হাড়ের নাম কেন ‘ফানি বোন’ রাখা হলো

হাড়ের নাম কেন ‘ফানি বোন’

ঘরের ভেতর মনের আনন্দে হাঁটাহাঁটি করছ, হঠাৎ ঠুন করে একটা শব্দ হলো! তোমার কনুইটা দরজার চৌকাঠ বা টেবিলের কোনায় এমনভাবে বাড়ি খেল যেন মনে হলো, কোনো অদৃশ্য শত্রু ওত পেতে ছিল?

এরপরই শুরু হয় আসল খেলা! সাধারণ কোনো ব্যথা নয়; বরং মনে হয় যেন কেউ তোমার হাতের ভেতর বিদ্যুতের শক দিয়ে দিল! কনুই থেকে শুরু করে হাতের আঙুল পর্যন্ত অদ্ভুত এক শিরশিরে অনুভূতি হতে থাকে। তুমি হয়তো তখন কনুই চেপে ধরে মনে মনে ভাবো, ব্যথাটা এত অদ্ভুত কেন? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে ব্যথা পেলে চোখে পানি চলে আসে, তার নাম কেন ‘ফানি বোন’ রাখা হলো?

চলো, আজ শরীরের এই মজার অথচ যন্ত্রণাদায়ক রহস্যের গভীরে যাওয়া যাক।

ফানি বোন আসলে কী

শুরুতেই একটা বড়সড় ধাক্কা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও। তোমার এই ফানি বোন কিন্তু আসলে কোনো হাড়ই নয়! এটা হলো একটা স্নায়ু বা নার্ভ। চিকিৎসক মেডেলিন ট্যাডলির মতে, এর আসল নাম আলনার নার্ভ। এই নার্ভ আমাদের কনিষ্ঠা (ছোট আঙুল) ও অনামিকা (রিং ফিঙ্গার) আঙুলে অনুভূতি জোগায় এবং হাতের ছোট পেশিগুলোকে কাজ করতে সাহায্য করে।

এই নার্ভ তোমার শরীরের ওপরের দিক থেকে শুরু হয়ে কনুইয়ের ভেতর দিয়ে সোজা আঙুল পর্যন্ত চলে গেছে। কিন্তু ঝামেলাটা বাধে কনুইয়ের ওই জায়গাটাতে এসেই। কনুইয়ের ভেতরের দিকের উঁচু হাড়ের ঠিক পেছনেই একটা ছোট্ট সুড়ঙ্গ আছে, যার ভেতর দিয়ে এই নার্ভ যায়। সমস্যা হলো, এই সুড়ঙ্গের ওপর মাংস বা চর্বির কোনো মোটা স্তর নেই। নার্ভটা একদম চামড়ার কাছাকাছি থাকে। ফলে তোমার কনুই যখনই কোনো শক্ত জায়গায় ধাক্কা খায়, ওই বেচারা আলনার নার্ভ গিয়ে সরাসরি ভেতরের হাড়ের সঙ্গে গুঁতা খায়!

আরও পড়ুন

নাম কেন ফানি বোন

ভাষাবিশেষজ্ঞ মার্থা বারনেটের মতে, ঠিক কে এই নামটা প্রথম রেখেছিল, তা কেউ জানে না। তবে এর পেছনে দুটো মজার কারণ থাকতে পারে।

প্রথম কারণটা হলো, ১৮০০ শতকের দিকে ফানি শব্দটির মানে শুধু মজার ছিল না, এর অর্থ অদ্ভুত বা অস্বাভাবিকও হতো। কনুইয়ে বাড়ি খেলে যে অদ্ভুত ও শিরশিরে অনুভূতিটা হয়, তা বোঝাতেই হয়তো মানুষ একে ফানি বলত।

দ্বিতীয় কারণটা হলো একটা দারুণ কৌতুক! তোমার ওপরের হাতের যে লম্বা হাড়টা আছে, তার ডাক্তারি নাম হিউমেরাস। ইংরেজিতে হিউমারাস মানে মজাদার বা ফানি! হাড়ের নামের সঙ্গে এমন একটা মজার মিল পেয়ে মানুষ হয়তো আর লোভ সামলাতে পারেনি। ব্যস, নাম হয়ে গেল ফানি বোন!

এটা এত ব্যথা দেয় কেন

মাংসপেশিতে চোট পাওয়া বা হাড় ভাঙার ব্যথার সঙ্গে নার্ভের ব্যথার আকাশ-পাতাল তফাত। তুমি যখন কনুইয়ে গুঁতা খাও, তখন আলনার নার্ভটা হাড়ের সঙ্গে চেপে যায়। এতে নার্ভটা চমকে ওঠে এবং তোমার আঙুলের দিকে একগাদা উল্টাপাল্টা সিগন্যাল পাঠিয়ে দেয়।

সাধারণত আমরা যেখানে আঘাত পাই, ব্যথাটা সেখানেই হয়। কিন্তু নার্ভের ব্যথা পুরো নার্ভের পথ ধরে ছড়িয়ে পড়ে। এ জন্যই কনুই ধাক্কা খেলেও সেই বিদ্যুতের শকের মতো ব্যথাটা তোমার ছোট আঙুল পর্যন্ত পৌঁছে যায়! ডাক্তারি ভাষায় এ অবস্থাকে বলে প্যারেসথেসিয়া।

আরও পড়ুন

পায়ের ঝিঁঝি ধরা আর ফানি বোন কি এক

হ্যাঁ, অনেকটা একই রকম! তুমি যখন অনেকক্ষণ পা মুড়ে বসে থাকো, তখন হাঁটুর বাইরের দিকের পেরোনাল নার্ভে চাপ পড়ে। তখন পা সোজা করতে গেলেই সেই অদ্ভুত শিরশিরে অনুভূতি হয়, যেটাকে আমরা বলি ঝিঁঝি ধরেছে। তবে পায়ের ঝিঁঝি ধরার বিষয়টা আগে থেকে একটু একটু বোঝা যায়, কিন্তু ফানি বোন একদম বিনা নোটিশে আক্রমণ করে!

ঠোকা খাওয়ার পর কী করবে

চিকিৎসক ট্যাডলির পরামর্শ হলো, প্রথম কাজই হচ্ছে একটা লম্বা শ্বাস নেওয়া। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ ব্যথা খুব দ্রুত কমে যায়। তুমি চাইলে হাতটা সোজা করে রাখতে পারো, এতে নার্ভের ওপর চাপ কমবে। আর যদি অনেকক্ষণ ধরে ব্যথা থাকে, তবে বরফ দিতে পারো।

আসলে নাম ফানি বোন হলেও এটা কোনো হাড় নয়। আর এর ব্যথাটা মোটেও ফানি নয়। তবে আবার যদি কখনো কনুইয়ে বাড়ি খেয়ে তোমার চোখে শর্ষে ফুল দেখো, তবে হাতটা অন্তত সোজা রেখে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ো। তাতে ব্যথাটা দ্রুত কমলেও কমতে পারে!

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন