জার্মানিতে ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত শুঁয়োপোকা, পার্ক বন্ধ

একটি ছোট্ট শুঁয়োপোকা কি আস্ত একটি শহরকে অচল করে দিতে পারে? শুনতে অদ্ভুত লাগলেও জার্মানির বার্লিনসহ বিভিন্ন শহরে এখন ঠিক এই ব্যবস্থাপনাই চলছে। বিষাক্ত শুঁয়োপোকার মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের কারণে সেখানকার পার্ক ও খোলা জায়গাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এই শুঁয়োপোকাগুলোর নাম ‘ওক প্রোসেশনারি মথ’। এদের পুরো শরীর আণুবীক্ষণিক কাঁটাযুক্ত লোমে ঢাকা। এই লোমগুলোর মধ্যে একধরনের বিশেষ বিষ থাকে। মানুষের ত্বক বা চোখ এই লোমের সংস্পর্শে এলে অ্যালার্জির র‍্যাশ, চোখ লাল হওয়া এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হতে পারে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এই বিষাক্ত লোমগুলো খুব সহজে শরীর থেকে ভেঙে যায় এবং বাতাসের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই প্রাণীগুলো সাধারণত ওকগাছে সাদা ও রেশমি সুতার মতো বাসা তৈরি করে থাকে। আর এদের এই বাসাগুলোয়ও প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত লোম জমে থাকে। বর্তমানে বার্লিনে এই শুঁয়োপোকার আক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শার্লটেনবুর্গ-ভিলমার্সডর্ফ, স্পান্ডাউ ও ফ্রিডরিশহাইন-ক্রয়েৎসবের্গের মতো এলাকাগুলো এখন এই শুঁয়োপোকার মূল হটস্পট।

আরও পড়ুন

পরিস্থিতি এত খারাপ যে শহরের সুন্দর ও সবুজ পার্কগুলো এখন দেখতে অনেকটা ক্রাইম সিনের মতো লাগছে। সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে ও গাছের খুব কাছে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পার্কের চারপাশ লাল ও সাদা টেপ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। বার্লিনের শহরের সরকারের তথ্য অনুযায়ী, স্পান্ডাউ শহরের প্রায় ৩৯ একরের একটি বড় পার্কসহ আশপাশের স্কুল, দিবাযত্নকেন্দ্র ও রাস্তাঘাটও সাধারণ মানুষকে এড়িয়ে চলার অনুরোধ করা হয়েছে।

এই বিষাক্ত শুঁয়োপোকাগুলো দূর করার জন্য বিশেষ পরিচ্ছন্নতাকর্মী দল নামানো হয়েছে। তাঁরা এমন পোশাক পরেন, যা সাধারণত রাসায়নিক বর্জ্য পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করা হয়। মুখে থাকে বিশেষ ভেন্টিলেশন মাস্ক। বার্লিনের দ্বিতীয় বৃহত্তম পার্ক ইয়ুংফার্নহাইডে। সেখানকার কর্মীরা উঁচুতে ওঠার জন্য বিশেষ ক্রেন ব্যবহার করছেন। তাঁরা মাটি থেকে প্রায় ৬৫ ফুট উঁচুতে উঠছেন। তারপর গাছের ডালপালা থেকে শুঁয়োপোকার বাসাগুলো ধ্বংস করছেন। এই কাজে পরিষ্কারের বিশেষ ভ্যাকুয়াম মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

একটি ছোট শুঁয়োপোকার গায়ে ঠিক কতগুলো বিষাক্ত লোম থাকতে পারে বলে তোমার মনে হয়? সংখ্যাটা শুনলে চমকে উঠবে। একেকটি শুঁয়োপোকার শরীরে প্রায় ৭ লাখ পর্যন্ত আণুবীক্ষণিক বিষাক্ত লোম থাকে। আর এ কারণে জার্মানির পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সাধারণ কোনো ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করছেন না। তাঁরা এমন বিশেষ সাকশন ক্লিনার ব্যবহার করছেন, যা নিশ্চিত করে যে একটি লোমও যেন কোনোভাবে বাতাসে উড়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে না পারে।

আরও পড়ুন

পার্কের দেখভালের দায়িত্বে থাকা এক নগর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু একটি পার্কেরই প্রায় ২ হাজার গাছ এই পোকার উপদ্রবে পড়েছে। তবে পুরোপুরি নির্মূল করার কোনো উপায় আপাতত তাদের হাতে নেই। তাই তাদের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। কর্মীরা এখন পার্কের ভেতরের সাধারণ মানুষের চলাচলের রাস্তার সবচেয়ে কাছের গাছগুলো আগে পরিষ্কার করছেন।

কাজটি কিন্তু মোটেও সহজ নয়। কর্মীরা দিনে গড়ে ২০টি গাছ পরিষ্কার করার লক্ষ্য নিয়ে নামলেও পোকার বাসার সংখ্যার ওপর নির্ভর করে সময় বদলে যায়। মাত্র একটি গাছেই প্রায় ৮০০টি বাসা ছিল, যা পরিষ্কার করতে একটি দলের পুরো দিন পার হয়ে গেছে।

নগর প্রকৃতিবিশেষজ্ঞ ডার্ক এলার্ট জানিয়েছেন, আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার বার্লিনে এই শুঁয়োপোকার সংখ্যা অনেক বেশি। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই মূলত এমনটা ঘটছে। এই ওক প্রোসেশনারি মথ শুঁয়োপোকাগুলোর আদি বাসস্থান আসলে দক্ষিণ ইউরোপে। কিন্তু গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া এই পোকাদের বংশবৃদ্ধির জন্য একদম উপযুক্ত। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এরা এখন ধীরে ধীরে উত্তর দিকে। অর্থাৎ জার্মানির দিকে ছড়িয়ে পড়ছে, যা প্রকৃতির জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় হুমকি।

আরও পড়ুন

এই উপদ্রব এখন শুধু বার্লিনেই সীমাবদ্ধ নেয়। হামবুর্গ ও পশ্চিম জার্মানির নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যেও এটি মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি এআই প্রযুক্তির সাহায্যে বিশেষ মানচিত্র তৈরি করেছে, যাতে সাধারণ মানুষ ঘরে বসে জানতে পারেন কোন কোন পার্ক বা এলাকা এখন ঘোরার জন্য নিরাপদ।

এই শুঁয়োপোকা বা এদের বাসার আশপাশে যাওয়া কিংবা স্পর্শ করা একেবারেই নিষেধ। কারণ, এদের লোমের বিষ শরীরে ঢুকলে শুধু চুলকানি বা শ্বাসকষ্টই নয়। বরং অ্যানাফাইল্যাকটিক শকের মতো মারাত্মক ও প্রাণঘাতী অ্যালার্জি হতে পারে।

তাই বার্লিনের নগর কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে পরামর্শ দিচ্ছে, যেকোনো পার্ক থেকে ঘুরে আসার পর যেন অবশ্যই পরনের পোশাক খুব ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা হয়। সেই সঙ্গে পোকার লোম বাতাসে উড়ে যেন ঘরে ঢুকতে না পারে, সে জন্য পার্কের আশপাশের এলাকার মানুষদের ঘরের দরজা–জানালা বন্ধ রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।

সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন