কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক যেভাবে দুই শ রাজ পেঙ্গুইন সংরক্ষণ করলেন

দক্ষিণ চিলির একটি উপসাগরের নাম ‘ইউসলেস বে’। এমন নামের পেছনের কারণ, এই সমুদ্র মানুষের কোনো কাজে লাগে না। এই নাম দিয়েছিলেন বহু আগের অভিযাত্রীরা। কারণ, এখানে সমুদ্রের তীর খুব অগভীর। নৌকা ভেড়ানো যায় না। মাছ ধরার বড় জাহাজও এখানে আসতে পারে না।

এই কারণে জায়গাটা প্রাণীর জন্য নিরাপদ। শত শত বছর ধরে এখানে আশ্রয় নিয়েছে রাজ পেঙ্গুইন। সমুদ্রের শিকারি প্রাণী আর মানুষের হাত থেকে জায়গাটি কিছুটা নিরাপদ।

রাজ পেঙ্গুইন সাধারণত দক্ষিণ মহাসাগরের দ্বীপগুলোয় বাস করে। কিন্তু এই উপসাগরে স্থায়ী আবাস গড়ে ওঠেনি বহু বছর ধরে। কারণ, এখানে মানুষ ছিল পেঙ্গুইনের জন্য বড় হুমকি।

এরপর ২০১০ সালে বদলে যায় সবকিছু। সেই সময় এখানে ধীরে ধীরে একটি পেঙ্গুইন দল বাসা বানাতে শুরু করে। পেঙ্গুইন এলে এদের সহযোগিতা করেন স্থানীয় ভূমিমালিক ও প্রাক্তন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক সিসিলিয়া ডুরান গাফ। এখন তাঁর বয়স ৭২। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পেঙ্গুইনগুলোকে তিনি রক্ষা করবেন।

এখন তাঁর গড়া সংরক্ষণ এলাকা পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশীয় রাজ পেঙ্গুইনের বাসস্থান। হাতে গোনা কয়েকটি পেঙ্গুইন থেকে শুরু করে এখন সেখানে প্রায় দুই শত পেঙ্গুইন বাস করে। এই সংরক্ষণ এলাকাটা না থাকলে পেঙ্গুইনগুলো আসলে কখনো নিরাপদ জায়গা পেত না।

আরও পড়ুন
দুই পায়ে সোজা দাঁড়িয়ে হেলেদুলে হাঁটে পেঙ্গুইন
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা সংরক্ষণ প্রকল্প এখন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার যেখানে পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে এমন ব্যক্তিগত সংরক্ষণ অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সিসিলিয়া নামের এই নারীর গল্পটা আলাদা।

১৯৯০–এর দশকের শুরুতে প্রথমবার নিজের জমিতে রাজ পেঙ্গুইন বাসা বাঁধতে দেখেন তিনি। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কিছু লোক আসে। নিজেদের বিজ্ঞানী পরিচয় দিয়ে তাঁরা পেঙ্গুইনগুলো নিয়ে যান।

সিসিলিয়া বলেন, ‘ওদের খাঁচায় ভরে জাপানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য। পরে জানতে পারি, বেশির ভাগই চিড়িয়াখানা বা মানুষের বাড়িতে পোষা প্রাণী হিসেবে চলে গিয়েছিল।’

এরপর দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পেঙ্গুইনরা আর সেখানে স্থায়ীভাবে ফিরে আসেনি। তারপর একদিন, হঠাৎ করেই তারা আবার ফিরে আসে ২০১০ সালে। কিন্তু সমস্যাও ফিরে আসে সঙ্গে সঙ্গে। কেউ ডিম চুরি করত, কেউ পেঙ্গুইনের গায়ে টুপি পরিয়ে দিত, কেউ পেঙ্গুইনের চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে ছবি তুলত। ভয়ংকর সব কাজ করেছে লোকজন।

এভাবে খুব দ্রুত ভেঙে পড়ে উপনিবেশটি। ৯০টি পেঙ্গুইনের মধ্যে এক বছরের মাথায় বেঁচে থাকে মাত্র আটটি।

তখন সিসিলিয়া পরিবারের সবাইকে নিয়ে মিটিং ডাকেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কিছু একটা করতেই হবে। তাঁর দুই মেয়ে একসঙ্গে তাঁকেই পেঙ্গুইনদের জন্য কিছু একটা করতে বলেন। তারপর শুরু হয় একা এক নারীর পাহারা দেওয়া।

