হৃৎপিণ্ডের প্রতীক এল কোথা থেকে, দেখতে এটি হৃৎপিণ্ডের মতো নয় কেন
ছোট শিশুদের যদি বলা হয় একটা হার্ট বা হৃদয় এঁকে দেখাতে, তারা ঝটপট খাতা-কলম নিয়ে সেই চেনা প্রতীকের ছবি এঁকে দেখায়। চারপাশে সব জায়গায় এই ছবি দেখেই তারা শেখে। তবে আরেকটু বড় হয়ে স্কুলের বিজ্ঞান বইয়ে দেখে আসল হার্ট দেখতে কেমন। এটি মোটেও ওই ছবির মতো নয়। বরং পেশিবহুল ও জটিল এক মাংসপিণ্ড। তারপরও আসল হৃৎপিণ্ডকে না দেখিয়ে আমরা কেন এই বিশেষ কাল্পনিক আকৃতি ব্যবহার করে থাকি? আর কোত্থেকেই বা এল এই অদ্ভুত প্রতীকের প্রচলন?
এই প্রচলিত প্রতীকটি ঠিক কোত্থেকে এসেছে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে নতুন এক গবেষণায় গবেষকেরা এর পেছনের ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করেছেন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের হাত ধরেই মূলত হৃৎপিণ্ডের অদ্ভুত বর্ণনার সূচনা হয়। বিশেষ করে দার্শনিক অ্যারিস্টটলকেই এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ভাবা যায়। গবেষণাটি ‘জার্নাল অব ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন ইন মেডিসিন’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
ডাচ নিউরোসার্জন ও লেখক পিয়েরে ভিঙ্কেনের মতে, হৃৎপিণ্ডের ওই পরিচিত আকৃতির প্রাচীনতম ছবি পাওয়া যায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি নথিতে। মনে করা হয়, অ্যারিস্টটলের দেওয়া বর্ণনার ওপর ভিত্তি করেই তৎকালীন শিল্পীরা ওই আকৃতিটি একেঁছিলেন। আবার অন্য এক মতে, এটি মূলত ‘সিলফিয়াম’ নামের এক বিলুপ্ত উদ্ভিদের পাতার রূপ। উত্তর আফ্রিকার উপকূলে জন্মানো মৌরি-জাতীয় এ গাছটি চিকিৎসা ও নানা কাজে ব্যবহার করত প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা।
এ প্রতীকটি কীভাবে প্রথম চালু হয়েছিল, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও গবেষণার লেখকেরা স্পষ্ট করে বলেছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, হৃৎপিণ্ডের বহুল পরিচিত এই প্রতীকটির সঙ্গে আসল মানব হৃৎপিণ্ডের গঠনের কোনো মিল নেই। তবে এটি নিয়ে কেউ ভাবেন না, কারণ এই চিত্রটি মূলত আবেগ ও স্নেহের প্রতীক হিসেবেই সবাই ব্যবহার করেন।
তবে ১৫ ও ১৬ শতকে জনপ্রিয় হওয়া এই প্রতীকের পেছনে যে চমৎকার এক বৈজ্ঞানিক সত্য লুকিয়ে আছে, তা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের আগে বিজ্ঞানীরাও টের পাননি। ১৯৫০-এর দশকে চিকিৎসকেরা হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির বা করোনারি ধমনিতন্ত্রের মডেল তৈরির জন্য মৃত মানুষের মহাধমনিতে বিশেষ প্লাস্টিক প্রবেশ করান। সেই প্লাস্টিকের ছাঁচ শুকিয়ে বের করার পর দেখা গেল, তা দেখতে আশ্চর্যজনকভাবে হৃৎপিণ্ডের সেই কাল্পনিক প্রতীকের মতোই।
এর কয়েক দশক পর করোনারি ধমনিতে বিশেষ রঞ্জক বা ‘ডাই’ ব্যবহার করে এক্স-রে বা পরীক্ষার নতুন পদ্ধতি চালু হয়। এর মাধ্যমে জানা যায় প্রথাগত প্রতীকটি আসলে কতটা নিখুঁত।
গবেষকেরা জানান, হৃৎপিণ্ডের ডান ও বাম উভয় ধমনিতে একসঙ্গে রঞ্জক পদার্থ পাঠালে রক্তপ্রবাহের পুরো চিত্রটি ফুটে ওঠে। রক্তনালির এই শাখা-প্রশাখাগুলোর সম্মিলিত দৃশ্য আর আমাদের চেনা হৃৎপিণ্ডের প্রতীকের আকৃতি হুবহু এক।
এই পর্যবেক্ষণগুলো দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, প্রাচীনকালের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা কি আধুনিক বিজ্ঞান আবিষ্কার করার হাজার বছর আগেই রক্তনালির এই নকশার কথা টের পেয়েছিলেন? এই সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে গিয়ে গবেষণার লেখকেরা অনুমান করছেন, সেই প্রাচীন পণ্ডিতেরা হয়তো প্লাস্টিকের বদলে প্লাস্টার বা অন্য কোনো প্রাথমিক উপাদান ব্যবহার করে মৃতদেহের হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির ছাঁচ তৈরি করে দেখেছিলেন।
তাঁদের এই তত্ত্বটি যে কেবলই এক অনুমান, তা গবেষকেরা স্বীকার করেছেন। তবে তাঁদের মতে, প্রাচীন আমলের সেই হৃৎপিণ্ডের প্রতীকের সঙ্গে আধুনিক রক্তনালির ছবির অদ্ভুত মিলের ব্যাখ্যা দিতে এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত যুক্তি হতে পারে।