১১ বছরের বালক খুঁজে পেল ৮ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম
করবিন বুলার্ড এলাকার জিওলজি ক্লাবের সদস্য। তার বয়স যখন মাত্র ১১ বছর, তখন ক্লাব থেকে একটি শিক্ষাসফরে গিয়ে সে মাটির নিচে অদ্ভুত বড় কিছু হাড়ের টুকরা খুঁজে পায়। পরে গবেষকেরা এগুলো পরীক্ষা করে জানান, এগুলো কোনো সাধারণ পশুর হাড় নয়। এটি আসলে আজ থেকে প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে সাগরে রাজত্ব করা ১৫ ফুট লম্বা এক টাইলোসরাসের জীবাশ্ম। এই একটি ঘটনাই করবিনের জীবনের লক্ষ্য পুরোপুরি বদলে দেয়। সে এখন বড় হয়ে একজন জীবাশ্মবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
সাধারণত স্কুল বা ক্লাবের শিক্ষামূলক ভ্রমণ থেকে শিক্ষার্থীরা সুন্দর কিছু ছবি আর মজার সব গল্প নিয়ে বাড়ি ফেরে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের ছাত্র করবিন যখন বাড়ি ফিরল, তখন তার ব্যাগে ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় আর চমকে দেওয়া এক আবিষ্কার। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনা। করবিন তার ফোর–এইচ জুওলজি ক্লাবের বন্ধুদের সঙ্গে একটি পাথরখনিতে প্রাচীন সব পাথরের স্তর পরীক্ষা করছিল। সেখানে মাটি ও পাথর সরানোর সময় হঠাৎ অদ্ভুত আকৃতির বড় কিছু হাড়ের টুকরা তার চোখে পড়ে। করবিন প্রথমে ভেবেছিল, এটি হয়তো সাধারণ কোনো প্রাচীন ফসিল।
আসলে করবিন ও তার ক্লাবের সদস্যরা যে খনিটিতে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন, সেখানে পাথরের স্তর ধসে মাঝেমধ্যেই নানা রকম প্রাচীন জীবাশ্ম বেরিয়ে আসে। এর আগেও এই দলের সদস্যরা সেখান থেকে প্রাচীন হাঙরের দাঁতসহ ছোটখাটো অনেক নিদর্শন খুঁজে পেয়েছিলেন। তবে করবিনের এই আবিষ্কার যে অন্য সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাবে, তা তাঁরা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই টের পেয়েছিলেন।
করবিন প্রথমবার হাড়গুলো খুঁজে পাওয়ার পর ক্লাবের সদস্যরা সেই জায়গায় আরও তিনবার যান। খননকাজ চালিয়ে যান। কয়েক মাসের টানা পরিশ্রমের পর অবশেষে মাটির নিচ থেকে পুরো জীবাশ্মটি বের করে আনা সম্ভব হয়। জানা যায়, এটি একটি টাইলোসরাস ডাইনোসর আমলের এক বিশাল সামুদ্রিক সরীসৃপ, যা একসময় প্রাগৈতিহাসিক সমুদ্রে রাজত্ব করে বেড়াত।
প্রাচীনকালের এই ভয়ংকর শিকারি প্রাণীটি লম্বায় ছিল ১৫ ফুটের বেশি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, করবিন ও তার দল এই টাইলোসরাসের মাথার খুলিসহ প্রায় পুরো জীবাশ্মটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে পেরেছে।
ছোটবেলা থেকে প্রাচীন সব জিনিস পছন্দ করা করবিনের জন্য এই আবিষ্কার ছিল কল্পনাতীত। ভূতত্ত্ব ক্লাবে যোগ দেওয়ার সময় সে নিজেও ভাবেনি এত বড় এক ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। বর্তমানে ১২ বছর বয়সী করবিন এখন সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে জানায়, ছোটবেলা থেকেই পাথর, জীবাশ্ম ও মাটির নিচের প্রাচীন রহস্যের প্রতি তার অন্য রকম একটা টান ছিল। আর এই অভাবনীয় আবিষ্কার তার সেই ভালো লাগাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সে এখন বড় হয়ে এই বিষয় নিয়েই পড়াশোনা করতে চায়।
মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এই ইতিহাসকে অক্ষত অবস্থায় ওপরে তুলে আনতে ক্লাবের সব সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দিনরাত পরিশ্রম করেছিলেন। তাই এই অসাধারণ আবিষ্কারটি তাঁদের জন্যই এক বিশাল গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অনন্য অর্জনের পর ৪–এইচ ক্লাবের প্রধান ক্রিস্টা বার্নেট জানান, টাইলোসরাস খুঁজে পাওয়ার এ ঘটনাটি যেমন অসাধারণ, তেমনি এর পেছনের শিক্ষণীয় দিকটাও চমৎকার। এ ধরনের ক্লাব বা প্রোগ্রামগুলো তরুণদের কেবল হাতে–কলমে কাজই শেখায় না; বরং তাঁদের মধ্যে গবেষণা করার মানসিকতা, দলবদ্ধভাবে কাজ করার অভ্যাস এবং সবার সামনে গুছিয়ে কথা বলার মতো দারুণ সব গুণ তৈরি করে।
করবিনের মা ওয়েন্ডি বুলার্ড অবশ্য এই সফলতার পেছনে সবার সম্মিলিত সহযোগিতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, ক্লাব কর্তৃপক্ষ, ক্লাবের লিডার ও যে জমির মালিকেরা সেখানে খননকাজ করার অনুমতি দিয়েছিলেন, তাঁদের সবার নিঃস্বার্থ সমর্থন ছাড়া এই বিশাল আবিষ্কার কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।