বোতলে ভরা একটি চিঠি পাওয়ার সম্ভাবনা তোমার কতটুকু

বিবিসি

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে বালুর মধ্যে দারুণ একটা জিনিস পাওয়া গেছে। একটা পুরোনো বোতল। তবে সাধারণ কোনো বোতল নয়, এর ভেতরে ছিল ১০০ বছরের বেশি পুরোনো একটা চিঠি! প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এক সৈনিক বোতলের ভেতর ভরে সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন এটি। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, তিনি ভীষণ সুখী।

এমন একটা খবর শোনার পর তোমার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগতে পারে, সমুদ্রের এত বিশাল জলরাশিতে ভাসতে থাকা এমন একটা পুরোনো বোতল খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আসলে কতটুকু? সমুদ্রের বুকে ছুড়ে দেওয়া একটা বোতল তো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে গিয়ে পৌঁছাতে পারে! ঢেউয়ের তোড়ে সেটি পাথরে ভেঙে যেতে পারে, কিংবা তলিয়ে যেতে পারে অতল গহ্বরে। তাহলে ১০০ বছরের বেশি পুরোনো এমন একটা বোতল তোমার হাতে এসে পড়ার গাণিতিক সম্ভাবনা ঠিক কতটা? চলো, সেটারই একটা হিসাব মেলাই।

সম্ভাবনা বের করার সবচেয়ে সোজা নিয়মটা আসলেই খুব সহজ। এ পর্যন্ত যতগুলো ১০০ বছরের বেশি বয়সী বোতল পাওয়া গেছে, সেই সংখ্যাকে মোট যতগুলো বোতল সমুদ্রে ফেলা হয়েছিল, তা দিয়ে ভাগ দিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, বাস্তবে তো আর এই হিসাব রাখা সম্ভব নয় যে যুগে যুগে মানুষ ঠিক কতগুলো বোতল সমুদ্রে ভাসিয়েছে। এই বিশাল দুনিয়ায় কে কোথায় বসে বোতল ভাসাচ্ছে, তার হিসাব কে রাখে!

আরও পড়ুন

তাই বিজ্ঞানীরা এই সমস্যা সমাধানের জন্য সম্ভাবনার গুণন বিধি বা মাল্টিপ্লিকেশন রুল ব্যবহার করেন। এর একটা সূত্র আছে। সূত্রটা হলো:

(খুঁজে পাওয়া বোতল ÷ মোট বোতল) × (খুঁজে পাওয়া ১০০ বছর বয়সী বোতল ÷ মোট খুঁজে পাওয়া বোতল) = (খুঁজে পাওয়া ১০০ বছর বয়সী বোতল ÷ মোট বোতল)

সমীকরণটি খেয়াল করলে দেখবে, এখানে আমরা পুরো হিসাবটাকে দুটো ভাগে ভাগ করে নিয়েছি। প্রথমত, একটা বোতল খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কত? দ্বিতীয়ত, সেই পাওয়া বোতলটির বয়স ১০০ বছরের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা কত? এই দুটো আলাদা সম্ভাবনা বের করে গুণ করে দিলেই আমরা আমাদের আসল উত্তর পেয়ে যাব।

জার্মানির ফেডারেল মেরিটাইম অ্যান্ড হাইড্রোগ্রাফিক এজেন্সির বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে ফেলা কোনো বোতল খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা হলো ১০ ভাগের ১ ভাগ (১/১০)। সমুদ্রবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ড্রিফট বোতল পরীক্ষার সঙ্গেও এই হিসাবটা দারুণভাবে মিলে যায়। বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের স্রোত বোঝার জন্য একসময় প্রচুর বোতল ভাসিয়েছেন। আটলান্টিক মহাসাগরে করা ষাট ও সত্তরের দশকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মেক্সিকো উপসাগর থেকে ১৪ শতাংশ, ক্যারিবিয়ান সাগর থেকে ৮ শতাংশ এবং ব্রাজিলের উত্তর উপকূল থেকে ৭ শতাংশ বোতল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আবার ২০০০ সালের দিকের আরেক গবেষণায় কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডের কাছ থেকে ৫ শতাংশ বোতল পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে আমরা ধরে নিতে পারি, একটা বোতল খুঁজে পাওয়ার গড় সম্ভাবনা ১০ ভাগের ১ ভাগ।

এবার আসি দ্বিতীয় অংশে। যেসব বোতল পাওয়া যায়, সেগুলোর মধ্যে কতগুলোর বয়স ১০০ বছরের বেশি? উইকিপিডিয়া ঘেঁটে পুরোনো বোতল পাওয়ার খবরগুলো নিয়ে একটা তালিকা বানানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে দেখা গেল এক অদ্ভুত সমস্যা। তালিকায় শুধু ২৫ বছরের বেশি বয়সী বোতলগুলোর হিসাব আছে। কারণ, কেউ গতকাল বোতল ভাসিয়েছে আর আজ সেটা পাওয়া গেছে—এমন নতুন বোতল পেলে তো সেটা নিয়ে কেউ পত্রিকায় খবর ছাপে না! তাহলে ০ থেকে ২৫ বছর বয়সী বোতলের সংখ্যা আমরা পাব কোথায়?

