শিশুদের রাগ বা জেদ সামলানোর উপায় কী

শিশুরা কীভাবে নিজের আবেগ সামলাতে শেখে? এ ব্যাপারে বড়রা কী করতে পারেন? কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া দরকার? সব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এই লেখা।

শিশুকে বোঝানোর আগে জানতে হবে, কেন সে জেদ বা রাগ করছেছবি: কবির হোসেন

শপিং মলের ঠিক মাঝখানে হঠাৎ তোমার ছোট ভাই বা বোন মেঝেতে শুয়ে হাত-পা ছুড়ে বিকট চিৎকার শুরু করল। আশপাশের সবাই হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে। ওর কাণ্ড দেখে তোমার রাগ বা বিরক্তি লাগছে। অথচ তোমার ছোট ভাই বা বোনটা হয়তো শুধু একটা আইসক্রিমের জন্যই এমনটা করছে। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ ঘটনাটা এইমাত্র ওর সঙ্গে ঘটে গেছে!

এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবারও অস্বস্তি হয়। বিশেষ করে অন্য মানুষের সামনে এমন হলে বিব্রত লাগতে পারে। তাঁরা ভাবতে পারেন, তাঁরা কি ঠিকভাবে সন্তানকে বড় করছেন? কখনো রাগ হয়, কখনো ক্লান্ত লাগে। অনেক সময় মনে হয়, আর পারছি না!

তখন অনেক মা-বাবা বই পড়েন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরামর্শ খোঁজেন, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেন। কেউ কেউ চিকিৎসকের সাহায্যও নেন। সবার মনে একই প্রশ্ন, ‘বাচ্চার এই আচরণ বন্ধ করব কীভাবে?’

সাধারণ পরামর্শ হলো, এমন পরিস্থিতিতে নিজে শান্ত থাকতে হবে। শিশুর সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলতে হবে, তবে নিয়মের ব্যাপারে দৃঢ় থাকতে হবে। শিশুটি কেন রেগে যাচ্ছে, সেটাও বোঝার চেষ্টা করতে হবে। হয়তো তার ক্ষুধা পেয়েছে, ঘুম পাচ্ছে, কিংবা তার মনে হয়েছে তার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। কথাগুলো শুনতে সহজ। কিন্তু বাস্তবে মেনে চলা কঠিন। তারপরও অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে এসব পরামর্শ কাজে দেয়।

তবে সব পরিবারের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না। দিনের পর দিন শিশুর রাগ, কান্না আর চিৎকার চলতে থাকলে ধৈর্যশীল মা-বাবারও ক্লান্ত হয়ে পড়া স্বাভাবিক। একসময় তাঁরা নিজেদের নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করেন। সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্বও তৈরি হতে পারে।

তাহলে উপায় কী? শিশু যত দিন নিজের আবেগ সামলানোর দক্ষতা অর্জন না করবে, তত দিন তার রাগ বা কান্না পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশা করা ঠিক নয়। তাই প্রশ্নটা শুধু ‘রাগ বন্ধ করব কীভাবে?’ নয়; বরং আরও দুটি প্রশ্ন করা দরকার।

১. অভিভাবকেরা কীভাবে শিশুর নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারেন?

২. কখন বুঝতে হবে, তার রাগ বা কান্নার পেছনে অন্য কোনো সমস্যা থাকতে পারে?

আরও পড়ুন

এক দিনে আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখা যায় না

মনোবিজ্ঞানী জেমস গ্রসের মতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ বলতে বোঝায়, আমরা কোন আবেগ অনুভব করব, কখন করব এবং সেই আবেগ কীভাবে অনুভব ও প্রকাশ করব, তা সামলানোর প্রক্রিয়া।

শিশুরা জন্মের সময় এই দক্ষতা নিয়ে আসে না। তবে ধীরে ধীরে তা শেখার ক্ষমতা তাদের থাকে। মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তারা এই দক্ষতা অর্জন করে। আর এতে বড় ভূমিকা রাখেন মা-বাবা ও যত্ন নেওয়া অন্য মানুষেরা।

প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনা থেকেই শিশুরা শেখে। ভয় পেলে কেউ তাকে সান্ত্বনা দেয়। রেগে গেলে কেউ তার কথা শোনে। মন খারাপ হলে কেউ পাশে বসে থাকে। এ রকম হাজারো অভিজ্ঞতা শিশুকে ধীরে ধীরে নিজের আবেগ বুঝতে ও সামলাতে সাহায্য করে।

