পৃথিবীতে কত ধরনের ডাইনোসর ছিল
ডাইনোসর নিয়ে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। বইয়ের পাতায় বা মুভিতে আমরা নানা ধরনের ডাইনোসর দেখি। জাদুঘরে গেলে বিশাল সব ডাইনোসরের কঙ্কাল দেখা যায়। টি-রেক্স বা ট্রাইসেরাটপসের নাম আমরা প্রায় সবাই জানি। কিন্তু আমাদের মনে প্রায়ই একটা প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীতে আসলে কত প্রজাতির ডাইনোসর ছিল? সংখ্যাটা কি খুব বেশি, নাকি কয়েক শ মাত্র?
এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন। এ বিষয়ে বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনে চমৎকার একটি লেখা ছাপা হয়েছে। সেখানকার কিছু অবাক করা বৈজ্ঞানিক তথ্য নিয়েই তোমাদের জন্য এই লেখা।
বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে মাটি খুঁড়ে ফসিল আবিষ্কার করছেন। ফসিল হলো পাথর হয়ে যাওয়া প্রাচীন প্রাণীর হাড় বা শরীরের অংশ। এই ফসিল দেখেই বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের ধরন আলাদা করেন। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এক হাজারের বেশি ডাইনোসরের প্রজাতির নাম দিয়েছেন। এই সংখ্যাটা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০-এর মধ্যে। সংখ্যাটা শুনে তোমাদের কাছে হয়তো অনেক বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর পুরো ইতিহাসের তুলনায় সংখ্যাটা খুবই সামান্য। আসল সংখ্যাটা এর চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি।
আমরা আসল সংখ্যাটা জানি না কেন? এর প্রধান কারণ হলো ফসিল তৈরির প্রক্রিয়া। কোনো প্রাণী মারা গেলেই তা ফসিল হয়ে যায় না। ফসিল তৈরি হওয়াটা প্রকৃতির এক বিশাল লটারি জেতার মতো ব্যাপার। বেশির ভাগ সময় প্রাণী মারা যাওয়ার পর তার শরীর পচে যায়। ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস শরীরটাকে নষ্ট করে দেয়। অথবা অন্য মাংসাশী প্রাণীরা সেই মৃতদেহ খেয়ে ফেলে। ফলে ওই প্রাণীর হাড়গোড়ের আর কোনো চিহ্ন থাকে না।
ফসিল হওয়ার জন্য মৃতদেহকে খুব দ্রুত মাটির নিচে ঢাকা পড়তে হয়। চাপা পড়তে হয় কাদা, বালু বা আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে। এরপর এটি মাটির অনেক গভীরে চলে যায়। সেখানে হাজার হাজার বছর ধরে মৃতদেহটি চাপা পড়ে থাকে। মাটির নিচে বাতাসের অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। তাই হাড়গুলো পুরোপুরি পচে না। চারপাশের মাটি থেকে নানা রকম খনিজ পদার্থ হাড়ের ভেতর ঢুকে যায়। একসময় হাড়ের ভেতরের আসল উপাদানগুলো নষ্ট হয়ে যায়। তার জায়গা নেয় ওই মাটির খনিজ পদার্থ। তখন হাড়গুলো একদম শক্ত পাথরে পরিণত হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া খুবই বিরল। লাখ লাখ ডাইনোসরের মধ্যে হয়তো মাত্র একটির ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছিল!
