আপেক্ষিকতার মজার জগৎ—পর্ব ৪

রয় জে কেনেডি এবং এডওয়ার্ড এম থর্নডাইক নামের দুই মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী মাইকেলসন-মোর্লি পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তবে একটি বড় পার্থক্য ছিল। যন্ত্রের দুটি বাহুকে যথাসম্ভব সমান না করে, তাঁরা সেগুলোকে যতটা সম্ভব আলাদা দৈর্ঘ্যের করেছিলেন। এরপর যন্ত্রটিকে ঘোরানো হয়। তাঁরা দেখতে চেয়েছিলেন, দুই দিকে আলো যেতে–আসতে সময়ের কোনো পরিবর্তন হয় কি না। সংকোচন তত্ত্ব অনুযায়ী, যন্ত্রটি ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে এ সময়ের পার্থক্য বদলে যাওয়ার কথা। দুটি রশ্মি যখন আবার মিলিত হবে, তখন মাইকেলসনের পরীক্ষার মতো ইন্টারফারেন্স ফ্রিঞ্জের পরিবর্তন দেখে এটি বোঝা যাবে। কিন্তু এমন কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।

তবে এখন মসবাউয়ার আলোর উৎস ব্যবহার করে একটি টার্নটেবিলের দুই প্রান্তে রিসিভার বসিয়ে আরও নিখুঁত পরীক্ষা করা হয়েছে। মসবাউয়ার ইফেক্ট নিয়ে পরে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এ ধরনের সব পরীক্ষাই সংকোচন তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেছে। যদিও লরেন্টজের সময়ে এ ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল না, তবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাত্ত্বিকভাবে এগুলো করা সম্ভব। আর এমনটা ভাবার ভালো কারণও ছিল। মাইকেলসনের পরীক্ষার মতো এগুলোও নেতিবাচক ফল দেবে। সম্ভাব্য এই নেতিবাচক ফলগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য লরেন্টজ তাঁর মূল তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনলেন। তিনি সময়ের পরিবর্তনের কথা তুলে আনলেন। তিনি বললেন, ইথার বায়ুর কারণে ঘড়িগুলো ধীর হয়ে যাবে। এমনভাবে ধীর হবে যাতে আলোর বেগ সব সময় সেকেন্ডে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ কিলোমিটারই মাপা হয়! এই ব্যাপার কীভাবে কাজ করে তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

আরও পড়ুন

ধরো, পৃথিবী যেদিকে ছুটছে, সোজা সেই পথ ধরে A থেকে B পর্যন্ত আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করা হলো। A-তে দুটি ঘড়ি সময় মিলিয়ে রাখা হলো, তারপর একটি ঘড়ি B-তে নিয়ে যাওয়া হলো। A থেকে আলোর রশ্মিটি কখন বের হলো, সেই সময়টা লিখে রাখা হলো। B-তে কখন পৌঁছাল সেটি মেপে নেওয়া হলো অন্য ঘড়ি দিয়ে। যেহেতু আলো ইথার বায়ুর বিপরীতে যাচ্ছিল, তাই এর গতি কমে যাওয়ার কথা এবং পৃথিবী স্থির থাকলে যতটুকু সময় লাগত, তার চেয়ে একটু বেশি সময় লাগার কথা।

তুমি কি এই তত্ত্বে কোনো খুঁত দেখতে পাচ্ছ? ঘড়িটি যখন A থেকে B-তে যায়, তখন এটিও ইথার বায়ুর বিপরীতে যায়। ফলে B-তে থাকা ঘড়িটি কিছুটা ধীর হয়ে যায়। মানে এটি A-তে থাকা ঘড়ির চেয়ে একটু পিছিয়ে চলে। এর ফলাফল হলো, আলোর বেগ মাপা হলে সেটি সেই সেকেন্ডে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ কিলোমিটারই দেখায়! লরেন্টজ দাবি করলেন, উল্টো দিক থেকে, অর্থাৎ B থেকে A-তে আলোর বেগ মাপলেও একই ব্যাপার ঘটবে। B-তে দুটি ঘড়ির সময় মিলিয়ে রাখা হলো। তারপর একটি ঘড়ি নিয়ে যাওয়া হলো A-তে। এবার B থেকে A-তে আলোর রশ্মি পাঠানো হলো, যা ইথার বায়ুর সঙ্গে যাচ্ছিল। বাতাসের কারণে রশ্মির গতি বেড়ে যায়, তাই পৃথিবী স্থির থাকলে যতটুকু সময় লাগত, তার চেয়ে আলোর এই যাত্রায় কিছুটা কম সময় লাগার কথা। কিন্তু ঘড়িটিকে B থেকে A-তে নিয়ে যাওয়ার সময় সেটিও বাতাসের সঙ্গে গিয়েছিল। চলন্ত ঘড়ির ওপর ইথার বায়ুর চাপ কমে যাওয়ার কারণে ঘড়িটি কিছুটা দ্রুত চলতে পেরেছিল। তাই যখন পরীক্ষা করা হলো, তখন দেখা গেল A-তে থাকা ঘড়িটি B-তে থাকা ঘড়ির চেয়ে একটু এগিয়ে চলছে। ফলে আলোর বেগ আবার সেই সেকেন্ডে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ কিলোমিটারই মাপা হলো!

লরেন্টজের নতুন তত্ত্বটি শুধু মাইকেলসন-মোর্লি পরীক্ষার নেতিবাচক ফলাফলেরই ব্যাখ্যা দেয়নি, এটি ইথার বায়ুর কারণে আলোর বেগে যেকোনো ধরনের পরিবর্তন ধরার উদ্দেশ্যে করা যেকোনো পরীক্ষার জন্যও ব্যাখ্যা তৈরি করেছিল। তাঁর দৈর্ঘ্য এবং সময়ের পরিবর্তনের সমীকরণগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে যেকোনো প্রসঙ্গ কাঠামো থেকে আলোর বেগ মাপার যেকোনো পদ্ধতিতেই সব সময় একই ফলাফল পাওয়া যাবে। পদার্থবিজ্ঞানীরা কেন এই তত্ত্ব নিয়ে অখুশি ছিলেন, তা বোঝা সহজ। এই তত্ত্ব ছিল আক্ষরিক অর্থেই অ্যাডহক। ইথার তত্ত্বের ফুটো সারাতে গিয়ে এটি অদ্ভুত একটা প্রচেষ্টার চেয়ে বেশি কিছু মনে হয়নি। এটি প্রমাণ করার বা ভুল প্রমাণ করার কোনো কল্পনীয় উপায়ই ছিল না। পদার্থবিজ্ঞানীদের পক্ষে এটা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে যদি সত্যিই ইথার বায়ু থাকে, তবে প্রকৃতি একে লুকিয়ে রাখতে এতটা অদ্ভুত, চরম এবং পাগলাটে আচরণ করবে। আর্থার স্ট্যানলি এডিংটন নামে একজন বিশিষ্ট ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ লুইস ক্যারলের ‘থ্রু দ্য লুকিং-গ্লাস’–এর হোয়াইট নাইটের গানের এই লাইনগুলো উদ্ধৃত করে পরিস্থিতিটির দারুণ বর্ণনা দিয়েছিলেন:

আরও পড়ুন

বাট আই ওয়াজ থিঙ্কিং অব আ প্ল্যান

টু ডাই ওয়ান্স হুইস্কার্স গ্রিন,

অ্যান্ড অলওয়েজ ইউজ সো লার্জ আ ফ্যান

দ্যাট দে কুড নট বি সিন।

লাইনগুলো বাংলা অনেকটা এ রকম হবে:

কিন্তু আমি একটা উপায় ভাবছিলাম

কীভাবে গোঁফ জোড়া সবুজ করা যায়,

আর সব সময় এত বড় একটা পাখা ব্যবহার করব

যাতে সেগুলো কেউ দেখতে না পায়।

লরেন্টজের নতুন তত্ত্বটি, যার মধ্যে দৈর্ঘ্য এবং সময়ের পরিবর্তন দুই-ই ছিল, হোয়াইট নাইটের পরিকল্পনার মতোই হাস্যকর মনে হয়েছিল। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা শত চেষ্টা করেও এর চেয়ে ভালো কোনো পরিকল্পনা ভাবতে পারেননি। পরের পর্বে দেখা যাবে, আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব কীভাবে এই অসাধারণ বিভ্রান্তি থেকে বের হওয়ার একটি সাহসী এবং চমৎকার পথ দেখিয়েছিল।

আরও পড়ুন