আবেগ সামলানোর সঙ্গে মস্তিষ্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার সম্পর্ক আছে। একে বলে এক্সিকিউটিভ ফাংশন। এই অংশ আমাদের মস্তিষ্কের ট্রাফিক পুলিশের মতো। এর সাহায্যে আমরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারি, চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি এবং কোনো কাজ করার আগে একটু থামতে পারি।

যেমন, তুমি হয়তো খুব রেগে গেলে সঙ্গে সঙ্গে কাউকে ধাক্কা না দিয়ে নিজেকে থামাতে পারো। হয়তো স্থান-কালের হিসাব রেখে তুমি ঠিক করতে পারো, কোথায় মাথা গরম করবে আর কোথায় করবে না। যেমন, খেলার মাঠে তুমি হয়তো বন্ধুর সঙ্গে গলা চড়িয়ে কথা বলতে পারো, কিন্তু পরীক্ষার হলে নিশ্চয়ই শিক্ষকের সঙ্গে একই ব্যবহার করবে না। শিক্ষকের সঙ্গে যে গলা চড়িয়ে কথা বলা যায় না, এটা তুমি ধীরে ধীরে পরিবেশ থেকে শিখেছ। এই সবকিছুর সঙ্গে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক আছে।

কষ্টকর পরিস্থিতি সহ্য করার ক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিছু মনের মতো না হলেই যে রাগ করতে হবে, তা নয়। অপেক্ষা করা, হতাশা সামলানো কিংবা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু মেনে নেওয়াও শিখতে হয়। শিশুর জীবনের প্রথম দিকে এসব কাজ মূলত বড়রাই করে দেন। শিশু কাঁদলে মা-বাবা তাকে শান্ত করেন। ভয় পেলে আশ্বস্ত করেন। রেগে গেলে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করেন। ধীরে ধীরে শিশু নিজেই এসব করতে শেখে।

আরও পড়ুন
আপনি শান্ত থাকলে তারাও ধীরে ধীরে শিখবে কীভাবে আবেগ সামলাতে হয়
মডেল: আরিফুর রহমান ও আভিন। ছবি: প্রথম আলো

বড়রা শিশুর আবেগ সামলাতে সাহায্য করেন যেভাবে

শিশুর মস্তিষ্কের আবেগ সামলানোর ব্যবস্থা ছোটবেলায় পুরোপুরি তৈরি থাকে না। তাই এ সময় মা-বাবা বা যত্ন নেওয়া বড়রা একধরনের বাইরের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেন।

শিশু যখন নিজেকে শান্ত করতে পারে না, তখন বড়দের শান্ত আচরণ তাকে সাহায্য করে। নিরাপদ ও নিয়মিত যত্ন শিশুর মস্তিষ্কের আবেগের সঙ্গে যুক্ত অংশগুলোর বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে আছে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। মস্তিষ্কের এই অংশ চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের মতো কাজে সাহায্য করে।

সহজ করে বললে, শিশু প্রথমে বড়দের কাছ থেকে শান্ত হতে শেখে। বড়রা তাকে শান্ত হতে সাহায্য করেন। সেই অভিজ্ঞতা বারবার ঘটতে থাকলে শিশু একসময় নিজেও শান্ত হওয়ার উপায় শিখতে পারে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় কো-রেগুলেশন বা একসঙ্গে আবেগ সামলানো। প্রথমে বড়রা শিশুকে আবেগ সামলাতে সাহায্য করেন। পরে সেই দক্ষতা ধীরে ধীরে শিশুর নিজের মধ্যে তৈরি হয়। তখন সে নিজেই নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। একে বলে সেলফ-রেগুলেশন বা আত্মনিয়ন্ত্রণ।

বড়দের শান্ত উপস্থিতি শিশুকে সাহায্য করে

শিশু কষ্টে থাকলে মা-বাবার উপস্থিতি তার মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, নবজাতকদের মায়ের বুকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে রাখলে (স্কিন টু স্কিন) শিশুদের ব্যথার অনুভূতি কমে। গবেষকেরা নবজাতকের গোড়ালিতে ছোট একটি সুচ ফোটানোর সময় মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। যেসব শিশুকে মায়ের বুকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে রাখা হয়েছিল, তাদের তুলনায় কাপড় পরা অবস্থায় কোলে থাকা শিশুদের মস্তিষ্কে ব্যথার প্রতিক্রিয়া বেশি দেখা গিয়েছিল।

