কাল যদি সব এআই ডেটা সেন্টার বন্ধ হয়ে যায়, কী ঘটবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা সেন্টারগুলো এখন আমাদের আধুনিক সমাজের খুব জরুরি একটি অংশ হয়ে গেছে। ‘কেপিএমজি’-এর একটি জরিপ অনুযায়ী, ৬৬ শতাংশ মানুষ কাজের বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এআই ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত এটি ব্যবহার করেন এবং ২৮ শতাংশ মানুষ মাঝে মাঝে এটি ব্যবহার করেন।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, পড়াশোনা, অফিস বা ব্যক্তিগত কাজের জন্য বেশির ভাগ মানুষই এখন এআইয়ের ওপর নির্ভর করছেন। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, বিভিন্ন সরকার, বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও দেশগুলোও তাদের কাজের গতি বাড়াতে এআই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের পুরো সমাজের কাঠামোর সঙ্গে কতটা গভীরভাবে মিশে যাচ্ছে।

এবার একটু কল্পনা করো, একদিন যদি পৃথিবীর সব এআই সিস্টেম ও প্রোগ্রাম হুট করে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। যদিও এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুব কম, তবু এটিকে অসম্ভব বলা যায় না। এআই প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিণতি কিন্তু বেশ ভয়ংকর হতে পারে।

সারা বিশ্বে এআই ব্যবস্থা হঠাৎ অকার্যকর হয়ে পড়লে তা বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর মারাত্মক আঘাত হানবে। ফলে শেয়ারবাজার থেকে কোটি কোটি বা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার হাওয়া হয়ে যেতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

আরও পড়ুন
এআই ডেটা সেন্টারের কুলিং সিস্টেম পরিচালনায় লাখ লাখ লিটার বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন হয়
ফাইল ছবি: রয়টার্স

এআই সিস্টেম কেন ব্যর্থ হতে পারে

এআই সিস্টেমগুলো এক দেশ থেকে অন্য দেশে তথ্য আদান-প্রদান করে সারা বিশ্বকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়াতে এই সংযোগ খুবই জরুরি। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি ও নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে অনেক বড় বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এআই সত্যিই এক দারুণ প্রযুক্তি এবং প্রায় সব কাজেই একে ব্যবহার করা যায়। তবে এই প্রযুক্তি যে সব সময় শতভাগ সঠিক কাজ করবে এমন কিন্তু নয়।

এআই ব্যর্থ হওয়ার একটা বড় কারণ হলো ভুল বা নিম্নমানের তথ্যের ব্যবহার। এতে এআই ভুল উত্তর বা ভুল হিসাব দিতে পারে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিভিও’-এর বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রায় ৮৫ শতাংশ এআই প্রজেক্ট ব্যর্থ হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো খারাপ তথ্য। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে এআই সিস্টেমে বড় গোলযোগ দেখা দিতে পারে, যা সারা বিশ্বে নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এআই ব্যর্থতার প্রধান কারণসমূহ

আল হাবতুর রিসার্চ সেন্টার ও ইউনিভিও তথ্য অনুসারে, ৮৫ শতাংশ এআই প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা রাখে নিম্নমানের ও ত্রুটিপূর্ণ ডেটা। আর বাকি ১৫ শতাংশ ব্যর্থতার পেছনে অন্যান্য নানা কারণ জড়িত থাকে।

আর এআই সিস্টেমে হঠাৎ করে কোনো অদ্ভুত বা অপরিচিত তথ্য বা ইনপুট চলে এলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে, যা সিস্টেমের জন্য ক্ষতিকর। এ ছাড়া এআই সিস্টেমের নিজস্ব দুর্বলতা, তাড়াহুড়ো করে কাজ করানোর চাপ, সিস্টেমের অতিরিক্ত জটিলতা, ঠিকমতো প্রশিক্ষণ না পাওয়া ব্যবহারকারী এবং একই সিস্টেম একসঙ্গে অনেক কাজে ব্যবহারের ফলে এআই হঠাৎ অকার্যকর বা ব্যর্থ হয়ে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন
এআই
ফাইল ছবি রয়টার্স