ফসিল তৈরির ক্ষেত্রে পরিবেশের একটা বড় ভূমিকা আছে। সব পরিবেশে ফসিল তৈরি হয় না। যেসব ডাইনোসর নদী, হ্রদ বা বন্যার পানির কাছাকাছি থাকত, তাদের ফসিল হওয়ার সুযোগ ছিল বেশি। কারণ, সেসব জায়গায় কাদা বা পলিমাটি বেশি থাকে। কাদায় হাড় খুব সহজে আটকে যায়।
কিন্তু যেসব ডাইনোসর পাহাড় বা ঘন জঙ্গলে থাকত, তাদের কী হতো? পাহাড়ে মাটি দ্রুত বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায়। জঙ্গলের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে মৃতদেহ খুব দ্রুত পচে যায়। তাই সেসব এলাকার ডাইনোসরদের কোনো ফসিল আমরা পাই না। তার মানে, পাহাড় বা জঙ্গলে বাস করা হাজার হাজার প্রজাতির ডাইনোসর চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। আমরা হয়তো কোনো দিনই তাদের কথা জানতে পারব না।
তোমরা কি জানো, পৃথিবীর ওপরের স্তরটি স্থির নয়। এটি সব সময় একটু একটু করে নড়ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া। এই প্লেটগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়। কখনো একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের নিচে ঢুকে যায়। এতে অনেক পুরোনো পাথরের স্তর মাটির অনেক গভীরে গলে যায়। আবার কখনো রোদে-বৃষ্টিতে মাটি ক্ষয়ে গিয়ে ফসিল নষ্ট হয়ে যায়। ডাইনোসররা পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি বছর রাজত্ব করেছিল। এই বিশাল সময়ের অনেক পাথরের স্তর এভাবেই ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই স্তরের ভেতরে থাকা ফসিলগুলোও চিরতরে মুছে গেছে। তাই আমরা চাইলেও সব ডাইনোসরের খোঁজ আর পাব না।
কিন্তু এখানে একটি মজার ব্যাপার আছে। ডাইনোসররা কিন্তু পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বিজ্ঞানীরা বলেন, আজকের দিনের সব পাখিই আসলে ডাইনোসরের বংশধর। পাখিদের বলা হয় এভিয়ান ডাইনোসর। পৃথিবীতে এখন প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখি আছে। তার মানে, ডাইনোসরদের বিশাল একটি অংশ এখনো আমাদের চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে! কিন্তু আমরা এখানে শুধু প্রাচীন যুগের ডাইনোসরদের কথা বলছি। বিজ্ঞানীরা ওই পুরোনো ডাইনোসরদের বলেন নন-এভিয়ান ডাইনোসর। এই নন-এভিয়ান ডাইনোসরদের আসল সংখ্যা বের করাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
বিজ্ঞানীরা এখন শুধু ফসিল খোঁজার ওপর নির্ভর করেন না। তাঁরা আধুনিক প্রাণীদের বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন। ব্যবহার করেন গণিতের নানা জটিল মডেল। এই মডেলগুলো ব্যবহার করে তাঁরা ডাইনোসরের আসল সংখ্যাটি অনুমান করার চেষ্টা করেন। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে অন্তত দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার প্রজাতির প্রাচীন ডাইনোসর ছিল। কিছু কিছু গবেষণায় এই সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।
ব্যাপারটা আরেকটু সহজে বোঝার জন্য আমরা টি-রেক্সের উদাহরণ দিতে পারি। টি-রেক্স পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর ডাইনোসর ছিল। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, পৃথিবীতে সব মিলিয়ে প্রায় ২৫০ কোটি টি-রেক্স জন্ম নিয়েছিল! অথচ আমরা এখন পর্যন্ত মাত্র ১০০টির মতো টি-রেক্সের ভালো ফসিল পেয়েছি। ২৫০ কোটির মধ্যে মাত্র ১০০টি!
তাহলে বুঝতেই পারছ, আমরা আসলে ডাইনোসরদের সম্পর্কে কত কম জানি। পৃথিবী একসময় অদ্ভুত ও চমৎকার সব ডাইনোসরে ভরপুর ছিল। তাদের মধ্যে অনেক ডাইনোসরকে আমরা কখনোই দেখতে পাব না। ডাইনোসরদের জীবাশ্ম খোঁজার কাজটা এখনো বিশাল একটা ধাঁধার মতো। ধাঁধার অনেক টুকরোই চিরতরে হারিয়ে গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা হাল ছাড়েননি। প্রতিবছরই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও নতুন প্রজাতির ডাইনোসর আবিষ্কৃত হচ্ছে। হয়তো সামনের দিনগুলোয় আমরা এই রহস্যময় প্রাণীদের সম্পর্কে আরও অনেক অজানা তথ্য জানতে পারব।