পড়ি কিন্তু মনে থাকে না কেন

কোনো বিষয় সত্যিই বুঝেছ কি না, সেটি যাচাই করার ভালো উপায় হলো নিজের ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করাপ্রথম আলো ফাইল ছবি

আর কয়েক দিন পর পরীক্ষা। সারা দিন বই নিয়ে পড়াশোনা করাই স্বাভাবিক। ধরলাম সারা দিন তুমি পড়েছ। কিন্তু পরদিন বই খুলে দেখলে, গতকাল কী পড়েছিলে, তার বেশির ভাগটাই মনে নেই! তখন তোমার মনে হতে পারে, ‘আমার মনে হয় স্মৃতিশক্তিই খারাপ!’

আসলে বিষয়টি সব সময় এমন নয়। পড়া মনে রাখার সঙ্গে শুধু স্মৃতিশক্তির সম্পর্ক নেই। আমরা কীভাবে পড়ছি, পড়ার পর কতটা মনে করার চেষ্টা করছি, কত দিন পরপর আবার পড়ছি এবং কতটা ঘুমাচ্ছি, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কে নতুন তথ্য শেখা ও পরে তা মনে করার একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। সেই প্রক্রিয়াকে মাথায় রেখে পড়লে অনেক বেশি শেখা সম্ভব।

কেন পড়া ভুলে যাই?

জার্মান মনোবিজ্ঞানী হারমান এবিংহাউস উনিশ শতকে মানুষের ভুলে যাওয়ার ধরন নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাঁর গবেষণা থেকে দেখা যায়, নতুন কিছু শেখার পর সেটি ভুলে যাওয়ার হার শুরুতে দ্রুত হয়। পরে ভুলে যাওয়ার গতি কমে আসে। এটিই পরিচিত ‘ফরগেটিং কার্ভ’ নামে। পরে আরও কিছু গবেষণায়ও এই প্রবণতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এর মানে এই নয় যে পড়ার ২৪ ঘণ্টা পর সবার ঠিক ৭০ শতাংশ তথ্য হারিয়ে যাবে। কতটা মনে থাকবে, তা নির্ভর করে কী পড়া হয়েছে, কত ভালোভাবে শেখা হয়েছে এবং পরে সেটি আবার মনে করার চেষ্টা করা হয়েছে কি না, এসবের ওপর।

আরেকটি সমস্যা হয় শুধু বই পড়লে। এক পৃষ্ঠা বারবার পড়লে অনেক সময় মনে হয় বিষয়টি বেশ ভালোভাবে জেনে গেছি। কিন্তু বই বন্ধ করে যদি মনে করার চেষ্টা করি, তখন দেখা যায় অনেক কিছুই মনে করতে পারছি না। কারণ, বারবার পড়া আর নিজের স্মৃতি থেকে তথ্য বের করে আনা এক জিনিস নয়। নিজেকে পরীক্ষা করা বা ‘অ্যাকটিভ রিকল’ দীর্ঘ সময় মনে রাখার জন্য বেশ কার্যকর এক পদ্ধতি।

ধরো, তুমি জীববিজ্ঞানের একটি অধ্যায় পড়লে। বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করো, কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ার কাজ কী? তখন উত্তরটি মাথার মধ্যে ভেবে বের করার চেষ্টা করতে হবে। এই চেষ্টা হবে তোমার শেখার অংশ। বারবার বই খুলে উত্তরটি আবার পড়ে নেওয়ার চেয়ে এভাবে মনে করার চেষ্টাটা বেশি কাজে দেয়।

আরও পড়ুন

এক দিনে সব পড়ে লাভ নেই

পরীক্ষার আগের রাতে অনেক কিছু পড়ে ফেলার অভ্যাস আমাদের বেশ পরিচিত। এটাকে বলা যায় একসঙ্গে সব পড়া বা ক্র্যামিং। এতে পরদিন পরীক্ষায় কিছু সুবিধা তুমি পেতেই পারো। কিন্তু দীর্ঘদিন মনে রাখার জন্য পড়াশোনাটাকে কয়েক দিনে ভাগ করে নিতে হবে।

এখানেই আসে ‘স্পেসড রিপিটিশন’ বা বিরতি দিয়ে বারবার পড়ার কৌশল। একটি বিষয় আজ পড়লে তো কয়েক দিন পর আবার সেটি মনে করার চেষ্টা করলে। এরপর আরও কিছুদিন পর আবার অনুশীলন করলে। এভাবে পড়লে দীর্ঘ মেয়াদে স্মৃতিতে পড়াটা থেকে যাবে।

অন্যকে শেখালেও কাজে লাগে

কোনো বিষয় সত্যিই বুঝেছ কি না, সেটি যাচাই করার ভালো উপায় হলো নিজের ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করা। ধরো, তুমি আলোর প্রতিফলন পড়েছ। এবার এমনভাবে বন্ধুকে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করো, যেন সে এ সম্পর্কে কিছুই জানে না।

কথা বলতে গিয়ে যদি আটকে যাও, বুঝবে ওই জায়গাটা হয়তো পুরোপুরি বোঝোনি। তখন আবার বইয়ে ফিরে যাও। এভাবে নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করা, প্রশ্ন করা এবং আগের জ্ঞানের সঙ্গে নতুন তথ্যের সম্পর্ক তৈরি করা শেখা সহজ। এটি ‘ফাইনম্যান টেকনিক’ নামে পরিচিত।

আরও পড়ুন
পরীক্ষার আগের রাতে সারা রাত জেগে থাকার বদলে নিয়মিত ঘুমানো বেশি বুদ্ধিমানের কাজ

ছবি দিয়ে মনে রাখো

সব তথ্য শুধু শব্দ দিয়ে মনে রাখতে হবে, এমন নয়। কোনো বিষয়কে ছবি, মানচিত্র, ছক বা নিজের বানানো কোনো উদাহরণের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে সেটি মনে রাখা সহজ হতে পারে। বিশেষ করে কোনো তালিকা বা কঠিন শব্দ মনে রাখতে ছোট কোনো সূত্র বা শব্দসংক্ষেপ বানানো যায়।

ধরো, কয়েকটি শব্দের প্রথম অক্ষর নিয়ে এমন একটি শব্দ বানালে, যেটি সহজে মনে থাকে। আবার ইতিহাসের কোনো ঘটনা পড়লে শুধু সাল মুখস্থ না করে ঘটনাটিকে একটি গল্প বা দৃশ্য হিসেবে কল্পনা করতে পারো। এতে তথ্যের সঙ্গে মস্তিষ্কে আরও কিছু সংযোগ তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

ঘুমও পড়াশোনার অংশ

‘আরেকটু পড়ি, ঘুম পরে হবে’, পরীক্ষার সময় এই চিন্তা অনেকেরই হয়। কিন্তু ভালোভাবে শেখার জন্য ঘুমকে বাদ দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আমরা জেগে থাকা অবস্থায় নতুন তথ্য শিখি। এরপর ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সেই স্মৃতির প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। বিশেষ করে ঘুমের বিভিন্ন পর্যায় নতুন শেখা তথ্য স্মৃতিতে পাকাপোক্তভাবে জমাতে সাহায্য করে। ঘুমের অভাব শেখা, মনোযোগ ও স্মৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই পরীক্ষার আগের রাতে সারা রাত জেগে থাকার বদলে নিয়মিত ঘুমানো বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। কিশোরদের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতি রাতে ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। শুধু পড়া মনে রাখার জন্য নয়, পরদিন মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্যও ভালো ঘুম দরকার। এ জন্য ফোনকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারো।

আরও পড়ুন