এই প্রভাব শুধু নবজাতকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আরেকটি গবেষণায় শিশুদের মস্তিষ্কের ছবি পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, অপরিচিত কারও ছবির বদলে নিজের মায়ের ছবি দেখলে শিশুদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামের অংশের প্রতিক্রিয়া কমে যায়। এই অংশ আবেগ, বিশেষ করে ভয় ও বিপদের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।

মায়ের ছবি দেখার সময় অ্যামিগডালা ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের মধ্যে সংযোগও তুলনামূলকভাবে পরিণত অবস্থার মতো দেখা গিয়েছিল। শিশুদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাতেও উন্নতি দেখা যায়। তবে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একই প্রভাব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, শিশুর মস্তিষ্ক যখন নিজে থেকে আবেগ সামলানোর দক্ষতা পুরোপুরি অর্জন করেনি, তখন বড়দের স্থির ও শান্ত উপস্থিতি তাকে সাহায্য করতে পারে।

আরও পড়ুন
রাগ না করে সন্তানের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

শিশুরা রেগে গেলে তুমি কী করতে পারো

শিশু যখন খুব রেগে যায়, তখন তাকে বোঝানো সব সময় সহজ নয়। এমন মুহূর্তে কয়েকটি বিষয় কাজে আসতে পারে।

১. প্রথমে নিজেকে শান্ত করো। শিশু চিৎকার করছে বলে তোমাকেও চিৎকার করতে হবে না। ধীরে শ্বাস ছাড়ো। গলার স্বর নিচু রাখো। সম্ভব হলে শিশুর চোখের সমান উচ্চতায় বসো। তোমার শান্ত আচরণ তাকে নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করতে পারে।

২. কম কথা বলো। খুব রেগে গেলে শিশুর মস্তিষ্ক যুক্তি বুঝতে পারে না। তাই সেই মুহূর্তে লম্বা বক্তৃতা না দেওয়াই ভালো। সংক্ষেপে বলতে পারো, ‘তোমার বানানো টাওয়ারটা ভেঙে গেছে বলে খুব রাগ হচ্ছে, তাই না?’

তবে সবার ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি কাজ করে না। কোনো শিশুকে তার অনুভূতির কথা বললে সে আরও উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে। তোমার পরিচিত শিশুটির ক্ষেত্রে এমন হলে রাগের মুহূর্তে তার অনুভূতি নিয়ে কথা বলার জন্য জোর কোরো না। বরং নিজে শান্ত থাকো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে কথা বলো।

৩. নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকো, কিন্তু শিশুকে নিরাপদ রাখো। শান্ত থাকার অর্থ এই নয় যে শিশুর প্রতিটি দাবি মেনে নিতে হবে। কোনো কাজ করতে নিষেধ করলে সেই নিয়মে স্থির থাকতে পারো। তবে রাগ করে অপমান করা বা ভয় দেখানোর দরকার নেই। কোমল থেকেও দৃঢ় থাকা যায়। আদর করে বা ভালোবেসেও শিশুকে ‘না’ বলতে পারো।

৪. সময় দাও। অনেক শিশুর রাগ কমতে কিছুটা সময় লাগে। এ সময় তার কাছাকাছি থাকো। মাঝেমধ্যে কাছাকাছি থাকাই শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় সাপোর্ট। তবে সে যদি স্পর্শ পছন্দ না করে, জোর করে জড়িয়ে ধরবে না। অনেক সময় শিশু শুধু বড় কাউকে পাশে পেলেই নিজেকে নিরাপদ মনে করে।

৫. রাগ কমলে আবার কাছে টানো। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর শিশুকে আদর করতে পারো। প্রয়োজন হলে কিছু খেতে দিতে পারো। বলতে পারো, ‘আজকের ঘটনাটা বেশ কঠিন ছিল, তাই না?’ এতে শিশু বুঝতে পারে, রাগ বা কান্না হলেও তার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়নি।

আরও পড়ুন

রাগের মুহূর্তে শিশুকে শেখানো উচিত নয়

রাগের মুহূর্তে শিশুকে আবেগ সামলানো শেখানোর ভালো সময় নয়। বরং সে যখন শান্ত থাকে, তখনই বেশি শেখানো সম্ভব। গল্পের বই পড়ার সময় চরিত্রগুলোর অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে পারো। যেমন, গল্পের কোনো চরিত্র খেলায় হেরে গেলে তার কেমন লাগতে পারে? সে রাগ করলে কী করতে পারে? এভাবে শিশু অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখে।

