সিনেমায় কাঁদতে দেখলে আমাদের কান্না পায় কেন
সিনেমা দেখতে বসলে এমন মুহূর্ত আসে, যখন পর্দায় কারও চোখে পানি দেখলে আমাদের চোখও ভিজে যায়। মজার ব্যাপার হলো, তখন আমরা জানি, আমরা সিনেমা দেখছি। তারা অভিনয় করছে। আমরা বুঝি যে এটা একটা গল্প। পর্দার অপর পাশে অভিনেতা একটা চরিত্রে অভিনয় করছেন। তবু আমাদের চোখে পানি আসে কেন?
এর পেছনে আছে আমাদের মস্তিষ্কের এক অদ্ভুত ও অসাধারণ ক্ষমতা।
আমাদের মস্তিষ্কে আছে একটা বিশেষ ধরনের কোষ, যার নাম মিরর নিউরন। এটা মূলত একটা আয়নার মতো কাজ করে। যখন কাউকে কিছু করতে দেখি, আমাদের মস্তিষ্ক সেটা দেখে এবং নিজের ভেতরে একই রকম প্যাটার্ন তৈরি করে। অর্থাৎ, যে মানুষটা কাঁদছে, তার কাঁদার সময় যে নার্ভগুলো সক্রিয় হয়, আমাদের মস্তিষ্কেও একই নার্ভগুলো একটু একটু সক্রিয় হয়ে যায়। তখন আমরাও সেই কাঁদার অনুভূতি পাই। এই প্রক্রিয়াটা আসলে আমাদের শেখার একটা প্রধান উপায়। আমরা অন্যদের দেখে শিখি, অনুভব করে শিখি।
এই মিরর নিউরনগুলো আমাদের মস্তিষ্কের প্রি-মোটর কর্টেক্স এবং ইনফেরিয়র ফ্রন্টাল জিরাস অংশে থাকে। এগুলো আমাদের শারীরিক নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এই নিউরনগুলোর বিশেষত্ব হলো, শুধু যখন আমরা নিজেরা কিছু করি তখনই সক্রিয় হয় না, বরং যখন আমরা অন্যদের সেই কাজ করতে দেখি তখনো সক্রিয় হয়। এটাই আসল জাদু।
মনে করো, তুমি রাস্তায় কাউকে পড়ে যেতে দেখলে এবং সে হাঁটুতে ব্যথা পেল। ১ সেকেন্ডের জন্য তুমিও যেন ব্যথা অনুভব করলে, তাই না? তোমার কোনো ব্যথা হয়নি, কিন্তু তাঁর ব্যথা দেখে তোমার মস্তিষ্ক অনুমান করে নেয় যে তুমিও ব্যথা পেয়েছ। তোমার মস্তিষ্কের ব্যথার সংবেদনশীল অংশ একটু জাগ্রত হয়ে ওঠে। এটাই সহানুভূতি। মিরর নিউরনই এর মূল কারণ। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন শিকার করতে যেত, তখন দলের অন্যরা তাদের অভিজ্ঞতা দেখে শিখত। আজও সেই ঘটনা ঘটছে আমাদের মস্তিষ্কে।
এখন সিনেমার কথা ভাবো। অভিনেতারা প্রশিক্ষিত। তাঁরা জানেন কীভাবে কাঁদতে হয়, যাতে দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করে। তাঁদের চোখ, গলার কম্পন, শরীরী ভাষা—সবকিছুই পরিকল্পিত। তারপর যোগ হয় সুর। একটা দুঃখের সুর বাজছে পটভূমিতে। শট নেওয়া হয় এমনভাবে যেন অভিনেতার মুখ বড় করে দেখা যায়। আলোর খেলাও থাকে। অন্ধকার কোণ, উজ্জ্বল চোখ। ক্যামেরা ধীরে ধীরে জুম করে আনে, যাতে তোমার সমস্ত মনোযোগ সেই মুখে কেন্দ্রীভূত হয়। সবকিছু মিলে তোমার মিরর নিউরনকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে সক্রিয় করে দেয়। এটা একটা শিল্প। চলচ্চিত্রনির্মাতারা জানেন কীভাবে আমাদের আবেগের বোতাম চাপতে হয়।
কিন্তু আরও একটা কারণ আছে। সেটা হলো গল্প এবং সংযোগ। ধরো, একটা সিনেমায় একজন মা তাঁর মৃত সন্তানের জন্য কাঁদছেন। এ মুহূর্তে শুধু একজন কাঁদছে বলে আমাদের মনে হয় না। আমরা ভাবি, যদি আমার মায়ের এ রকম হতো? যদি আমি এ রকম কাউকে হারাতাম? আমরা নিজেদের সেই মায়ের জায়গায় কল্পনা করি। এই কল্পনাটাই খুব শক্তিশালী। তখন তাঁর ব্যথা আমাদের নিজের ব্যথা হয়ে ওঠে।
এটাকেই বলা যায় আবেগময় সংযোগ। আমরা যখন একটা চরিত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হই, তখন তার আনন্দ আমাদের আনন্দ, তার দুঃখ আমাদের দুঃখ। মিরর নিউরন শুধু দেহের ভাষা নিয়ে কাজ করে না। আবেগও প্রতিফলিত করে। এ জন্যই একজন ভালো অভিনেতার অভিনয় দেখলে সত্যি মনে হয়। কারণ, তাঁদের আবেগ খাঁটি এবং আমাদের মস্তিষ্ক সেটা ধরতে পারে। এমনকি আমরা বুঝি না যে আমরা কীভাবে এটা ধরছি। এটা সব সময় অবচেতনে ঘটে।
মজার ব্যাপার হলো, এই মিরর নিউরন শুধু দুঃখের জন্যই নয়। যখন পর্দায় কেউ সাহসী কাজ করে, আমরাও সাহস অনুভব করি। যখন কেউ খুশিতে নাচে, আমাদের মনও লাফিয়ে ওঠে। যখন কেউ ক্রোধে জেগে ওঠে, আমাদের রক্তও টগবগ করে ওঠে। সিনেমা হলে বসে আমরা চরিত্রগুলোর জীবন যাপন করি। অনেক অভিজ্ঞতা পাই। এর সবটাই সম্ভব এই মিরর নিউরনের কারণে।
পরেরবার সিনেমা দেখতে গেলে যখন চোখ ভিজে যাবে, তখন ভেবো, এটা কোনো দুর্বলতা নয়। এটা প্রমাণ করে যে তুমি অন্যকে বুঝতে পারো। তুমি আরেকজনের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারো। আর এটাই আসলে মানুষের সবচেয়ে সুন্দর বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি।
তথ্যসূত্র: আমেরিকান কনফিডেন্স ইনস্টিটিউট, গ্রোথ ইঞ্জিনিয়ারিং