২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সৌরঝড়ের কবলে পড়তে যাচ্ছে পৃথিবী

শক্তিশালী সৌরঝড় পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছেফাইল ছবি: রয়টার্স

সূর্য শুধু আলো আর তাপের উৎস নয়। এর ভেতরে প্রতিনিয়ত এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যেগুলো আমরা খোলা চোখে দেখতে পাই না। অথচ এগুলোর প্রভাব এসে পড়ে পৃথিবীতে। আমাদের শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে যেমন সূর্যের আলো দরকার হয়, তেমনি সূর্য থেকেই আসে নানা ধরনের শক্তি ও বিকিরণ। সম্প্রতি সূর্যে এমনই একটি বিরল ও শক্তিশালী ঘটনা ঘটেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি গত ২০ বছরে সবচেয়ে বড় সৌরঝড়।

পৃথিবীতে যেমন বাতাসের কারণে ঝড় হয়, তেমনি সূর্য থেকেও বিকিরণের মাধ্যমে ঝড় তৈরি হতে পারে। একে বলা হয় সৌরঝড়। এই সৌরঝড় এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আগামী সোমবার সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত এর শক্তিশালী প্রভাব পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আকাশে দেখা যেতে পারে চোখধাঁধানো মেরুজ্যোতি বা অরোরা। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে কিছু ঝুঁকি। স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা ও জিপিএসের কার্যকারিতায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টার (এসডব্লিউপিসি) এই সৌরঝড়কে তীব্রতার মাত্রায় পাঁচের মধ্যে চার নম্বর দিয়েছে। অর্থাৎ এটি ‘এস৪’ বা গুরুতর স্তরের সৌর বিকিরণ ঝড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সংস্থাটি জানিয়েছে, এটি গত ২০ বছরে সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর বিকিরণ ঝড়। এর আগে সর্বশেষ এমন এস৪ মাত্রার ঝড় দেখা গিয়েছিল ২০০৩ সালের অক্টোবরে। সে সময়ের ‘হ্যালোইন স্পেস ওয়েদার স্টর্ম’-এর কারণে সুইডেনে বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরও পড়ুন

এ ধরনের সৌর বিকিরণ যখন পৃথিবীতে পৌঁছায়, তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন মহাকাশচারীরা, বিশেষ করে যাঁরা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে মেরু অঞ্চল দিয়ে যাতায়াতকারী বিমানের যাত্রীদেরও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিকিরণের মুখে পড়তে হতে পারে। সে কারণেই আগেভাগেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে বিমান সংস্থা, নাসা, ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি এবং বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনাকারী বিভিন্ন সংস্থাকে।

এসডব্লিউপিসির পূর্বাভাসকারী শন ডাল জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষকে সচেতন করাই এখন তাঁদের প্রধান কাজ। অতীতেও এমন সৌরঝড়ের সময় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ভেতরে অপেক্ষাকৃত বেশি সুরক্ষিত অংশে আশ্রয় নিয়েছেন মহাকাশচারীরা। এবারের ঝড়েও একই ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

এই সৌরঝড়ের পাশাপাশি সোমবার বেলা ২টা ২০ মিনিটে (ইস্টার্ন টাইম) পৃথিবীতে আঘাত হানছে একটি তীব্র ভূচৌম্বকীয় ঝড়। সৌর বিকিরণ ঝড়ে সূর্য থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতির চার্জযুক্ত কণার স্রোত আসে। আর ভূচৌম্বকীয় ঝড় তৈরি হয় অপেক্ষাকৃত ধীরগতির করোনাল মাস ইজেকশন বা সিএমই থেকে। সূর্যের বাইরের আবরণ থেকে ছিটকে যাওয়া প্লাজমা ও চৌম্বকক্ষেত্রের এই বিস্ফোরণ পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে সংঘর্ষে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

আরও পড়ুন

সৌরঝড়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো অরোরা বা মেরুজ্যোতি। সূর্য থেকে আসা শক্তিশালী কণাগুলো যখন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সঙ্গে বিক্রিয়ায় আকাশে তৈরি হয় রঙিন আলোর ঝলক। উত্তর গোলার্ধে একে বলা হয় অরোরা বোরিয়ালিস এবং দক্ষিণ গোলার্ধে অরোরা অস্ট্রালিস। এবার যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাংশের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই মেরুজ্যোতি দেখা যেতে পারে। এমনকি আলাবামা ও উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্তও এই আলো পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে এসডব্লিউপিসি।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের মিনেসোটার মতো কিছু এলাকায় আকাশ পরিষ্কার থাকার সম্ভাবনা বেশি। ফলে সেখানে মেরুজ্যোতি দেখার সুযোগও ভালো। কোথাও কোথাও খালি চোখে আলো খুব স্পষ্ট না হলেও মুঠোফোন বা ক্যামেরার সেন্সরে ধরা পড়তে পারে এই রঙিন আলোর নাচ।

মেরুজ্যোতি দেখতে চাইলে আলোদূষণ থেকে দূরে মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলে, উত্তর দিক খোলা রেখে তাকাতে হবে বাইরে। অন্ধকার নামার পরই সৌরঝড়ের আকাশি রং সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

আরও পড়ুন