এআই হঠাৎ বন্ধ হলে কী ধরনের বড় বিপদ হতে পারে

যেসব প্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন কাজ চালানোর জন্য পুরোপুরি এআইয়ের ওপর নির্ভর করে, কোনো কারণে এআই সিস্টেম নষ্ট বা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের জন্য তা মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ কমাতে ও কাজের গতি বাড়াতে এআই ব্যবহার করে। কিন্তু হঠাৎ যদি এআই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে সামলে ওঠার মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি বা ব্যাকআপ তাদের না–ও থাকতে পারে। তাই বিশ্বজুড়ে এআই সিস্টেম ফেল করলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।

আজকাল প্রায় সব শিল্প ও অর্থনীতি ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে এবং কাজ পরিচালনার জন্য এআইয়ের ওপর ভরসা করছে। এআই হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে, যা আধুনিক বিশ্বকে এক পলকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের সেবা দেওয়া, লেনদেন করা এবং জালিয়াতি বা প্রতারণা ঠেকানোর কাজে এআই ব্যবহার করে। এআই সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেলে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়েই জালিয়াতির মুখে পড়তে পারে। মানুষ তখন সহজে টাকা লেনদেন করতে পারবে না, যার ফলে পুরো আর্থিক খাতে ধস নামতে পারে।

শুধু ব্যাংক বা অর্থব্যবস্থাই নয়, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যাপলের মতো বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিও তাদের সেবা স্বয়ংক্রিয় করতে এবং গ্রাহকদের সেরা অভিজ্ঞতা দিতে এআই ব্যবহার করে থাকে। ক্লাউড সার্ভিস চালানো, পণ্যের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট বাদ দেওয়ার মতো কাজেই মূলত এআই ব্যবহার করা হয়।

এই প্রযুক্তিকে নিজেদের কাজের সঙ্গে মেলাতে কোম্পানিগুলো এআই ও অটোমেশনের পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢেলেছে। ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে বড় টেক কোম্পানিগুলো এআই খাতে ১৫৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেছে, যা মার্কিন সরকারের শিক্ষা ও সামাজিক খাতের খরচের চেয়ে বেশি।

আর এই খরচ ২০২৬ সালে আরও বাড়ার কথা রয়েছে। সিএনএনের সাংবাদিক লিসা এডিসিকো জানিয়েছেন, গুগল বিশাল পরিমাণ অর্থ খরচ করার পরিকল্পনা করছে, মাইক্রোসফটের মূলধন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, আর মেটাও গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি অর্থ এআই খাতে খরচ করছে।

আরও পড়ুন

ডেটা সেন্টার বন্ধ হলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কী হবে

২০২৪ সালের জুলাইয়ে উত্তর ভার্জিনিয়ার ৬০টি ডেটা সেন্টার হঠাৎ বন্ধ হয়ে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার থামিয়ে দেয়। এত বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো গ্রিডে বড় ধরনের বিপদের সৃষ্টি হয়।

প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ধাক্কা সামলাতে তৈরি থাকলেও, চাহিদা হুট করে শূন্যে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি সামলাতে প্রস্তুত নন। দামি সার্ভার বাঁচাতে ডেটা সেন্টারগুলো গোলযোগ দেখলেই আপনাআপনি বিদ্যুৎ লাইন থেকে আলাদা হয়ে যায়।

এআই ডেটা সেন্টারের অফুরন্ত বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়ছে। ২০২৮ সাল নাগাদ একেকটি পরিবারের মাসিক বিল প্রায় ৭০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত চাপের কারণে হঠাৎ বড় এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বা ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকিও বাড়ছে।

এই সমস্যা ঠেকাতে প্রকৌশলীরা বিশাল ইউপিএসের মতো ‘রাইড-থ্রু’ প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা করছেন, যেন সামান্য গোলযোগে ডেটা সেন্টারগুলো হুট করে বন্ধ না হয়ে যায়।

সূত্র: ইয়াহু টেক, দ্য মাইন্ড কাইন্ড, হাবতুর রিসার্চ
আরও পড়ুন