টানা ৭৩ ঘণ্টা পড়ে বিশ্বকে কী বার্তা দিলেন এই লেখক

এই হারিয়ে যেতে বসা পড়ার সংস্কৃতিকে আবার ফিরিয়ে আনতে সবাইকে চমকে দিয়েছেন কেনীয় লেখক ইমানুয়েল মুচুই

আফ্রিকার একটি রাষ্ট্র কেনিয়া। সেখানে বই পড়ার অভ্যাস দিন দিন কমে যাচ্ছে। এই হারিয়ে যেতে বসা পড়ার সংস্কৃতিকে আবার ফিরিয়ে আনতে সবাইকে চমকে দিয়েছেন কেনীয় লেখক ইমানুয়েল মুচুই। টানা ৭৩ ঘণ্টা বই পড়ার এক অবিশ্বাস্য ম্যারাথন শেষ করে তিনি পুরো দেশের মানুষের নজর কাড়েন। মানে তিনি ৩ দিন ১ ঘণ্টা টানা বই পড়েছেন।

নাইরোবির বিখ্যাত ‘নুরিয়া বুক স্টোর’-এ আয়োজিত এই চ্যালেঞ্জের উদ্দেশ্য কোনো খ্যাতি লাভ বা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানো ছিল না। তিনি সাধারণ মানুষকে শুধু একটাই বার্তা দিতে চেয়েছেন, আমাদের জীবনে আজও বইয়ের গুরুত্ব ঠিক কতটা অপরিসীম।

লোকদেখানো নয়, বইয়ের পাতায় টানা তিন দিন

সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে নিজের পড়ার চ্যালেঞ্জ শুরু করেন কেনিয়ান লেখক ইমানুয়েল মুচুই। টানা তিন দিনেরও বেশি সময় বই পড়ার জন্য মানসিকভাবে একপ্রকার পণই করেছিলেন তিনি। পুরো ম্যারাথনে তাঁকে বিরতি নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল সব মিলিয়ে মাত্র ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। অর্থাৎ তার এই পুরো সময়টিই কেটেছে ক্লান্তি ভুলে বইয়ের পাতায় চোখ রেখে।

আরও পড়ুন

তবে এই ঘটনার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, ইমানুয়েল মুচুই কিন্তু কোনো বিশ্বরেকর্ড ভাঙার পেছনে ছোটেননি। নাইজেরিয়ার স্যামসন আজাও ২১৫ ঘণ্টা পড়ার যে রেকর্ড গড়েছিলেন, সেটি ভাঙা তার উদ্দেশ্য ছিল না। মুচুইয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল কেনিয়ার মানুষের মনে হারিয়ে যাওয়া বই পড়ার অভ্যাসটি আবার নতুন করে জাগিয়ে তোলা। তবু টানা ১৭টি বই পড়া শেষে চ্যালেঞ্জ পূরণ করে মুচুই হেসে বলেন, পরের বার নিশ্চয়ই বিশ্বরেকর্ড ভাঙব।

কেনিয়ার মানুষের হারিয়ে যাওয়া বই পড়ার আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে মুচুইয়ের এই অভিনব লড়াই এখন দেশটির তরুণদের মধ্যে অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সকাল ১০টা ৫১ মিনিটে নিজের পড়ার চ্যালেঞ্জ শুরু করেন কেনিয়ান লেখক ইমানুয়েল মুচুই

কেনিয়ার শিক্ষার্থীদের পড়ার অভ্যাস ও বাস্তব অবস্থা

সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে দেখা গেছে, কেনিয়ায় গভীর মনোযোগ দিয়ে বই পড়ার জায়গা দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল বিনোদন। বড় বড় লেখা পড়ার বদলে মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার ছোট ভিডিও আর সংক্ষিপ্ত লেখায় বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এমনকি খবরের কাগজ পড়ার হারও সেখানে কমে গেছে।

তবে বই পড়ার মনোযোগ হারিয়ে যাওয়ার এই সমস্যা শুধু কেনিয়ার একার নয়। পুরো বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ এখন কোনো বইয়ের বেস্ট সেলার তালিকার চেয়ে অনলাইনে ভাইরাল হওয়া রিলসের ভিডিওর দিকেই বেশি ঝুঁকছে।

পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা উঠে এসেছে একটি স্থানীয় গবেষণায়। সেখানে দেখা গেছে, কেনিয়ার অনেক শিক্ষার্থীই না বুঝে মুখস্থ করে পরবর্তী ক্লাসে উঠে যাচ্ছে। এমনকি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও তৃতীয় শ্রেণির সাধারণ ইংরেজি গল্প পড়তে বা বুঝতে পারে না।

ঠিক এই কারণেই লেখক ইমানুয়েল মুচুইয়ের ৭৩ ঘণ্টার বই পড়ার ম্যারাথনে নামেন। ডিজিটাল আসক্তি ও স্ক্রলিংয়ের যুগে হারিয়ে যেতে বসা পড়ার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এটি এখন এক শক্ত প্রতিবাদ ও প্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন
কেনিয়ার মানুষের হারিয়ে যাওয়া বই পড়ার আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে মুচুইয়ের এই অভিনব লড়াই এখন দেশটির তরুণদের মধ্যে অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে

কেনিয়া কি সত্যিই গল্প পড়া ভুলে গেছে?

