যে ড্রোন দিয়ে শেডকে খুঁজে বের করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিনা লেখেন, ‘যাঁদের পেশাদার ড্রোনচালক ভাড়া করার ক্ষমতা নেই, মাইকেল তাঁর সময় ও দক্ষতা দিয়ে তাঁদের সাহায্য করেন। এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে এখনো খারাপের চেয়ে ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি।’

কোথাও কোনো পোষা প্রাণী হারিয়ে গেছে জানলেই পারজিয়াল ছুটে যান নিউ জার্সির যেকোনো প্রান্তে। তিনি জানান, ‘আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় আধা মাইল দূর থেকেই ড্রোন উড়িয়ে দিই। কারিগরি দিক থেকে আমাদের ড্রোনগুলো ২১ হাজার ফুট ওপর পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে সরকারি নিয়ম মেনে আমরা মাটি থেকে ৪০০ ফুট ওপরে ড্রোন দিয়ে নজরদারি চালাই।’

৪৫ বছর ধরে প্রাইভেট পাইলট হিসেবে কাজ করা পারজিয়াল শুধু পোষা প্রাণীই খোঁজেন না; যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও সাহায্য করতে ছুটে যান। ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের সময়েও তিনি বিশেষ ড্রোনের সাহায্যে ওপর থেকে বন্যা বা ভূমিধস–কবলিত এলাকা শনাক্ত করতে উদ্ধারকারী কর্মীদের সাহায্য করেন।

সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট
আরও পড়ুন