কেন কিছু মাছ নিজের বাচ্চাকে খেয়ে ফেলে

পানির নিচের জগৎ আসলে আমাদের কল্পনার চেয়েও নাটকীয়

সত্যি বলতে পৃথিবীর কিছু মাছ নিজেদের বাচ্চা খেয়ে ফেলে! শুনতে দুঃখজনক মনে হতে পারে। কারণ, আমরা সাধারণত মা–বাবা মানেই ভাবি আদর, সুরক্ষা আর যত্ন। কিন্তু পানির নিচের জগতে সব সময় নিয়মটা এমন না। সেখানে টিকে থাকার লড়াই এত কঠিন যে কখনো কখনো সেখানে মা বা বাবা মাছ নিজেদের ডিম কিংবা বাচ্চা খেয়ে ফেলে।

প্রথম শুনলে মনে হতে পারে, ব্যাপারটা এত নিষ্ঠুর কেন? কিন্তু প্রকৃতির দৃষ্টিতে ব্যাপারটা একটু অন্য রকম। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে আছে বেঁচে থাকা, শক্তি সঞ্চয় করা, ভয়, এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখার কৌশলও।

পানির নিচের জগৎ আসলে আমাদের কল্পনার চেয়েও নাটকীয়।

একটি মা মাছ যখন ডিম দেয়, তখন তাকে বিশাল ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়। ডিমগুলো অন্য মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া বা জলজ পোকামাকড়ের সহজ শিকার হতে পারে। অনেক মাছ আবার একবারে শত শত বা হাজার হাজার ডিম দেয়। কারণ, তারা জানে, সব বাচ্চা বাঁচবে না।

এখন ভাবো, যদি খাবারের অভাব হয়? যদি চারপাশে শিকারি মাছ ঘুরে বেড়ায়? যদি পানিতে অক্সিজেন কমে যায়? তখন মা বা বাবা মাছের সামনে এক কঠিন সিদ্ধান্ত এসে দাঁড়ায়। সব বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে, নাকি কিছু বাচ্চাকে ‘ত্যাগ’ করে অন্তত নিজেরা টিকে থাকবে? প্রকৃতি প্রায়ই দ্বিতীয় পথটাই বেছে নেয়।

অনেক মাছ দুর্বল বা অসুস্থ ডিম আলাদা করে খেয়ে ফেলে। এতে শক্তিশালী ডিমগুলো বেঁচে থাকার বেশি সুযোগ পায়। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এটা একধরনের ‘বাছাই প্রক্রিয়া’। মানুষ যেমন গাছের শুকনো পাতা ছেঁটে দেয়, প্রকৃতিও তেমনি কখনো দুর্বল সন্তানকে বাদ দিয়ে শক্তিশালীদের টিকিয়ে রাখতে চায়।

অ্যাকুয়ারিয়ামে যারা মাছ পালন করে, তারা এই দৃশ্য প্রায়ই দেখে। ধরো, কেউ নতুন করে ‘অ্যাঞ্জেল ফিশ’ বা ‘গাপ্পি’ পুষছে। অনেক যত্ন করে মাছ ডিম দিল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল ডিমের অর্ধেক নেই! কারণ রাতে মা বা বাবা মাছই সেগুলো খেয়ে ফেলেছে।

আরও পড়ুন

কেন এমন হয়?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভয় আর মানসিক চাপ এর বড় কারণ। মাছও স্ট্রেসে পড়ে। হঠাৎ উজ্জ্বল আলো, বারবার কাচে টোকা দেওয়া, পানির তাপমাত্রা পরিবর্তন কিংবা আশপাশে বড় মাছ থাকলে এরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তখন এদের মনে হয়, ‘এই ডিমগুলো হয়তো বাঁচবে না।’ ফলে এরা নিজেরাই ডিম খেয়ে ফেলে।

হয়তো ভবিষ্যতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতেই এমনটা করে। বিষয়টা অনেকটা এমন—যুদ্ধে আটকে পড়া কেউ যদি বুঝতে পারে খাবার খুব কম, তখন সে জমিয়ে রাখতে চাইবে। মাছের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা কাছাকাছি।

‘বেটা মাছ’-এর গল্প আরও মজার। পুরুষ বেটা মাছ পানির ওপরে ফেনার মতো বাবল দিয়ে বাসা বানায়। তারপর সেখানে ডিম রাখে। বাবা মাছটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই বাসা পাহারা দেয়। কিন্তু যদি সে খুব ভয় পায় বা অতিরিক্ত বিরক্ত হয়, তখন কখনো কখনো নিজেই ডিম খেয়ে ফেলে।

আবার কিছু মাছ প্রথমবার মা–বাবা হলে কী করতে হবে বুঝে উঠতে পারে না। মানুষের মতো তাদেরও ‘অভিজ্ঞতা’ লাগে। প্রথমবার ভুল করে ডিম খেয়ে ফেললেও পরেরবার এরা অনেক ভালোভাবে বাচ্চার যত্ন নেয়।

আরও পড়ুন

সব মাছ কিন্তু নিষ্ঠুর না

কিছু মাছ আবার অসাধারণ যত্নশীল বাবা–মা। ‘ক্লাউন ফিশ’—যাদের তুমি হয়তো অ্যানিমেশন সিনেমায় দেখেছ—এরা ডিম পাহারা দেয় খুব যত্ন করে। পুরুষ ক্লাউন ফিশ ডিমে বাতাস দেয়, পরিষ্কার রাখে, এমনকি শত্রু এলে আক্রমণও করে।

আর আছে কিছু ‘সিক্লিড’ মাছ। এরা মুখের ভেতর বাচ্চা লুকিয়ে রাখে! বিপদ দেখলেই ছোট মাছগুলো দৌড়ে মায়ের মুখের মধ্যে ঢুকে পড়ে। নিরাপদ মনে হলে আবার বের হয়ে আসে। ভাবতে পারো? যেন পানির নিচে চলন্ত স্কুলবাস!

সমুদ্রের জগতে আরও অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। কিছু মাছ নিজের সব ডিম না খেয়ে শুধু কিছু অংশ খায়। এতে তাদের শক্তি ফিরে আসে, আর বাকি বাচ্চাগুলোর জন্য জায়গা ও খাবার বাড়ে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ফিলিয়াল ক্যানিবালিজম’—মানে নিজের সন্তান খেয়ে ফেলা।

শব্দটা ভয়ংকর হলেও প্রকৃতির কাছে এটা কখনো কখনো বেঁচে থাকার কৌশল।

আসলে প্রাণিজগতে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’—এভাবে সব সময় বিচার করা যায় না। বনে–জঙ্গলে কিংবা পানির নিচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো টিকে থাকা। যে প্রাণী পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, তারাই ভবিষ্যতে বংশ চালিয়ে যেতে পারে।

মানুষের কাছে যেটা নিষ্ঠুর মনে হয়, প্রকৃতির কাছে সেটা হয়তো প্রয়োজনীয়।

পানির নিচের পৃথিবী আসলে রহস্যে ভরা। সেখানে আছে ভয়, যুদ্ধ, ভালোবাসা, যত্ন, আবার নির্মম বাস্তবতাও। একটি ছোট মাছ যখন নিজের বাচ্চাকে খেয়ে ফেলে, সেটা শুধু নিষ্ঠুরতার গল্প না, বরং টিকে থাকার কঠিন নিয়মের গল্প।

আর প্রকৃতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—বেঁচে থাকার লড়াইয়ে প্রতিটি প্রাণীই নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়।

তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, লাইভ সায়েন্স
আরও পড়ুন