একসঙ্গে শান্ত হওয়ার কিছু কৌশলও অনুশীলন করতে পারো। যেমন, কল্পনা করো সামনে একটি জন্মদিনের মোমবাতি জ্বলছে। এবার ধীরে ফুঁ দিয়ে সেটি নেভানোর চেষ্টা করো। এভাবে ধীরে শ্বাস ছাড়ার অনুশীলন করা যায়।

কিছু খেলাও আত্মনিয়ন্ত্রণের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। যেমন, ‘রেড লাইট, গ্রিন লাইট’, ‘সাইমন সেজ’ কিংবা গান চলার সময় নাচতে থাকা এবং গান থামলে স্থির হয়ে যাওয়া। এসব খেলায় শিশুকে নির্দেশ শুনতে হয়, অপেক্ষা করতে হয় এবং প্রয়োজন হলে নিজের কাজ থামাতে হয়।

এসব কাজের মাধ্যমে শিশু ধীরে ধীরে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার অনুশীলন করে। খেলতে খেলতে শেখা যায় বলে বিষয়টি তার কাছে কঠিনও লাগে না।

দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর ঘুম যেন ঠিকমতো হয়, খাওয়ার সময় যেন খুব বেশি দেরি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখো। এক কাজ থেকে অন্য কাজে যাওয়ার আগে তাকে জানিয়ে দাও। যেমন, ‘আর পাঁচ মিনিট খেলবে। তারপর গোসল করতে হবে।’ এতে হঠাৎ পরিবর্তনের ধাক্কা কিছুটা কমতে পারে।

শিশু যখন নিজের রাগ সামলাতে পারে, একটু অপেক্ষা করে কিংবা মারামারি না করে কথা দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করে, তখন সেটা লক্ষ করো। যখন দেখবে সে আগের চেয়ে দ্রুত শান্ত হচ্ছে, বা মারামারি না করে মুখে বলছে, তখন তার প্রশংসা করো। তাকে বলো, ‘তুমি রেগে গিয়েও এবার হাত দিয়ে মারোনি। কথায় বুঝিয়েছ। এটা ভালো করেছ।’

নিজের অগ্রগতিও লক্ষ করো। আগে যে পরিস্থিতিতে তুমি খুব রেগে যেতে, এখন সেখানে একটু শান্ত থাকতে পারছ কি না, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন
শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সাহায্য করতে হবে। কোনো কোনো সমস্যার সমাধান সে নিজেই করতে পারবে, কোনো ক্ষেত্রে মা–বাবার পরামর্শ লাগবে, আবার কোনো ক্ষেত্রে বড়দের সরাসরি হস্তক্ষেপ জরুরি
ছবি: কবির হোসেন

বড়দের শান্ত থাকা এত কঠিন কেন

শিশুকে শান্ত রাখতে হলে বড়দেরও শান্ত থাকা দরকার। কিন্তু এটা বলা যত সহজ, করা তত সহজ নয়।

শিশু যখন কষ্ট পায়, তখন তাকে ভালোবাসে এমন মানুষেরও মনে কষ্ট হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিয় কাউকে কষ্ট পেতে দেখলে মস্তিষ্কের কিছু অংশ সক্রিয় হয়, যেগুলো নিজের ব্যথা অনুভব করার সময়ও সক্রিয় হয়। এর মধ্যে আছে অ্যান্টেরিয়র ইনসুলা ও অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স।

তাই শিশুর কান্না বা চিৎকার শুনে বড়দেরও অস্থির লাগতে পারে। নিজের এই প্রতিক্রিয়া বুঝতে না পারলে কিংবা তা সামলানোর উপায় না জানলে মা-বাবাও পরিস্থিতির মধ্যে জড়িয়ে পড়তে পারেন। তখন শিশুকে শান্ত করার বদলে তাঁরাও রেগে যেতে পারেন।

এর সঙ্গে নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতাও জড়িয়ে থাকতে পারে। অনেক মা-বাবা এমন পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে বড়দের কথা সঙ্গে সঙ্গে মেনে চলাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা বা রাগ সামলানো শেখার সুযোগ হয়তো তাঁরা পাননি।

এখন নিজের সন্তান রাগ করলে তাঁদের মনে হতে পারে, ‘আমি ছোটবেলায় এমন করলে তো বকুনি খেতাম!’ তাঁরা হয়তো ধৈর্য ধরতে চান, কিন্তু পুরোনো অভ্যাস আর চিন্তা তাঁদের বাধা দেয়। এতে হতাশা, বিরক্তি কিংবা নিজের ওপর সন্দেহ আরও বাড়তে পারে। তার ওপর অনেক মা-বাবা প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকেন। কাজ, সংসার, সন্তানের যত্নসহ সব সামলাতে গিয়ে নিজের জন্য সময়ই পান না।

