বেশির ভাগ জিনসের রং কেন নীল

নীল রংটি বেশ গাঢ় হওয়ায় এতে ময়লা বা দাগ সহজে বোঝা যায় নাছবি: নিউইয়র্ক ম্যাগাজিন

দেখো তো তোমার আলমারিতে কয়টা জিনস প্যান্ট আছে? খেয়াল করলে দেখবে, এগুলোর মধ্যে কোন রঙের জিনস সবচেয়ে বেশি? বাজি ধরে বলা যায়, তোমার বেশির ভাগ জিনসই নীল রঙের। শুধু তোমার কেন, পুরো পৃথিবীতেই সবচেয়ে জনপ্রিয় জিনস হলো নীল রঙের ডেনিম। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, নীল রং কেন জিনসের জন্য এত পছন্দের হলো? কেন এটা লাল, সবুজ বা অন্য কোনো রঙের হলো না?

প্রথমেই বলে রাখি, জিনসের এই নীল রঙের কারণ শুধু ফ্যাশন নয়; বরং এর পেছনে আছে বিজ্ঞান। আছে দারুণ ইতিহাস। উনিশ শতকে যখন খনিশ্রমিকেরা কাজ করতেন, তখন তাঁদের এমন প্যান্টের প্রয়োজন ছিল, যা সহজে নোংরা হবে না এবং অনেক দিন টিকবে। ঠিক তখনই এক বিশেষ ধরনের নীল রঞ্জক বা ডাই ব্যবহার শুরু হয়। তাহলে চলো জেনে নেওয়া যাক, নীল রঙের সেই বিশেষ গুণটি আসলে কী ও কীভাবে এটি সারা বিশ্বের মানুষের প্রিয় রং হয়ে উঠল।

বেশির ভাগ জিনস নীল হওয়ার কারণটি উনিশ শতকের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ১৮৭৩ সালে যখন লেভি স্ট্রস ও জ্যাকব ডেভিস তাঁদের বিশেষ প্যান্ট তৈরির পেটেন্ট করেন, তখন তাঁরা ‘ইন্ডিগো’ নামে একটি নীল রং বেছে নিয়েছিলেন। ইন্ডিগো অন্য সব রঙের চেয়ে আলাদা। সাধারণ রং কাপড়ের সুতার ভেতরে ঢুকে যায়। কিন্তু ইন্ডিগো সুতার চারপাশে শুধু একটি স্তরের মতো লেগে থাকে। এর ফলে জিনস যত ব্যবহার করা হয় বা ধোয়া হয়, ওপরের নীল স্তরটি তত আলগা হয়ে আসে। এতে জিনসে একটি সুন্দর ‘ফেড এফেক্ট’ বা হালকা রঙের আভা তৈরি হয়, যা প্যান্টটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

আরও পড়ুন

নীল রং বেছে নেওয়ার পেছনে একটি ব্যবহারিক কারণও ছিল। নীল রংটি বেশ গাঢ় হওয়ায় এতে ময়লা বা দাগ সহজে বোঝা যায় না। তখনকার দিনে যাঁরা খনিতে বা কারখানায় ভারী কাজ করতেন, তাঁদের জন্য এটি ছিল বেশ সুবিধাজনক। কারণ, কাজ করার সময় তাঁদের প্যান্ট দ্রুত নোংরা হয়ে যেত। আর প্রতিদিন কাপড় বদলানো সম্ভব ছিল না। এ কারণেই নীল ডেনিম শ্রমিকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

শুরুর দিকে নীল রং ছিল বেশ দুর্লভ ও দামি

মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে এই নীল রঙের প্রতি আগ্রহী। নীল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একটি রং, যা চার হাজার বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মজার ব্যাপার হলো, এই রঙের সঙ্গে ভারতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গ্রিক শব্দ ‘ইন্ডিকন’ থেকে আধুনিক ‘ইন্ডিগো’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হলো ‘ভারত থেকে আসা বস্তু’।

শুরুর দিকে নীল রং ছিল বেশ দুর্লভ ও দামি। ইউরোপে আফগানিস্তান থেকে আনা একধরনের মূল্যবান পাথর গুঁড়া করে নীল রং তৈরি করা হতো। তাই এটি কেবল দামি শিল্পকর্মে ব্যবহার করা হতো। পরে যখন নীলগাছ থেকে এই রং তৈরি শুরু হয়, তখন এটি সাধারণ মানুষের নাগালে আসে। তবে এই নীল চাষের জন্য একসময় বাংলায় হাজার হাজার কৃষক নির্যাতিত ও নিহত হয়েছেন।

আরও পড়ুন

লেভি স্ট্রস যখন জিনস তৈরি শুরু করেন, তখন তিনি নীল রং ছাড়া আরও অনেক রং নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নীল রংটিই টিকে যায়। এর প্রধান কারণ ছিল এর কার্যকারিতা। নীল জিনস ময়লা হলেও দেখতে খারাপ লাগত না। বরং ব্যবহারের ফলে রং কিছুটা ফিকে হয়ে গেলে এটি আরও সুন্দর দেখাত।

ডেনিম কাপড়ের আসল রং কিন্তু নীল নয়, এটি অনেকটা ওটমিলের মতো হালকা ঘিয়ে বা বেজ রঙের

শুরুর দিকে প্রাকৃতিক নীল রং বা ইন্ডিগো ছিল অনেক দামি। ১৮৯০ সালের দিকে যখন কৃত্রিম বা ল্যাবরেটরিতে তৈরি নীল রং আবিষ্কৃত হয়, তখন জিনস তৈরি করা অনেক সহজ ও সস্তা হয়ে যায়। এভাবেই নীল জিনস সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে এবং বিশ্বজুড়ে এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে।

জানলে অবাক হবে, ডেনিম কাপড়ের আসল রং কিন্তু নীল নয়, এটি অনেকটা ওটমিলের মতো হালকা ঘিয়ে বা বেজ রঙের। এমনকি ডেনিম কাপড়ের জন্মও যুক্তরাষ্ট্রে নয়। ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্রান্সে। ফ্রান্সের ‘নিম’ (Nîmes) শহরে একধরনের শক্ত সুতার কাপড় তৈরি হতো, যাকে বলা হতো ‘সার্জ দে নিম’। এই ‘দে নিম’ থেকেই আজকের ‘ডেনিম’ শব্দটি এসেছে।

আরও পড়ুন
এখনকার দিনে নীল ছাড়াও কালো, সবুজ বা লাল রঙের জিনস দেখা যায়

পরবর্তীতে ইতালির জেনোয়া শহরে এই কাপড়কে নীল রং করে জাহাজের পাল বা কাজের পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করা হতো। ফরাসিরা একে বলত ‘ব্লু দে জেনেস’, যা থেকে পরবর্তীকালে ‘ব্লু জিনস’ নামটির উৎপত্তি হয়।

এখনকার দিনে নীল ছাড়াও কালো, সবুজ বা লাল রঙের জিনস দেখা যায়। রসায়নের ভাষায়, নীল রঙের সঙ্গে সালফার বা লোহার মতো উপাদান মিশিয়ে এসব রং তৈরি করা হয়। আবার জিনসকে সাদা করার জন্য ডেনিমের স্বাভাবিক হালকা রংকেই ব্যবহার করা হয়। আজকালকার ডিজাইনাররা বিভিন্ন কেমিক্যাল বা ডাই ব্যবহার করে জিনসকে কখনো গাঢ় নীল আবার কখনো রোদে পোড়া হালকা নীল রঙের রূপ দেন।

সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন ও রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন