পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো চাকা কোথায় রাখা আছে, বয়স কত
চাকা মানুষের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আবিষ্কার। চাকা ছাড়া আমাদের আধুনিক জীবন চিন্তাই করা যায় না। সবখানেই চাকার ব্যবহার আছে। গাড়ি, ট্রেন বা কলকারখানা—কোনো কিছুই চাকা ছাড়া চলে না। তুমি কি জানো, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো কাঠের চাকাটি কোথায় আছে? সেটি দেখতে কেমন? সেটি কত বছরের পুরোনো?
২০০২ সালের কথা। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবিয়ানা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে একটি জলাভূমিতে খননকাজ চালাচ্ছিলেন। জায়গাটির নাম লুবিয়ানা মার্শ। কাদার অনেক গভীর থেকে তাঁরা একটি পুরোনো কাঠের চাকা উদ্ধার করেন। শুধু চাকা নয়, সঙ্গে একটি অক্ষদণ্ড বা এক্সেলও পাওয়া যায়।
উদ্ধার করার পর বিজ্ঞানীরা চাকাটির সঠিক বয়স মাপতে চাইলেন। এ জন্য তাঁরা রেডিওকার্বন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করেন। রেডিওকার্বন ডেটিং হলো একটি দারুণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। প্রাচীন কোনো বস্তুর ভেতরে থাকা কার্বনের আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে এর বয়স মাপা যায়। বিজ্ঞানীরা ফলাফল দেখে অবাক হয়ে গেলেন! চাকাটি অন্তত ৫ হাজার ১০০ থেকে ৫ হাজার ৩৫০ বছরের পুরোনো! এটি যিশুখ্রিষ্টের জন্মের প্রায় তিন হাজার বছর আগের তৈরি। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত চাকাগুলোর মধ্যে এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো কাঠের চাকা।
চাকাটি দেখতেও বেশ অদ্ভুত, বেশ মজবুতও বটে। এর ব্যাস প্রায় ৭২ সেন্টিমিটার। চাকাটির পুরুত্ব ৫ সেন্টিমিটার। এটি অ্যাশগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি। এর অক্ষদণ্ড বা এক্সেলটি বানানো ওকগাছের শক্ত কাঠ দিয়ে। এক্সেলটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৪ সেন্টিমিটার। চাকাটি প্রায় ৮০ বছর বয়সী একটি অ্যাশগাছ থেকে বানানো হয়েছিল। তার মানে, প্রাচীন কারিগরেরা শক্ত ও পরিণত কাঠ বেছে নিতে জানতেন।
প্রাচীন কারিগরেরা খুব নিখুঁতভাবে এই চাকা বানিয়েছিলেন। পুরো চাকাটি কাঠের দুটি বড় তক্তা জোড়া দিয়ে বানানো। তক্তা দুটিকে চারটি ছোট কাঠের টুকরা দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। চাকাটির মাঝখানে একটি চারকোনা ছিদ্র আছে। এক্সেলটিকে এই ছিদ্রের ভেতরে শক্ত করে আটকে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে চাকা ও এক্সেল একসঙ্গে ঘুরত।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি কোনো দুই চাকার ঠেলাগাড়ির অংশ ছিল। ঠেলাগাড়িটি ভারী জিনিস টানার কাজে ব্যবহার করা হতো। সময়টা ছিল তাম্রযুগ। তখনো লোহার ব্যবহার শুরু হয়নি। মানুষ কেবল তামার ব্যবহার শিখেছিল। সেই সময়ের পাথরের ও তামার তৈরি যন্ত্রপাতি দিয়েই এত সুন্দর চাকা বানানো হয়েছিল। এটি সত্যি মানুষের আদিম বুদ্ধিমত্তার এক দারুণ উদাহরণ।
এই চাকা কারা বানিয়েছিল? আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ওই জলাভূমি এলাকায় একদল মানুষ বাস করত। তাদের বলা হয় পাইল ডুয়েলার। তারা সরাসরি সমতল মাটির ওপর ঘর বানাত না, হ্রদ বা জলাভূমির পানিতে বড় বড় কাঠের খুঁটি পুঁতত। সেই খুঁটির ওপর মাচা বানিয়ে তৈরি করত কাঠের ঘর। তারা সেখানে ফসল ফলাত, পশু শিকার করত, কাঠ ও খাবার সংগ্রহ করত জঙ্গল থেকে। ভারী মালপত্র টানার জন্যই তারা এ ধরনের চাকার গাড়ি ব্যবহার করত।
সাধারণত মাটির নিচে কাঠ পচে যায়। কিন্তু এই কাঠের চাকাটি কীভাবে এত হাজার বছর টিকে ছিল? এর পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। জলাভূমির নিচে অক্সিজেনের পরিমাণ খুব কম থাকে। সেখানকার চারপাশ থাকে সব সময় ভেজা ও আর্দ্র। এমন পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস কাঠ পচাতে পারে না। তাই কাদার নিচে চাকাটি প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে ছিল।
এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের অনেক পুরোনো ধারণা বদলে দেয়। আগে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল অন্য রকম। তাঁরা ভাবতেন, চাকার ব্যবহার শুধু প্রাচীন মেসোপটেমিয়া অঞ্চলেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু লুবিয়ানার এই চাকা প্রমাণ করে ভিন্ন কথা। ইউরোপেও ঠিক একই সময়ে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল। সেখানকার মানুষেরাও ভারী কাজের জন্য চাকা বানাতে শিখেছিল।
প্রাচীন যুগের এই অসাধারণ চাকা এখন কোথায় আছে? এটি এখন স্লোভেনিয়ার সিটি মিউজিয়াম অব লুবিয়ানায় রাখা আছে। সেখানে খুব যত্ন করে চাকাটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। জাদুঘরটি এই চাকার জন্য একটি বিশেষ প্রদর্শনীরও আয়োজন করেছে। প্রদর্শনীতে এই চাকার সঙ্গে প্রাচীন মানুষদের জীবনযাত্রার অনেক কিছুই তুলে ধরা হয়। কখনো স্লোভেনিয়ায় গেলে এই জাদুঘর ঘুরে আসতে পারো। সেখানে মানুষের ইতিহাসের এই দারুণ সাক্ষীটিকে নিজের চোখে দেখতে পাবে।