গবেষণায় যতই উদ্বেগের খবর আসুক না কেন, আসল সত্য কিন্তু পুরোপুরি আলাদা। মানুষ যে আর গল্প পড়ছে না বা বই পড়া একদম ছেড়ে দিয়েছে, তা কিন্তু একেবারেই নয়।

কেনিয়ার অনলাইন জগতে এই বই পড়া নিয়ে বেশ দারুণ বিতর্ক চলছে। সেখানকার অনেক পাঠকের মতে, মানুষ এখনো পড়তে ভালোবাসে। তবে তাদের পড়ার ধরন আর আগের মতো কাগজের পাতায় আটকে নেই, বদলে গেছে মাধ্যম।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটে বহু কেনিয়ান পাঠক নিয়মিত তাঁদের প্রিয় বই নিয়ে আড্ডা দেন। সেখানে হরর, রহস্য গল্প, রূপকথা, দর্শন কিংবা আফ্রিকান ইতিহাস সবই জায়গা করে নেয়। কেউ বাসে চেপে যেতে যেতে পড়ার অভিজ্ঞতা জানান, কেউ শোনেন অডিওবুক, আবার অনেকেই ডিজিটাল মাধ্যমে ইবুক পড়তে ভালোবাসেন।

এক পাঠক তো বেশ মজার এক যুক্তি দিয়ে বললেন, কেনিয়ার মানুষ আসলে আগের চেয়ে অনেক বেশি পড়ছে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে মানুষ এখন সাধারণ বইয়ের বদলে ব্লগ, অনলাইনের বড় বড় আর্টিকেলের লিংক কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার লম্বা থ্রেড বেশি পড়ছে।

কথাটি কিন্তু মিথ্যা নয়। বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম প্রতিদিন অসংখ্য ক্যাপশন, পোস্ট, নিউজলেটার আর মেসেজ তো ঠিকই পড়ে চলেছে। তাই মূল সমস্যা মানুষের না পড়া নয়। আসল সংকট হলো গভীর ও মনোযোগ দিয়ে না পড়া। যেটা বই পড়ার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও কল্পনাশক্তি বাড়াতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।

আরও পড়ুন
কেনিয়ার অনলাইন জগতে এই বই পড়া নিয়ে বেশ দারুণ বিতর্ক চলছে। সেখানকার অনেক পাঠকের মতে, মানুষ এখনো পড়তে ভালোবাসে

বই পড়ার গুরুত্ব কেন এত বেশি

বই পড়ার সবচেয়ে বড় গুণ হলো, এটি মানুষকে ধীরস্থির হতে শেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই দ্রুত গতির দুনিয়ায় বই পড়া আমাদের ধৈর্য বাড়াতে সাহায্য করে। শুধু তা–ই নয়, এটি আমাদের অচেনা সব ভাবনার জগতে নিয়ে যায় ও জ্ঞানের নতুন দরজা খুলে দেয়।

এ কারণেই কেনিয়ার লেখক ও শিক্ষাবিদরা বই পড়ার হার কমে যাওয়া নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দেশটিতে এমন এক সমাজ তৈরি হচ্ছে যেখানে মানুষ শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য পড়াশোনা করে। নিজের কৌতূহল বা মানসিক বিকাশ ঘটাতে কেউ বইয়ের পাতা উল্টায় না।

লেখক ইমানুয়েল মুচুই ঠিক এই অভ্যাসের বিরুদ্ধেই লড়াই শুরু করেছেন। টানা ৭৩ ঘণ্টা সবার সামনে বই পড়ে তিনি পড়ালেখার বিষয়টিকে ঘরের চারদেয়াল থেকে বের করে এনে সারা দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন। তাঁর এই অভিনব চেষ্টা সাধারণ মানুষের মনে দারুণ সব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আমরা কি আসলেই বই পড়া ছেড়ে দিচ্ছি? মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার কি আমাদের মনকে নষ্ট করছে?

সাহিত্যচর্চার নতুন ঠিকানা

মুচুইয়ের এই পড়ার ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয়েছিল কেনিয়ার বিখ্যাত ‘নুরিয়া বুকস্টোর’-এ। এই বুকস্টোরটি সেখানকার স্থানীয় লেখক ও বইপ্রেমীদের কাছে একটি অত্যন্ত ভালোবাসার জায়গা। ৭৩ ঘণ্টার এই লড়াই কেনিয়ার স্বাধীন বইয়ের দোকান, বুক ক্লাব ও অনলাইন সাহিত্যিক দলগুলোর অস্তিত্ব ও গুরুত্ব নতুন করে সবার সামনে তুলে ধরেছে।

সূত্র: থাওজেন লাইব্রেরিস ম্যাগাজিন
আরও পড়ুন