কাদার মধ্যে মাগুর মাছ বেঁচে থাকে কীভাবে

মাগুর মাছছবি: শাটারস্টোক

তুমি কখনো ভেবেছ, গরমে যখন পুকুরের পানি শেষ হয়ে যায়, তখন মাছগুলো কোথায় যায়? বেশির ভাগ মাছ মরে যায়। কিন্তু একটি মাছ আছে, এরপরও বেঁচে থাকে। সেটি হলো মাগুর মাছ। এই মাছ খরায় টিকে থাকার জন্য প্রকৃতি থেকে অসাধারণ কিছু উপহার পেয়েছে। মাগুর শুধু একটি সাধারণ মাছ নয়, এ আসলে যোদ্ধা। মাগুর মাছ প্রতি গরমে খরার বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকে।

গর্ত খোঁড়ার কৌশল

পানি কমতে শুরু করলেই মাগুর দারুণ একটা কাজ করে, গভীর গর্ত খোঁড়ে। এটা শুধু এদের জন্য ঘর বানানো নয়। এটা ওদের বেঁচে থাকার কৌশল। গর্তটা এমনভাবে তৈরি হয়, যেন সামান্য আর্দ্রতা ভেতরে ধরে রাখা যায়। মাগুর সেই গর্তে নিজেকে মাটিতে সাঁটিয়ে রাখে। এখানে তাপমাত্রা অনেক কম থাকে। এভাবে মাসের পর মাস এরা অপেক্ষা করে বর্ষার জন্য। মাটির গভীরে থাকা এই গর্ত এদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যেখানে বাইরের প্রচণ্ড গরম পৌঁছাতে পারে না।

গর্ত খোঁড়ার সময় মাগুর অত্যন্ত সতর্ক থাকে। এটা নিশ্চিত করে যে গর্তটি আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে। মাটির ভেতরে একটা বিশেষ চেম্বার তৈরি করে, যেখানে এটি সুরক্ষিত থাকে। এই গর্তেই মাগুর তার পুরো খরার মৌসুম কাটায়।

আরও পড়ুন
শৌখিন মৎস্য শিকারি লিটন বিশ্বাস কোঁচ দিয়ে পুকুর থেকে দুটি মাগুর মাছ শিকার করেছেন
ছবি: আলীমুজ্জামান

বিশেষ শ্বাসযন্ত্র

সাধারণ মাছের শ্বাসযন্ত্র হলো গিল। পানি থাকলে গিল কাজ করে, পানি না থাকলে মাছ মরে যায়। কিন্তু মাগুর ভিন্ন। মাগুরের মাথার পাশে একটা বিশেষ অংশ আছে, যাকে বলে মাজেড অঙ্গ। এই অংশ সরাসরি বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে পারে। ঠিক যেমন আমরা নাক দিয়ে শ্বাস নিই, মাগুরও তেমনভাবে এর মাজেড অঙ্গ দিয়ে বাতাস টেনে শ্বাস নেয়। এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

শুধু এটাই নয়, মাগুরের ত্বকও অক্সিজেন শোষণ করতে পারে। তবে এর জন্য ত্বক ভিজে থাকা জরুরি। এ কারণেই মাগুর তার গর্তে সব সময় আর্দ্র পরিবেশ বজায় রাখে। নিজেকে কখনো সম্পূর্ণ শুকিয়ে যেতে দেয় না। এমনকি যখন বাইরে পানি নেই, তখনো মাগুর তার শরীরে আর্দ্রতা ধরে রাখার চেষ্টা করে, যেমন ব্যাঙ বা কিছু উভচর প্রাণী করে। এই দুটি শ্বাসযন্ত্র একসঙ্গে কাজ করে মাগুরকে টিকিয়ে রাখে।

অবিশ্বাস্য ধৈর্য

মাগুরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তার ধৈর্য। এটা দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ নড়াচড়া ছাড়াই গর্তে থাকে। খাবার খায় না। শক্তি বাঁচায়। কেবল অপেক্ষা করে। এই অপেক্ষা করার ক্ষমতাই মাগুরকে বাঁচিয়ে রাখে। মাগুর বোঝে যে এই খরা একটা অস্থায়ী অবস্থা এবং বর্ষা আবার আসবে।

যখন পুকুর পুরোপুরি শুকিয়ে যায়, তখন মাগুর সামান্য খাবার খুঁজে পায়। কেঁচো, ছোট পোকা, অন্য ছোট প্রাণী। এই খাবার খেয়ে এরা নিজেকে কয়েক মাস পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখে। একটা ছোট খাবারেই এরা সন্তুষ্ট থাকে। কারণ, এর শরীরের প্রয়োজন কম। মাগুর জানে কীভাবে শক্তি সংরক্ষণ করতে হয়।

কত দিন বাঁচে

এটা অবিশ্বাস্য শোনাবে, কিন্তু মাগুর খরায় দুই থেকে তিন মাস বেঁচে থাকতে পারে। কোনো খাবার ছাড়াই, কোনো পানি ছাড়াই। এ সময়টা হলো খরা এবং এই সময়ই বর্ষা আসার আগের অপেক্ষা। বর্ষা যখন আসে এবং পুকুর আবার পানিতে ভরে যায়, তখন মাগুর জেগে ওঠে এবং স্বাভাবিক জীবন শুরু করে। এটা প্রকৃতির এক চমৎকার চক্র, যেখানে মাগুর নিখুঁতভাবে খাপ খায়।

আরও পড়ুন

ডাঙায়ও হাঁটতে পারে

আরেকটা অসাধারণ জিনিস হলো মাগুর ডাঙায় হাঁটতেও পারে। এর পাখনাগুলো এমনভাবে তৈরি যে সেগুলো পায়ের মতো কাজ করে। একটা পুকুর থেকে অন্য পুকুরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে মাগুর ডাঙা পথে চলে যেতে পারে। এই ক্ষমতা মাগুরকে অনন্য করে তুলেছে। একে টিকে থাকার আরও বেশি সুযোগ দিয়েছে। মাগুর সাঁতার কাটার মতো নড়াচড়া করে ডাঙায় হাঁটে।

কৃষকদের পছন্দের মাছ

এ কারণেই আমাদের দেশের কৃষকেরা মাগুর চাষ করতে পছন্দ করেন। অন্য মাছ চাষ করতে প্রতিদিন খাবার দিতে হয়, পানি পরিচর্যা করতে হয়। আর মাগুর? এরা নিজেই সব সামলায়। খরা এলেও টিকে যায়, ঠান্ডা পড়লেও বাঁচে। কোনো ঝামেলা নেই। কৃষকেরা জানেন যে মাগুর একটা নিরাপদ বিনিয়োগ।

সূত্র: সায়েন্সলাইন
আরও পড়ুন