পৃথিবীতে একসঙ্গে সর্বোচ্চ কত ডাইনোসর ছিল

ডাইনোসর

চোখ বন্ধ করে একটু কল্পনার টাইম মেশিনে চেপে বসো তো। ধরো তোমার টাইম মেশিন গিয়ে থামল ঠিক ১৫ কোটি বছর আগে, জুরাসিক যুগে। চারদিকে শুধু বিশাল আকৃতির ফার্ন ও সাইকাড গাছ। হঠাৎ মাটি কাঁপিয়ে তোমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল কয়েক টন ওজনের এক বিশাল ডাইনোসর। তুমি ভয়ে একটু লুকিয়ে গেলে। তখনই খেয়াল করলে, শুধু একটা নয়; তোমার চোখের সামনে মাঠ, বন ও দিগন্তজুড়ে গিজগিজ করছে হাজার হাজার ডাইনোসর!

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬৬ লাখ বছর আগে এক প্রকাণ্ড গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর বুক থেকে ডাইনোসর চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু তার আগে প্রায় ১৬ কোটি বছর তারা এই পৃথিবীতে একচেটিয়া রাজত্ব করেছে। এখন মনে একটা প্রশ্ন জাগতেই পারে, রাজত্ব করার সেই স্বর্ণযুগে পুরো পৃথিবীতে একসঙ্গে ঠিক কতগুলো ডাইনোসর ছিল? লাখ লাখ, নাকি কোটি কোটি?

সত্যি কথা বলতে, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়াটা বিজ্ঞানীদের জন্য খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতোই কঠিন। অথবা খড়ের গাদায় খড় খোঁজার মতোই কঠিন! কারণ, ডাইনোসরদের তো আর কোনো আদমশুমারি হতো না! বিজ্ঞানীদের নির্ভর করতে হয় মাটির নিচে পাওয়া ফসিলের ওপর। কিন্তু মারা যাওয়া ডাইনোসরদের খুব সামান্য একটা অংশই ফসিল হিসেবে সংরক্ষিত হতে পেরেছে। তাই মোট জনসংখ্যার হিসাব বের করতে বিজ্ঞানীদের আধুনিক প্রযুক্তি ও গণিতের সাহায্য নিতে হয়।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীতে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি আলাদা গণের ডাইনোসর ছিল। এদের মধ্যে কোনোটা ছিল মুরগির মতো ছোট, আবার কোনোটা ছিল পাঁচতলা ভবনের সমান উঁচু! যেহেতু আমরা ফসিল থেকে মোট জনসংখ্যা মাপতে পারি না, তাই বিজ্ঞানীরা বর্তমান যুগের প্রাণীদের সঙ্গে এর একটা তুলনা করার চেষ্টা করেছেন।

আরও পড়ুন

যেমন ধরো, আঠারো শতকে উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ সমভূমিতে প্রায় দুই কোটি বাইসন (একধরনের বন্য মহিষ) একসঙ্গে ঘুরে বেড়াত। ডাইনোসররা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো বাচ্চা দিত না, এরা ডিম পাড়ত। আর ডিম পাড়া প্রাণীদের বংশবৃদ্ধির হার অনেক বেশি হয়। তাই খুব সহজেই ধারণা করা যায়, ডাইনোসরদের সংখ্যা এই বাইসনদের চেয়েও বহুগুণ বেশি ছিল!

মোসাসরাসের ফসিল
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স/ ঘেডোঘেডো, সিসি বাই-এসএ ৪.০ লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত

