দুটাকার পাখি

দোয়েলছবি: আবদুল গাফফার

নব্বইয়ের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত আমরা। কায়মনোবাক্যে হয়তো বেড়ে উঠেছি, কিন্তু এখনো ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে আমি টুকরো টুকরো ছেলেবেলা নিয়ে ঘুরি। আমার গ্রাম, ছোট্ট ইছামতী, মাঠ, জঙ্গল, ফুল আর পাখিরা আমার পিছু পিছু ঘোরে। মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াই। এক লহমায় ফিরে যাই নব্বই দশকের ছেলেবেলায়। সে ছেলেবেলা কত রঙিন! দুঃখ নেই, অভাব নেই, অল্পতেই কত তুষ্ট হতাম। সবকিছুতেই তখন বিস্ময়! মাঠের পানি হুড়মুড়িয়ে খাল বেয়ে নদীতে নামছে, তাতে বিস্ময়। একটা পাখি লেজ উঁচু করে ডাকছে, তাতেও বিস্ময়। বিস্ময় এক টাকার কিংবা দুই টাকার ছবিতেও। এসব ছবি তখন দেখে মনে হতো, এগুলো কি হাতে আঁকা? যাঁরা আঁকেন তাঁরা কি আমাদের মতো রক্ত-মাংসের মানুষ! এক, দুই, পাঁচ, দশ, বিশ, পঞ্চাশ, এক শ ও পাঁচ শ—সাকল্যে আটটি কাগুজে টাকার চল ছিল তখন। সবগুলোই সুন্দর। সবচেয়ে বেশি সুন্দর দুটাকার নোটটা। একটা সাদা–কালো পাখি মোহময়ী ভঙ্গিতে বসে আছে একটা চিকন ডালে। লেজ উঁচু করে। যেন এক্ষুনি উড়ে পালাবে। তখন দুটাকারও দাম ছিল। আর ছেলেমানুষের কাছে দুটাকা মানে অনেক টাকা। মা স্কুলের টিফিনের জন্য চার আনা পয়সা দিতেন। দিনেরটা দিনেই শেষ। তাই দুটাকা হাতে পাওয়া অত সহজ ছিল না। কালেভদ্রে যখন হাতে পেতাম, তন্ময় হয়ে দেখতাম পাখিটা।

আরও পড়ুন
পুরোনো দুটাকার নোট
ছবি: সংগৃহীত

ভাবতাম, এই টাকা বুঝি আমাকেই মুগ্ধ করে। বহু বছর পরে শুনি, দুটাকার এই নোট নাকি বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর নোট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু এটা ছিল গুজব। এ ধরনের কোনো স্বীকৃতি দুটাকা পায়নি। তা না পাক, আমার কাছে এটা বিশ্বের সেরা নোট। আর নোটের পাখিটা হলো আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল। দোয়েলের ডাক ভারি মিষ্টি। টুইট টুইট করে লম্বা যে শিস দেয়, একবার এই গান যে শুনেছে আজীবনের জন্য মনে গেঁথে যাবে তার। দোয়েল অতি পরিচিত পাখি; হাটে, মাঠে, ঘাটে, এমনকি শহরেও এর দেখা মেলে খুব সহজে। সাদা–কালো পাখি। কিন্তু কেন জানি বাংলাদেশের প্রতিটি সাদা–কালো পাখিই অনেক রঙিন পাখির তুলনায় সুন্দর। অতি পরিচিত পাখি, তবু একটা অপূর্ণতা ছিল। এই পাখির ছবি তোলা হয়নি। অথচ ১১ বছর ধরে আমি পাখির ছবি তুলছি। ঘরের খুব কাছেই পাওয়া যায় বলেই হয়তো তোলা হয়নি। এবার গ্রীষ্ম আর বর্ষা পুরোটা জুড়ে গ্রামের বাড়িতে দিন কাটছে আমার। মাঝেমধ্যে ছবি তুলতে বেরোই। পাখি, বন্য প্রাণী, ফুল—যেটা চোখে পড়ে, ক্লিক ক্লিক।

আরও পড়ুন
ছবি: আবদুল গাফফার

বাড়ির পাশেই একটা পরিত্যক্ত জমি আছে। সেখানে রাজ্যের ঝোপঝাড় হয়—শিয়ালকাঁটা, হাতিশুঁড়, কচা, আসশেওড়া, ভাঁটঝোপের জঞ্জাল। ছোট-বড় কয়েকটা পিটুলিগাছও আছে। একদিন সেখানেই গেলাম ছবি তুলতে। বড় পিটুলিগাছে একটা ফটিকজল পাখি দেখেছি। বাসা বাঁধার জন্য খড়কুটো জড়ো করছে। ছবি তুললামও বটে। ঠিক তখন, ছোট্ট একটা পিটুলিগাছের ডালে দেখলাম একটা দোয়েল নেচে বেড়াচ্ছে। মস্তিষ্ক মনে করিয়ে দিল, তোমার কাছে দোয়েলের খুব ভালো ছবি নেই। হাতে ৬০০ মিলিমিটারের টেলিফটো লেন্স। এ সুযোগ কি মিস করা যায়! একের পর এক ক্লিক করে চলেছি। ঠিক তখন মনে হলো, আরে দুটাকার ওই দোয়েলের মতো করে পোজ দেওয়া একটা ছবি নিতে পারতাম! উপায় একটাই। ক্যামেরার শাটার বাটন চেপে ধরে রাখতে হবে। সেকেন্ডে ৭টা করে ছবি ক্যাপচার করতে পারে আমার ক্যামেরা। কিন্তু দোয়েলের ভঙ্গি বদলের গতি এর চেয়েও দ্রুত। তবু চেষ্টা করে দেখা যাক।

ছবি: আবদুল গাফফার

ছবি উঠল। মনে হলো কিছু ছবি টাকার ছবির সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। কিন্তু কাছে তখন দুটাকার নোট নেই। তাই একদম পাই টু পাই পোজের হলো কি না মনে করতে পারছিলাম না। পরে ছবি আর টাকা মিলিয়ে দেখলাম। অসংখ্য ছবির মধ্যে কোনোটাই দুটাকার নোটের মতো হুবহু হয়নি। কিন্তু পোজের কাছাকাছি কিছু হয়েছে, এতেই আমি সন্তুষ্ট। দোয়েলের পোজ দুটাকার সঙ্গে কতটা মিলল, তুমিই না হয় মিলিয়ে দেখো! এই ফাঁকে একটা কথা বলে যাই, বাংলাদেশের দুটাকার সেই সুন্দর নোটটা প্রথম বাজারে ছাড়া হয় ১৯৮৬ সালে। এর নকশাকার ছিলেন বাংলাদেশ টাঁকশালের সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশি খোদাইশিল্পী ও ছাপচিত্রী মুছলিম মিয়া।

আরও পড়ুন