পাখি দেখা মস্তিষ্ককে যেভাবে বদলে দেয়
নিয়মিত পাখি দেখা একটা শখ, যাকে আমরা ‘বার্ডওয়াচিং’ বলি। এই শখের কারণে মস্তিষ্কের সংযোগগুলো নতুনভাবে গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অভিজ্ঞ পাখিপ্রেমীদের মস্তিষ্কের গঠন ও কাজে এমন কিছু পার্থক্য আছে, যা তাদের অপরিচিত পাখি শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এমনকি এই অনুশীলন বয়সজনিত মানসিক ক্ষয় ঠেকাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গবেষক এরিক উইং ও তাঁর সহকর্মীরা ৪৮ জন শখের বার্ডওয়াচারের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের মধ্যে অর্ধেক ছিলেন অভিজ্ঞ, অর্ধেক নবীন। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ২২ থেকে ৭৯ বছর। লিঙ্গ, বয়স ও শিক্ষার দিক থেকে দুই দল প্রায় সমান ছিল।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করার সময় কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটি পাখির ছবি দেখানো হয়। প্রায় ১০ সেকেন্ড পর চারটি ছবির মধ্য থেকে একই প্রজাতির পাখিটি চিহ্নিত করতে বলা হয়। গবেষকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন প্রজাতি বেছে নিয়েছিলেন, যেগুলো দেখতে খুবই প্রায় একই রকম। মানে সহজে বিভ্রান্ত হওয়ার মতো। এভাবে মোট ৭২ বার পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং ১৮টি প্রজাতির ছবি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ৬টি স্থানীয় ও ১২টি বিদেশি।
বিদেশি পাখি শনাক্ত করার সময় অভিজ্ঞদের মস্তিষ্কের তিনটি অংশে কার্যকলাপ বেড়ে যায়। দ্বিপার্শ্বীয় প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, দ্বিপার্শ্বীয় ইন্ট্রাপ্যারিয়েটাল সালকাস এবং ডান পাশের অক্সিপিটোটেম্পোরাল কর্টেক্স।
ফলাফল ছিল প্রত্যাশিত। অভিজ্ঞ পাখিদর্শীরা নবীনদের তুলনায় অনেক বেশি সঠিকভাবে পাখি শনাক্ত করতে পেরেছেন। স্থানীয় পাখির ক্ষেত্রে তাঁদের সাফল্যের হার ছিল গড়ে ৮৩ শতাংশ, বিদেশি পাখির ক্ষেত্রে ৬১ শতাংশ। নবীনদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৪৪ শতাংশ।
কিন্তু আসল চমক ছিল মস্তিষ্কে। বিদেশি পাখি শনাক্ত করার সময় অভিজ্ঞদের মস্তিষ্কের তিনটি অংশে কার্যকলাপ বেড়ে যায়। দ্বিপার্শ্বীয় প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, দ্বিপার্শ্বীয় ইন্ট্রাপ্যারিয়েটাল সালকাস এবং ডান পাশের অক্সিপিটোটেম্পোরাল কর্টেক্স। এসব অঞ্চল বস্তু শনাক্তকরণ, চোখের দেখা তথ্য বিশ্লেষণ, মনোযোগ ও কাজের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। মানে পাখি দেখা কেবল চোখের কাজ নয়, এটি মনোযোগ, স্মৃতি ও বিশ্লেষণক্ষমতার মিলিত কাজ।
এ ধরনের পরিবর্তনকে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি, যা মূলত অভ্যাস বা শেখার ফলে মস্তিষ্কের নিজেকে পুনর্গঠন করার ক্ষমতা। যেমন পেশাদার সংগীতশিল্পীদের শোনা–সংক্রান্ত মস্তিষ্কের অংশ বা খেলোয়াড়দের মোটর অঞ্চলে কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যায়, তেমনি বার্ডওয়াচারদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশগুলো আরও সংগঠিত ও জটিল হয়ে ওঠে।
ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী রবার্ট জাটোর বলেন, বিশেষ দক্ষতা ধরে রেখে নিয়মিত মস্তিষ্কচর্চা করলে বয়সের প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের গঠনগত জটিলতা সাধারণত কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রবণতা অভিজ্ঞ ও নবীন—দুই দলের মধ্যেই ছিল। তবে অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে স্মৃতির ক্ষয় তুলনামূলক কম। গবেষকদের মতে, এটি ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’ বা মানসিক সুরক্ষাভান্ডার গড়ে তোলার ইঙ্গিত, যা মস্তিষ্ককে বয়সজনিত পরিবর্তন ও ক্ষতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে।
ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী রবার্ট জাটোর বলেন, বিশেষ দক্ষতা ধরে রেখে নিয়মিত মস্তিষ্কচর্চা করলে বয়সের প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে। এ ধারণা আগেই ছিল, তবে তা নিয়ে বিতর্কও আছে। এই গবেষণা সেই ধারণার পক্ষে নতুন প্রমাণ যোগ করেছে।
তবে গবেষকেরা সতর্কও করেছেন। এটি এককালীন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। হতে পারে, যারা পাখি দেখায় আগ্রহী হন, তাঁদের মস্তিষ্কে আগে থেকেই কিছু গঠনগত পার্থক্য ছিল। আবার জীবনযাপনের অন্য কোনো উপাদানও ভূমিকা রাখতে পারে। নিশ্চিতভাবে জানতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে একই ব্যক্তিদের মস্তিষ্ক একাধিকবার স্ক্যান করতে হবে।