পিপীলিকার পাখা কি মরার জন্যই গজায়

প্রবাদে আছে—পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। আসলেই কি তাই? পিপীলিকা অর্থাৎ পিঁপড়াদের পাখা কি মরার জন্যই গজায়?

পিঁপড়াদের পাখা কি মরার জন্যই গজায়?মিডজার্নি

প্রবাদে আছে, আবার বাস্তবেও দেখা যায়, পাখাওয়ালা পিঁপড়া আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে! তাই প্রবাদের বাক্যই ঠিক মনে হয়। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এ ধারণা ভুল। পিঁপড়ার পাখা আত্মহত্যা করার জন্য তৈরি হয় না। বরং এই পাখাই পিঁপড়াদের যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রেখেছে পৃথিবীতে। পিঁপড়া পৃথিবীর সবচেয়ে সফল প্রাণীদের একটা। তারা যুগ যুগ ধরে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে বিশেষ কিছু কৌশলের সাহায্য নিয়ে। পাখা সেই কৌশলের অংশ।

পিঁপড়ারা ডিম পাড়ে। স্ত্রী পিঁপড়া একেবারে শত শত ডিম দেয়। এসব ডিম ফুটে চার ধরনের পিঁপড়ার জন্ম হয়—শ্রমিক, সৈনিক, কিছু পুরুষ ও রানি পিঁপড়া।

শ্রমিক পিঁপড়ারা খাবারের সন্ধান করে। পুরুষ ও রানি পিঁপড়ার যত্ন নেয়। নতুন জন্মানো পিঁপড়াদেরও দেখভাল করে। অন্যদিকে সৈনিক পিঁপড়াদের কাজ বাসা পাহারা দেওয়া, শত্রু আক্রমণ করলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা। বাসা, রানি, পুরুষ, ডিম ও ছানাদের রক্ষা করে এরাই। প্রয়োজনে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে মরতেও ভয় পায় না।

একটা পিঁপড়ার বাসায় হাজার হাজার পিঁপড়া থাকে বটে, এদের বেশির ভাগই শ্রমিক নয়তো সৈনিক পিঁপড়া। হাতে গোনা কিছু পুরুষ পিঁপড়া থাকে, আর থাকে একজন রানি। শ্রমিক আর সৈনিক পিঁপড়ারা এই রানির দিকেই সবচেয়ে বেশি নজর দেয়।

আরও পড়ুন

একটা বাসায় সাধারণত একটাই রানি থাকে। ডিম ফুটে নতুন ছানাদের জন্ম হয়। যত দিন ছানারা ছোট তত দিন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ছানারা বড় হওয়ার পর দেখা দেয় ঝামেলা। এক বনে যেমন একাধিক বাঘ থাকতে পারে না, তেমনি পিঁপড়ার ক্ষেত্রে এক বাসায় একাধিক রানি থাকতে পারে না। থাকলে ঝামেলা হয়। পুরো বাসার প্রশাসনিক সিস্টেম ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। নতুন রানিরা চ্যালেঞ্জ করে বসতে পারে পুরোনো রানিকে। মাঝেমধ্যে লড়েইও বেধে যায়। এসব কারণে রানি মৌমাছিদের বাসা ছাড়া দরকার হয়।

খাবার খোঁজা আর বাসা বদল এক কাজ নয়। নতুন বাসায় গেলে সেখানেও পিঁপড়াদের কলোনি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি একাধিক কলোনি থাকলে খাবারের সংকট ও রোগ সংক্রমণের ভয় থাকে। তাই দূরে যাওয়াই ভালো। যদিও রোগ সংক্রমণ বা খাদ্যসংকটের মতো জটিল বিষয় চিন্তা করার মতো মস্তিষ্ক পিঁপড়াদের নেই। কিন্তু বংশপরম্পরায় পিঁপড়াদের ডিএনএতে কিছু তথ্য থাকে, যেগুলো মেনে চলে তারা। বাসা বদলের এই বুদ্ধি পিঁপড়াদের ডিএনএতে থাকে। তাই নতুন রানি কিছু পুরুষ পিঁপড়াদের মিয়ে নিজের মাতৃভিটা ত্যাগ করে।

আগেই বলেছি, বাসা খোঁজার জন্য বহু দূরে যাওয়া লাগতে পারে। পায়ে পায়ে হয়তো অত দূর চলা সম্ভব নয়। তাই এ সময় পাখা দরকার হয় পিঁপড়াদের।

আরও পড়ুন

একটা নির্দিষ্ট বয়সে রানি ও পুরুষ পিঁপড়াদের পাখা গজায়। পাখায় ভর দিয়ে তারা পাড়ি দিতে পারে মাইলের পর মাইল পথ। তারপর একসময় সুবিধাজনক জায়গা দেখে নতুন রানি আর পুরুষেরা বাসা বাঁধে। প্রজননের পর প্রচুর ডিম পাড়ে রানি। সেসব ডিম থেকে প্রচুর শ্রমিক ও সৈনিক পিঁপড়ার জন্ম হয়। তারাই করে নতুন কলোনি গড়ার কাজ।

তা-ই যদি হয়, ‘পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে’ এই প্রবাদ এল কী করে? পাখাওয়ালা পিঁপড়া কেন আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরে? কিংবা আলোর কাছে ভিড় জমিয়ে টিকটিকির খাদ্যে পরিণত হয়?

পিঁপড়া চলার জন্য সূর্যের আলো ব্যবহার করে। সূর্য তাদের চলার পথে দিক ঠিক করে দেয়। সূর্যের আলো নিভে গেলে পিঁপড়াদের চলাচলও থেমে যায়। কিন্তু রাতে যদি কোথাও কৃত্রিম আলো জ্বালানো হয়, পিঁপড়ারা তখন বিভ্রান্ত হয়। রাত-দিনের তফাত বুঝতে পারে না। এ জন্য কৃত্রিম আলোর দিকে ছুটে যায়। গরম বৈদ্যুতিক বাল্ব, কেরোসিনের ল্যাম্প, হ্যারিকেন কিংবা আগুনের কুণ্ডলী বরাবর ছুটে যায় বিভ্রান্ত পিঁপড়া এবং পুড়ে মরে।

আসলে পাখাওয়ালা পিঁপড়াদের মরার আয়োজন নিজের অজান্তে মানুষই করে দেয়। পিঁপড়া কখনো ইচ্ছা করে আগুনে ঝাঁপ দেয় না। ‘তাই পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে’ প্রবাদ বাইরে থেকে দেখলে সত্যি মনে হলেও এটা আসলে মিথ।

আরও পড়ুন