সেই সঙ্গে ক্লান্তি তো আছেই। ১১টি পশ্চিমা দেশে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১২ সালে মা-বাবারা ১৯৬৫ সালের তুলনায় সন্তানদের সরাসরি যত্ন নিতে বেশি সময় দিচ্ছিলেন। এখন সন্তানকে ঘিরে অনেক সময় ব্যয় করাকে ভালো অভিভাবকত্বের আদর্শ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সব পরিবারের পক্ষে সেই আদর্শ মেনে চলা সম্ভব হয় না। সময় ও অর্থের সীমাবদ্ধতা থাকে।

২০২৩ সালে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের এক জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮ শতাংশ মা-বাবা বলেছেন, বেশির ভাগ দিন তাঁদের মানসিক চাপ অসহনীয় পর্যায়ে থাকে। অন্য প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই হার ছিল ২৬ শতাংশ।

অর্থাৎ, সন্তানদের সঙ্গে বেশি সময় কাটালেই যে মা-বাবার মানসিক চাপ কমবে, তা নয়। তাই শিশুকে শান্ত রাখতে গিয়ে তুমি বা তোমার পরিবারের বড়রা যদি বারবার হিমশিম খাও, তাহলে সেটাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ভাবার দরকার নেই। অনেক পরিবারই এমন চাপের মধ্যে থাকে।

আরও পড়ুন

অনেক শিশুরই কি এখন আবেগ সামলাতে সমস্যা হচ্ছে

শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শিক্ষক ও বাবা–মায়েদের আলোচনা বাড়ছে। এর পেছনে কিছু গবেষণার তথ্যও আছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০ জনের বেশি কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকের মধ্যে একটি জরিপ চালানো হয়। তাঁরা সবাই লেক্সিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক পড়াশোনা শেখানোর কর্মসূচি ব্যবহার করতেন। জরিপে ৮২ শতাংশ শিক্ষক বলেছেন, আগের বছরগুলোর শিশুদের তুলনায় নতুন শিক্ষার্থীরা সামাজিক ও আবেগগত দক্ষতায় কম প্রস্তুত ছিল। বিশেষ করে অন্যের সঙ্গে জিনিস ভাগ করে নেওয়া, একসঙ্গে কাজ করা এবং নিজের আবেগ সামলানোর ক্ষেত্রে তাদের সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছিল।

তবে এই জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষকেরা নিজেরাই অংশ নিতে আগ্রহী হয়েছিলেন। তাই একে যুক্তরাষ্ট্রের সব কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকের মতামত হিসেবে ধরা যাবে না। তারপরও মহামারির সময় শিশুদের বিকাশ নিয়ে করা কিছু গবেষণার সঙ্গে এর ফল মিলে যায়।

গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন, এর পেছনে ঠিক কোন কোন কারণ কাজ করেছে। একটি প্রশ্ন হলো, শিশুরা যদি খুব ছোট বয়স থেকেই বেশি সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে কাটায়, তাহলে কি বড়দের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলা, খেলা ও প্রতিক্রিয়া আদান-প্রদানের সুযোগ কমে যায়? কারণ, এসব আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই শিশুরা নিজের আবেগ সামলানোর অনুশীলন করে।

কোভিড-১৯ মহামারিও একটি সম্ভাব্য কারণ। স্কুল বন্ধ থাকা ও ঘরে আটকে থাকার সময় শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বদলে গিয়েছিল। কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, সে সময় শিশুদের এক্সিকিউটিভ ফাংশন বিকাশের গতি কমে গিয়েছিল। পরে সেই গতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতেও সময় লাগছে। স্কুলে পড়ত বা স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল, এমন শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট।

তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব শিশু আর কখনো আবেগ সামলাতে শিখবে না। গবেষণা বরং আশার কথাই বলছে। যথাযথ সহায়তা, নিয়মিত দৈনন্দিন অভ্যাস এবং অনুশীলনের সুযোগ পেলে শিশুরা এই দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

আরও পড়ুন
শিশুর ঘুম, খাওয়া, আচরণ বা মনোযোগে পরিবর্তন লক্ষ করলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
মডেল: অদ্রি আহসান। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া দরকার

সব শিশু এক রকম নয়। কেউ খুব অল্পতেই রেগে যায়। কেউ আবার খুব কমই রাগ করে। ছোট শিশুদের মধ্যে রাগ, কান্না কিংবা জেদ দেখানোর মাত্রাও আলাদা হতে পারে।

তবে কোনো শিশুর রাগ বা শারীরিক আক্রমণাত্মক আচরণ তার বয়স ও বিকাশের তুলনায় বেশি বলে মনে হলে, কিংবা তা নিয়ে মা-বাবার দুশ্চিন্তা থাকলে শিশুবিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা ভালো। শিশুর শরীরে কোনো সমস্যা আছে কি না, চিকিৎসক তা খতিয়ে দেখতে পারেন। যেমন, ব্যথা, ঘুমের সমস্যা, শব্দ বা স্পর্শের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, কানে শোনার সমস্যা কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্য। এসব সমস্যার কারণে শিশুর অস্বস্তি বাড়তে পারে। ফলে সামান্য ঘটনায়ও সে খুব বেশি রেগে যেতে পারে।

প্রয়োজনে চিকিৎসক ও মা-বাবা মিলে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার আছে কি না, তা ঠিক করতে পারেন। কখনো উদ্বেগজনিত সমস্যা, এডিএইচডি কিংবা অটিজমের মতো বিষয়গুলো মূল্যায়ন করার প্রয়োজন হতে পারে। এডিএইচডি থাকা অনেক শিশুর মনোযোগ ধরে রাখা, নিজের আচরণ থামানো কিংবা হঠাৎ কোনো কাজ করে ফেলা নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হয়। এমন শিশুর রাগ সামলাতেও অসুবিধা হতে পারে। সঠিকভাবে সমস্যাটি বুঝতে পারলে পরিবারের জন্য পরিস্থিতি সামলানো সহজ হয়।

অটিজম থাকা কিছু শিশুর ক্ষেত্রে শব্দ, আলো, স্পর্শ বা অন্য কোনো অনুভূতি খুব তীব্র মনে হতে পারে। হঠাৎ কোনো পরিবর্তন কিংবা অপ্রত্যাশিত কাজও তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। তখন তাদের রাগ বা কান্না অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পারার প্রকাশ হতে পারে। এটা ইচ্ছা করে অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা নয়।

এভাবে বিষয়টি বুঝতে পারলে মা-বাবা শিশুকে অন্য চোখে দেখতে পারেন। ‘সে ইচ্ছা করে এমন করছে’ ভাবার বদলে তাঁরা বুঝতে চেষ্টা করতে পারেন, ‘কোন বিষয়টা ওর জন্য এত কঠিন হয়ে উঠছে?’

তবে ছোট শিশুকে কোনো রোগের নাম দিয়ে বিচার করাও ঠিক নয়। অনেক মা-বাবার কাছে এ ধরনের মূল্যায়ন করানো কঠিন মনে হতে পারে। কেউ কেউ ছোট বয়সেই শিশুকে কোনো পরিচয়ের মধ্যে আটকে ফেলতে চান না। তাই কী করা উচিত, তা শিশুর প্রয়োজন বুঝে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করাই ভালো।

শিশুর রাগ বা কান্না চাইলেই বন্ধ করে দেওয়া যায় না। কারণ, নিজের আবেগ সামলানোর দক্ষতা এক দিনে তৈরি হয় না। এর জন্য সময় লাগে, অনুশীলন লাগে, আর দরকার হয় বড়দের সাহায্য।

প্রতিবার তুমি যখন রাগের মুহূর্তে শিশুকে শান্ত হতে সাহায্য করো, তখন সে নিজের আবেগ সামলানোর দক্ষতা অনুশীলন করে। একসময় সে এই দক্ষতা নিজেই ব্যবহার করতে শিখতে পারে। তাই শিশুর যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি নিজের যত্ন নেওয়াও জরুরি। ক্লান্ত হয়ে পড়লে বিশ্রাম নাও। প্রয়োজন হলে পরিবারের অন্যদের সাহায্য চাও।

আর শিশুর রাগ বা কান্না যদি খুব ঘন ঘন হয়, অনেকক্ষণ ধরে চলে কিংবা তার নিজের বা অন্য কারও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে দ্বিধা কোরো না। শিশুর জন্য সাহায্য চাওয়া মা-বাবার ব্যর্থতা নয়; বরং তার প্রয়োজন বুঝে পাশে দাঁড়ানোরই একটি উপায়।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে ডটকম

আরও পড়ুন