তবে এত বিশাল প্রাণীদের বেঁচে থাকার প্রধান শর্তই ছিল গাছপালা বা খাদ্যের সহজলভ্যতা। মজার ব্যাপার হলো, পরিবেশ এবং খাদ্যের প্রাপ্যতা ডাইনোসরদের ওপর যেমন প্রভাব ফেলত, তেমনি ডাইনোসররাও পরিবেশকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছিল। বিশাল আকৃতির ডাইনোসররা যখন বনের ভেতর দিয়ে চলাফেরা করত বা খাবার খেত, তখন তারা বড় বড় গাছপালার ডালপালা খেয়ে বনকে অনেকটাই পাতলা করে দিত। ফলে ঘন বনের ওপরের আচ্ছাদন ভেদ করে সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে পৌঁছানোর সুযোগ পেত। মাটিতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পড়ায় ছোট গাছপালা ও ফার্নজাতীয় উদ্ভিদের বৃদ্ধি অনেক বেড়ে যায়। এমনকি এই বাড়তি আলো বীজের পরিবর্তনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। নিচুতলার এই বিপুল পরিমাণ গাছপালাই মূলত কোটি কোটি নিরামিষাশী ডাইনোসরের খাদ্যের অভাব মেটাত। পর্যাপ্ত খাবারের এই জোগান থাকায় ১৫ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে বড় বড় ডাইনোসরের সংখ্যা অবিশ্বাস্য মাত্রায় পৌঁছেছিল।

ডাইনোসরদের সংখ্যা নিয়ে বিজ্ঞানীরা কেমন গবেষণা করছেন, তার একটা চমৎকার উদাহরণ হলো টি-রেক্স। ২০২১ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের জীবাশ্মবিদ চার্লস মার্শাল এবং তাঁর দল বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাঁদের তৈরি করা কম্পিউটার মডেলের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে যেকোনো নির্দিষ্ট সময়ে অন্তত ২০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক টি-রেক্স বেঁচে থাকত। আর টি-রেক্সের পুরো ইতিহাসে পৃথিবীতে সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই শ কোটি টি-রেক্স জন্মেছিল!

আরও পড়ুন

পরে ২০২৩ সালে জার্মানির জোহানেস গুটেনবার্গ ইউনিভার্সিটির ইভা গ্রিবেলার নামে আরেকজন বিজ্ঞানী প্যালিওন্টোলজি জার্নালে এই মডেলটি আরও নিখুঁত করে হিসাব করেন। তাঁর মতে, ইতিহাসে মোট টি-রেক্সের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭০ কোটি। আর কোনো এক সময়ে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত প্রায় ১৯ হাজার টি-রেক্স।

শিল্পীর কল্পনায় সরোপড ডাইনোসর
ছবি: সংগৃহীত

এবার একবার ভেবে দেখো! টি-রেক্স ছিল খাদ্যতালিকার একদম ওপরে থাকা শীর্ষ খাদক। একটি বনে বাঘের চেয়ে হরিণের সংখ্যা যেমন অনেক বেশি থাকে, তেমনি ২০ হাজার মাংসাশী টি-রেক্সের পেট ভরানোর জন্য পৃথিবীতে সেই সময়ে নিশ্চয়ই লাখ লাখ নিরামিষাশী ডাইনোসর চরে বেড়াত!

পুরো পৃথিবীতে যদি ১ হাজার ৮০০ গণের ডাইনোসর থাকে এবং প্রতিটি গণের যদি লাখ লাখ সদস্য থেকে থাকে, তবে এটা সহজেই বলা যায়, তাদের সেরা সময়ে পৃথিবীতে একসঙ্গে কোটি কোটি ডাইনোসর দাপিয়ে বেড়াত। হয়তো বর্তমান পৃথিবীর মানুষের জনসংখ্যার কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি ডাইনোসর এই পৃথিবীতে একসঙ্গে বসবাস করেছে।

আজ আমরা কংক্রিটের যে পৃথিবীতে হাঁটছি, এই একই মাটিতেই কোটি কোটি বছর আগে হেঁটে গেছে হাজারো প্রজাতির ডাইনোসর। মাটির নিচে চাপা পড়া সেই কোটি কোটি প্রাণের ফসিলই যেন আজ আমাদের কানে কানে বলে যায় পৃথিবীর সেই হারানো স্বর্ণযুগের গল্প!

সূত্র: সায়েন্স জার্নাল, প্যালিওন্টোলজি জার্নাল ও বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ম্যাগাজিন
আরও পড়ুন