বার্মা থেকে মিয়ানমার, পারস্য থেকে ইরান, দেশগুলো কেন নিজের নাম বদলেছে
মাঝেমধ্যে মনে হয় নামটা বদলে অন্য কিছু রাখি? এমন ইচ্ছা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটি দেশ কি চাইলেই হুট করে নিজের নাম বদলে ফেলতে পারে? তবে এই কাজটি নিজের নাম পরিবর্তনের মতো মোটেও সহজ কাজ নয়। তবু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক দেশই তাদের পুরোনো নাম বদলে একদম নতুন নাম রেখেছে।
আসলে এই নাম বদলানোর পেছনে থাকে একেকটি দেশের ইতিহাস, রাজনীতি আর সংস্কৃতির বড় সব পরিবর্তন। কোনো দেশ হয়তো চায় তাদের ওপর চেপে বসা ঔপনিবেশিক স্মৃতি মুছে ফেলতে। আবার কেউ চায় হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নিজেদের পুরোনো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে। চলো তাহলে জেনে নিই, কেন এই দেশগুলো নিজেদের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
বার্মা থেকে মিয়ানমার
১৯৮৯ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ বার্মার সামরিক সরকার দেশটির নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার রাখে। তবে এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতেই সরকার এই পরিবর্তন এনেছে। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কিছু দেশ দীর্ঘ সময় ধরে দেশটিকে আগের নাম বার্মা বলেই ডাকত।
সিলন থেকে শ্রীলঙ্কা
১৯৭২ সালে দ্বীপরাষ্ট্র সিলন তাদের নাম বদলে রাখে শ্রীলঙ্কা। একই সঙ্গে তারা নিজেকে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। ব্রিটিশ শাসনের চিহ্ন মুছে ফেলে নিজেদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই ছিল এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য। শ্রীলঙ্কার প্রধান ও সরকারি সিংহলি ভাষায় শ্রীলঙ্কা শব্দের অর্থ হলো উজ্জ্বল ভূমি, যা এই দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ইতিহাস আমাদের সবার জানা। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ভাষাগত পার্থক্যের অবসান ঘটে। বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা হয়।
চেক প্রজাতন্ত্র থেকে চেকিয়া
দেশটিতে এখনো সরকারিভাবে চেক প্রজাতন্ত্র নাম ব্যবহার করা হয়, তবে তারা এখন নিজেদের চেকিয়া বলে পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করে। ২০১৬ সালে তারা এই পরিবর্তন করে। দেশটির সরকারের মতে, খেলাধুলা বা পর্যটনের মতো আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোতে এই ছোট নামটি ব্যবহার করা অনেক সহজ। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্টের মতে, নামটি শুনতে সুন্দর ও মনে রাখাও সহজ।
তুরস্ক থেকে তুর্কিয়ে
২০২২ সালে তুরস্কের নাম বদলে তুর্কিয়ে করার জন্য জাতিসংঘে আবেদন জানানো হয়। দেশটির রাষ্ট্রপতির মতে, তুর্কিয়ে শব্দটি তাদের জাতি, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে। এ ছাড়া ইংরেজি টার্কি (Turkey) শব্দটি একটি পাখির নামের সঙ্গে মিলে যায় বলে তারা এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।
সিয়াম থেকে থাইল্যান্ড
১৯৩৯ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডের নাম ছিল সিয়াম। সে সময় পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব থেকে নিজেদের ঐক্য ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে তারা নতুন নাম গ্রহণ করে। ১৯৪৮ সাল থেকে তারা থাইল্যান্ড ব্যবহার শুরু করে। থাইল্যান্ড শব্দের অর্থ হলো মুক্ত মানুষের দেশ, যা থাই জনগণের জাতীয় গর্ব ও স্বাধীনতার প্রতীক।
পারস্য থেকে ইরান
ইরানের ইতিহাস পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ও প্রাচীন ইতিহাস। তবে ১৯৩৫ সালের আগে বিশ্বজুড়ে দেশটি পারস্য নামে পরিচিত ছিল। যদিও স্থানীয় মানুষ অনেক আগে থেকেই দেশটিকে ইরান বলে ডাকত। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে তা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হতে দীর্ঘ সময় লাগে। এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা দুনিয়ার দেওয়া নামের বদলে নিজেদের আদি পরিচয়ের পরিচিত হওয়া।
সোয়াজিল্যান্ড থেকে এসওয়াতিনি
২০১৮ সালে আফ্রিকার এই দেশটি তাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ব্রিটিশদের দেওয়া সোয়াজিল্যান্ড নামটি বাদ করে দেয়। রাজা তৃতীয় এমসোয়াতি নতুন নাম ঘোষণা করেন এসওয়াতিনি, যার অর্থ সোয়াজিদের দেশ। ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ডের নামের সঙ্গে সোয়াজিল্যান্ডের নামের অনেক মিল থাকায় বিদেশে প্রায়ই মানুষ বিভ্রান্ত হতো। সেই বিভ্রান্তি এড়াতেই এই নতুন নাম।
হল্যান্ড থেকে নেদারল্যান্ডস
অনেকেই পুরো নেদারল্যান্ডস দেশকে হল্যান্ড নামে ডাকতেন। কিন্তু ২০১৯ সালে দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরোনো নামটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আসলে কারিগরিভাবে হল্যান্ড পুরো দেশ নয়, বরং নেদারল্যান্ডসের মাত্র দুটি প্রদেশের নাম।
ম্যাসিডোনিয়া থেকে উত্তর ম্যাসিডোনিয়া
২০১৯ সালে ম্যাসিডোনিয়া প্রজাতন্ত্র তাদের নাম পরিবর্তন করে উত্তর ম্যাসিডোনিয়া রাখে। এর পেছনে ছিল প্রতিবেশী দেশ গ্রিসের সঙ্গে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্ক। গ্রিসের একটি অঞ্চলের নামও ম্যাসিডোনিয়া হওয়ায় তারা এই নাম নিয়ে আপত্তি তুলে আসছিল। এই নাম পরিবর্তনের ফলে গ্রিসের সঙ্গে বিরোধ মিটে যায়।