আরও পড়ুন

প্রতিদিন তিনি সমুদ্রতীরে যেতেন। সঙ্গে থাকত গরম পানির ফ্লাস্ক আর একটি স্যান্ডউইচ। সারা দিন বরফশীতল বাতাসে বসে থাকতেন। শুধু দেখতেন, কেউ যেন পেঙ্গুইনদের বিরক্ত না করে। পরের বছর নিজের প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ৩০ হেক্টর এলাকা ঘিরে সংরক্ষিত অঞ্চল তৈরি করেন তিনি। মানুষ সেখানে যেতে পারবে, কিন্তু দূর থেকে পেঙ্গুইন দেখবে।

এম্পেরর পেঙ্গুইন

তবে শুধু মানুষকে দূরে রাখলেই সব সমাধান হচ্ছিল না। বিশ শতকে এই অঞ্চলে আনা হয়েছিল শিকারি মিংক আর ধূসর শিয়াল। এগুলো পেঙ্গুইনের জন্য ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কারণ রাজ পেঙ্গুইনকে শিকার করে এই অঞ্চলের ভূমিতে এমন শিকারি নেই।

মিংক বড় পেঙ্গুইনের ওপর আক্রমণ করে না। কিন্তু ডিম আর ছানাদের শিকার করে। তাই শুরুর দিকে এক বা দুটি ছানার বেশি বাঁচত না। এরপর শুরু হলো পেঙ্গুইন রক্ষায় চেষ্টা। প্রথম ১০ বছর সিসিলিয়াদের কৌশল ছিল বেশ অদ্ভুত। তাঁরা শিকারি প্রাণীগুলোকে অন্যদিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে শীতকালে যখন বড় পেঙ্গুইনেরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ সমুদ্রে খাবার খুঁজতে যায়, তখন ছানারা একেবারে অসহায় হয়ে পড়ে।

সিসিলিয়া ছোট একটি দল তৈরি করেছিলেন। যারা স্থানীয় কসাইখানা থেকে মাংসের টুকরা কিনে আনত। তারপর সংরক্ষণ এলাকার অনেক দূরে গিয়ে সেই মাংস ছড়িয়ে দিত। যেন মিংক আর শিয়াল সেদিকেই শিকার খুঁজতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

তাঁরা কুকুরও ব্যবহার শুরু করেন। সকালে আর বিকেলে কুকুরগুলো এলাকা ঘুরে গন্ধ ছড়িয়ে দিত। সেই গন্ধ পেয়ে শিয়াল বা মিংক আর কাছে আসত না।

আরও পড়ুন

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ প্রকল্পটি আরও পেশাদার হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে সিসিলিয়া আইনগতভাবে ৩০ হেক্টর জমিকে পরবর্তী এক শ বছরের জন্য সংরক্ষিত অঞ্চল করার প্রক্রিয়া শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘যে-ই এই জমির উত্তরাধিকারী হোক, তাকে সংরক্ষণের কাজ চালিয়ে যেতেই হবে।’

পেঙ্গুইন এলে এদের সহযোগিতা করেন স্থানীয় ভূমিমালিক ও প্রাক্তন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক সিসিলিয়া ডুরান গাফ। এখন তাঁর বয়স ৭২

এখন সেখানে ১২ সদস্যের একটি দল কাজ করে। জীববিজ্ঞানী আছেন, পশুচিকিৎসক আছেন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিশেষজ্ঞও আছেন।

প্রতিবছর গড়ে ১৫ হাজার মানুষ সেখানে বেড়াতে আসে। সেই পর্যটনের আয় দিয়েই চলে পুরো সংরক্ষণ প্রকল্প। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলে তাঁরা পেঙ্গুইন, পাখি আর উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণাও করছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের উপনিবেশ থেকেও রাজ পেঙ্গুইন এই উপসাগরে এসেছে। আর নতুন জায়গায় এসেও এরা দ্রুত স্থানীয় খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘অসাধারণ খাদ্যাভ্যাস অভিযোজন ক্ষমতা’।

গবেষকদের ধারণা, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মানুষের তৈরি বড় বিপর্যয়ের মধ্যেও হয়তো এই অভিযোজন ক্ষমতা এদের টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

এরই মধ্যে সিসিলিয়া নিজের চোখে তাঁর পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘গত বছর ২৩টি ছানা বেঁচে গেছে। এটাই এখন পর্যন্ত রেকর্ড।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
আরও পড়ুন