মার্কিন নাগরিকদের কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয়, জানা গেল জরিপে
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা ঠিক কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়? ২০১৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চ্যাপম্যান ইউনিভার্সিটি প্রতিবছর ‘সার্ভে অব আমেরিকান ফেয়ার্স’ নামের একটি জরিপের মাধ্যমে এটি জানার চেষ্টা করছে। এই বছর প্রথমবারের মতো এই জরিপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন যুক্ত করা হয়।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, এআই–সম্পর্কিত দুটি আলাদা বিষয় প্রথমবারের মতো আমেরিকানদের শীর্ষ ১০টি ভয়ের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
জরিপের মূল গবেষকদের একজন অধ্যাপক ক্রিস্টোফার বেডার। তিনি জানান, আমেরিকানরা কেবল এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর ভয়েই চিন্তিত নন। বরং দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর এআই কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও তাঁরা বেশ উদ্বিগ্ন।
বিগত বছরগুলোর মতো এবারও আমেরিকানদের বড় ভয়ের জায়গা জুড়ে ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা। এ ছাড়া প্রিয়জনদের কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার মতো সাধারণ পারিবারিক উদ্বেগগুলোও তালিকায় রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বরাজনীতি ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে মানুষের ভয়ের তালিকায় নতুন এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালের আমেরিকার শীর্ষ ১০টি ভয়ের তালিকা
চ্যাপম্যান ইউনিভার্সিটির জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আমেরিকানদের শীর্ষ ১০টি ভয়ের তালিকার শীর্ষে রয়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তারা, যা নিয়ে দেশটির ৬১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ উদ্বিগ্ন। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ৫৮ দশমিক শূন্য শতাংশ।
তবে এ বছরের সবচেয়ে বড় চমক হলো এআইয়ের স্থান। এআই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ক্ষতি করতে পারে, এমন আশঙ্কা জরিপে অংশ নেওয়া ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের। যেটা তালিকার ৩ নম্বর স্থানে রয়েছে। ৪ ও ৫ নম্বরে রয়েছে পরিবারের প্রিয়জনদের গুরুতর অসুস্থতা ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং তাঁদের মৃত্যুর ভয় ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ।
সমান ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ ভয় নিয়ে যৌথভাবে ৬ নম্বরে রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক ধসের আশঙ্কা। ৭ নম্বরে আবারও স্থান করে নিয়েছে এআই। প্রায় ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন এআই দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে। এ ছাড়া তালিকার শেষ তিনটি স্থানে রয়েছে সরকারের ব্যক্তিগত তথ্য নজরদারি ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ, বায়োলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং সন্ত্রাসী হামলা ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
ভয়ের তালিকার অন্যান্য চমকপ্রদ তথ্য
জরিপ অনুযায়ী, দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তারা ভয়ের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন, যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও প্রথম স্থানে ছিল। তবে বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ষষ্ঠ স্থান থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে।
গবেষক ব্যাডার মন্তব্য করেন, ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত হয়তো বৈশ্বিক সংঘাত নিয়ে আমেরিকানদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি বায়োলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার ও সন্ত্রাসবাদের মতো বিষয়গুলো মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
শীর্ষ ১০–এর বাইরেও জরিপে আরও কিছু বিষয় সামনে এসেছে। বিশ শতাংশের বেশি মানুষ নিজেদের শহরে অপরাধের ঘটনা নিয়ে ভীত। আর অর্ধেকের বেশি মানুষ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে স্বাস্থ্যবিমা প্রয়োজন হলে তাঁরা হয়তো তা হারাতে পারেন।
এ ছাড়া ভিনগ্রহের প্রাণীর অস্তিত্ব প্রমাণিত হলে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে কি না, এমন বিষয়ে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গবেষকেরা পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে সম্প্রতি নানা মতামত দিয়েছেন, যা অনেকের কাছে আশ্বস্তকর মনে হতে পারে আবার নাও হতে পারে।
এআইয়ের প্রভাব
এআই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ক্ষতি করতে পারে, এমন আশঙ্কাটি এ বছরের জরিপে নতুন যুক্ত করা হয়েছে। এটি সরাসরি তালিকার ৩ নম্বর স্থানে উঠে এসেছে। ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন যে তাঁরা এ বিষয়টি নিয়ে খুবই ভীত।
তবে মজার বিষয় হলো, যাঁরা নিয়মিত কিংবা সপ্তাহে অন্তত একবার এআই ব্যবহার করেন, তাঁদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ মানুষ এই ভয় পান। আর যাঁরা কখনোই এআই ব্যবহার করেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ভয়ের হার ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ এআই ব্যবহারে অভ্যস্ত মানুষের ভয় কিছুটা কম।
এআইয়ের অর্থনৈতিক ক্ষতি করার আশঙ্কার বিষয়টিও প্রথমবারের মতো শীর্ষ ১০-এর তালিকায় উঠে এসেছে, যা ৭ নম্বর স্থানে রয়েছে। প্রায় ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন এআই দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে।
প্রযুক্তি খাতের অনেকেই এই ধরনের উদ্বেগের কথা বলেছেন। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা বিল গেটস সতর্ক করে বলেছেন, খারাপ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করা হলে অনেক ক্ষতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।
গবেষক সেথ বেনজেল জানান, মানুষ কেবল চাকরি হারানো নিয়ে চিন্তিত নয়, বরং সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন। তবে মানুষ এই প্রযুক্তির সঙ্গে যত বেশি অভ্যস্ত হবে, ভয় তত কমবে। জরিপে দেখা গেছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে মানুষ বেশ আশাবাদী।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এআইয়ের ভুল বা খারাপ ব্যবহার মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে সঠিক ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। গবেষক বেডার মনে করেন, আগামীতেও এআই নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগ থেকে যাবে।
ইতিহাস গবেষক ডাক্তার জেসিকা লয়েড মে জানান, উনিশ শতকে যখন ক্যামেরা, টেলিগ্রাম বা রেডিওর মতো নতুন প্রযুক্তি এসেছিল, তখনো মানুষ নানা কথা ভেবে ভয় পেত। বর্তমানের জেনারেটিভ এআই বা আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ঠিক তেমনি এক নতুন প্রযুক্তি, যা মানুষকে একই সঙ্গে আশাবাদী ও চিন্তিত করছে।