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীরা পরিসংখ্যানের সাহায্যে হারিয়ে যাওয়া এই সংখ্যাটি বের করার একটি উপায় বের করেছেন।

বোতলের বয়স ০-২৫ বছর ২৫-৫০ বছর ৫০-৭৫ বছর ৭৫-১০০ বছর ১০০-১২৫ বছর ১২৫-১৫০ বছর ১৫০-১৭৫ বছর ১৭৫-২০০ বছর

প্রাপ্ত বোতল ৪৬ ২৩ ১০ ১৫ ৭ ৩ ১ ১

এই সমীকরণে বয়সের জায়গায় ২৫ বসালে আমরা ০ থেকে ২৫ বছর বয়সী বোতলের একটা আনুমানিক হিসাব পেয়ে যাই। সমীকরণ অনুযায়ী এই সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৪৬। ছকটি একটু ভালোভাবে খেয়াল করলেই দেখবে, বোতলের বয়স যত বাড়ছে, সেগুলো খুঁজে পাওয়ার সংখ্যা তত কমছে। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোতলের ভেতরের কাগজ বা বার্তা নষ্ট হয়ে যায়, বোতলগুলো সাগরের ঢেউয়ে ভেঙে যায় কিংবা পলিমাটির নিচে চিরতরে চাপা পড়ে যায়। ছকের সবগুলো সংখ্যা যোগ করলে আমরা মোট ১০৬টি বোতল পাই। এর মধ্যে ১০০ বছরের বেশি বয়সী বোতল আছে ১২টি। ১০৬-এর মধ্যে ১২ মানে, এটাও প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগ।

তাহলে এবার আমাদের সেই প্রথম সমীকরণে ফিরে যাই। বোতল খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা (১/১০) এবং সেটি ১০০ বছরের বেশি পুরোনো হওয়ার সম্ভাবনা (১/১০)। দুটো গুণ করলে আমরা পাই (১/১০) × (১/১০) = ১/১০০।

এবার আসল হিসাবটা দেখো। পৃথিবীর সব মহাসাগর মিলিয়ে এই মুহূর্তে ১ লাখ বোতল ভাসছে বলে ধরে নিলে, আমাদের গাণিতিক হিসাব বলছে, এর মধ্যে মাত্র ১ হাজার বোতল খুঁজে পাওয়া যাবে, যেগুলোর বয়স ১০০ বছরের বেশি হবে। পৃথিবীতে এখন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি। সবাই যদি এই বোতল খোঁজার প্রতিযোগিতায় নামে, আর সবারই যদি বোতল পাওয়ার সমান সুযোগ থাকে, তবে তোমার ভাগে এমন একটি বোতল পড়ার সম্ভাবনা কত জানো? ৮০ লাখের মধ্যে মাত্র ১ ভাগ! অর্থাৎ সম্ভাবনা খুবই কম।

আরও পড়ুন

তবে হ্যাঁ, বুদ্ধি খাটালে বোতল খোঁজারও কিছু কৌশল বের করা যায়! সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের স্রোতের নির্দিষ্ট গতিপথ রয়েছে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় জায়ার (জোয়ার নয়)। এর মানে পাক খাওয়া স্রোত। এই পথ ধরে খুঁজলে বোতল পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে যেসব উপদ্বীপ বা দ্বীপ এই জায়ারের পথে পড়ে, সেখানে বোতল এসে আটকে থাকার সুযোগ বেশি। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জগুলো এই নর্থ আটলান্টিক জায়ারের একদম পারফেক্ট জায়গায় অবস্থিত বলে সেখানে বোতল পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তাই ১০০ বছরের পুরোনো কোনো বোতল কুড়িয়ে পাওয়ার শখ থাকলে, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে ঘুরে আসতে পারো!

সবশেষে একটা কথা না বললেই নয়। নির্জন কোনো দ্বীপে আটকা পড়া যে হতভাগ্য মানুষটি বাঁচার আশায় বোতলে ভরে সাহায্য চেয়ে বার্তাটি ভাসিয়ে দিয়েছিল, বোতল খুঁজে পাওয়ার এত কম সম্ভাবনার কথা জানলে বেচারা হয়তো ভীষণ কষ্ট পেত!

আরও একটা কথা না বললেই নয়। এখানে যে হিসাবটা দিলাম, তা শুধু সম্ভাবনা মাত্র। এখানকার সব ডেটা একদম সঠিক নয়, আসলে সঠিক ডেটা পাওয়াও কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, কে কোথা থেকে কেন বোতল ভাসিয়েছিল, তার খোঁজ তো কেউ রাখে না। আবার এসব বোতল হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তা ছাড়া জীবন বাঁচানোর জন্য বোতলে ভরে কেউ চিঠি লিখে ভাসিয়ে দেবে, সেই দিন এখন আর নেই। এর চেয়ে আরও ভালো ভালো উপায় এখন পৃথিবীতে আছে। কেউ অবশ্য শখ করে এভাবে চিরকুট ভাসালে সেটা ভিন্ন কথা। তাই এই পুরো হিসাবটাই একটা সম্ভাবনা মাত্র!

সূত্র: দ্য কনভারসেশন
আরও পড়ুন