রেকর্ড দামে বিক্রি টি-রেক্সের জীবাশ্ম, বিজ্ঞানীদের আপত্তি

টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্স আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে উত্তর আমেরিকায় রাজত্ব করত। এদের ছিল ধারালো দাঁত, হাড় গুঁড়ো করে দেওয়ার মতো কামড়ের জোর। ছিল বিশাল শরীর। বর্তমানে এই শিকারি প্রাণীর জীবাশ্মগুলো কোটি কোটি ডলারে বিক্রি হয়। তবে এটা বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ দুশ্চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৪ জুলাই নিউইয়র্কের বিখ্যাত নিলামঘর সোথবিসে এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় ও অক্ষত টি-রেক্স জীবাশ্ম বিক্রি করা হয়। দাম উঠেছে ৫০.১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫ কোটি ১০ লাখ)। ফোনে বিড (ডাক) দেওয়া এক অজ্ঞাত ক্রেতা এটি কিনে নেন। এযাবৎকালে নিলামে বিক্রি হওয়া সবচেয়ে মূল্যবান ডাইনোসরের জীবাশ্ম এটা।

বিক্রির আগে ধারণা করা হয়েছিল এর দাম দু–তিন কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কেননা ২০২৪ সালে এপেক্স নামের একটি স্টেগোসরাস ডাইনোসরের কঙ্কাল প্রায় সাড়ে চার কোটি ডলারে বিক্রি হয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল, যা ছিল এর আসল আনুমানিক দামের চেয়ে প্রায় ১১ গুণ বেশি।

আরও পড়ুন

নিলামে ওঠা এই টি-রেক্সের নাম গাস। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ বছরের পুরোনো। জীবাশ্মটি সাজিয়ে দাঁড় করিয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে। আকারে ৩ দশমিক ৮ মিটার বা প্রায় সাড়ে ১২ ফুট উঁচু এই কঙ্কাল। হাড়ের গঠন দেখে মনে করা হচ্ছে, এটি একটি বিশাল ও শক্তিশালী পূর্ণবয়স্ক ডাইনোসর ছিল। ২০২১ সাল থেকে টানা তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার হার্ডিং কাউন্টির একটি খামারবাড়িতে মাটি খুঁড়ে এটি বের করা হয়। থেরোপোডা এক্সপেডিশনস নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান জমির মালিক গ্যারি গাস লিকিংয়ের অনুমতি নিয়ে এই খননকাজ চালায়।

কঙ্কালটি খুঁজে পাওয়ার গল্পও বেশ মজার। খননকারী দলের সদস্য কোল জ্যাকবস বলেন, ‘আমি সেদিন খামারের রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। প্রথম দিনেই আমার চোখে মাটির ওপরে ভেসে থাকা একটি হাড়ের টুকরা পড়ে। সেটি ছিল ডাইনোসরটির পায়ের পাতার হাড়। টি-রেক্সের এই গাস নামটি আসলে জমির মালিকের সম্মানে রাখা হয়েছে, যিনি এই খননকাজ শেষ হওয়ার আগেই মারা যান।

জীবাশ্মটি বিজ্ঞানের জন্য অসাধারণ এক আবিষ্কার হলেও এটি বিজ্ঞানীদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে। কিন্তু কেন? বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ অধ্যাপক রিচার্ড বাটলার বলেন, ‘আজকাল নিলামঘরগুলোয় ডাইনোসরের কঙ্কাল যেভাবে চিত্রকর্ম বা কোটি টাকার শৌখিন জিনিসের মতো চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ধনী ব্যক্তিরা এখন ডাইনোসরের জীবাশ্মকে নিজেদের আভিজাত্য প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।’

আরও পড়ুন

কোনো জীবাশ্ম যদি সরকারি জাদুঘরে না থাকে, তবে বিজ্ঞানীরা সেটি নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পান না। ফলে বিজ্ঞানের বড় ক্ষতি হয়ে যায়। জীবাশ্ম কেনাবেচা বহু বছর ধরেই চলছে। কিন্তু এখন এর দাম এত বেশি বেড়ে গেছে যে জাদুঘরগুলোর পক্ষে তা কিনে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যেহেতু ডাইনোসরটি যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া গেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত জমিতে পাওয়া জিনিসের ওপর মালিকের সম্পূর্ণ অধিকার থাকে, তাই এই নিলাম একদম আইনি নিয়ম মেনেই হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের জন্য বিষয়টা খুবই চিন্তার। তবে ব্রাজিল বা মঙ্গোলিয়ার মতো দেশেও মাটির নিচে পাওয়া সমস্ত জীবাশ্মের মালিক সরকার বা রাষ্ট্র।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিলামে বিক্রি হওয়া টি-রেক্স জীবাশ্ম ছিল সু। ১৯৯৭ সালে শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়াম বিভিন্ন ধনী ব্যক্তি ও ম্যাকডোনাল্ডস কোম্পানির আর্থিক সহায়তায় ৮০ লাখ ডলারে সেটি কিনে নিয়েছিল। কিন্তু এর পর থেকেই ডাইনোসরের জীবাশ্ম সংগ্রহ করা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর মতো হলিউড তারকাসহ বড় ধনকুবেরদের একটি শখে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন

ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জীবাশ্মের ক্ষেত্রে স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। কারণ, মালিক যেকোনো মুহূর্তে তা জাদুঘর থেকে নিজের বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এতে বিজ্ঞানীদের গবেষণার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং অন্য গবেষকদের জন্য তথ্য যাচাই করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে ও গবেষণার সত্যতা প্রমাণ করতে জীবাশ্ম সব সময় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা প্রয়োজন। এ কারণেই বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন জার্নাল এখন কেবল সরকারি জাদুঘর বা স্থায়ী সংগ্রহশালায় থাকা জীবাশ্মের ওপর করা গবেষণাপত্রই প্রকাশ করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, বিরল জীবাশ্মের বাণিজ্যিক কেনাবেচা আইন করে বন্ধ করা উচিত। এগুলো সংগ্রহের অধিকার কেবল গবেষণা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের থাকা উচিত। তবে নিলাম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে না এলে অনেক জীবাশ্ম হয়তো চিরকাল মাটির নিচেই চাপা পড়ে থাকত। আর এত দাম মূলত তা উদ্ধারের কঠিন পরিশ্রম ও ঐতিহাসিক গুরুত্বেরই কারণেই হয়ে থাকে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন
আরও পড়ুন