টিউলিপ ম্যানিয়া কী, ফুল কিনে কেউ দেউলিয়া হতে পারে?
ফুলের মূল্য সাধারণত নির্ভর করে এর প্রাপ্যতা, চাহিদা, ধরন ইত্যাদির ওপর। সপ্তদশ শতাব্দীর আগপর্যন্ত ফুলকে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার প্রচলন মানুষের মধ্যে ছিল না। তখন পর্যন্ত মানুষ ফুল লাগাত নিজেদের বাড়ির আঙিনায়, ঘরের ছাদে অথবা বাগানে। ফুল তখন ছিল শখ।
১৬৩৭ সালে পুরো পৃথিবীতে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। দেখা গেল, একটি ফুলের দামের সমমূল্য অর্থ দিয়ে একটি বাড়ি কিনে ফেলা যাচ্ছে। এমনকি একজন উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তার পুরো বছরের বেতনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল মাত্র একটি ফুলের দাম। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। তবে ওই ফুল কোনো দামি ফুল ছিল না, ছিল না দুর্লভ কোনো ফুল। এটি ছিল একটি সাধারণ টিউলিপ ফুল। তখনো বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু হয়নি। তাই এমন ঘটনা ছিল খুব অস্বাভাবিক একটি বিষয়। চলো জেনে নেওয়া যাক, ‘পৃথিবীর প্রথম ফাইন্যান্সিয়াল বাবল’ সম্পর্কে।
টিউলিপের ঘটনা জানার আগে আমাদের জানতে হবে সেই সময়ের নেদারল্যান্ডসের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে। ষোড়শ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে নেদারল্যান্ডসের অর্থনীতি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধনী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম। সেই সময়ে ইউরোপের ব্যবসা–বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখত নেদারল্যান্ডস। তখনকার সময়ে নেদারল্যান্ডস অর্থাৎ ডাচ ব্যবসায়ীরা ছিলেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। তাঁদের ব্যাংকব্যবস্থা ছিল তেমনি। এককথায়, তখন ইউরোপের পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো অনেকাংশে দাঁড়িয়ে ছিল নেদারল্যান্ডসের ওপর।
নেদারল্যান্ডসের টিউলিপকে সহজেই আলাদা করা যেত। কারণ, তখন টিউলিপ ছিল অন্য ফুলের তুলনায় তুলনামূলক রঙিন।
যেহেতু নেদারল্যান্ডসের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক স্থিতিশীল ছিল, তাই ডাচদের কাছে সব সময় প্রয়োজনের অধিক পরিমাণ অর্থ থাকত।
মানুষের হাতে যখন প্রয়োজনের অধিক টাকা থাকে, তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ তা ব্যবহার করে বিনোদনের জন্য। বিনোদন বলতে ভ্রমণ হতে পারে, বিলাসবহুল জিনিস ক্রয় করা, দুর্লভ জিনিস সংগ্রহ করা ইত্যাদি। ডাচদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। তাঁরা তখন দুর্লভ জিনিস সংগ্রহ ও বিলাসবহুল সামগ্রী কেনা শুরু করেন। যেমন চায়নিজ সিল্ক, ইন্দোনেশিয়ার মসলা ইত্যাদি। আর এখান থেকে শুরু হয় টিউলিপের গল্প।
টিউলিপ ফুল নেদারল্যান্ডসের ফুল নয়। মূলত এটি পারস্য বা বর্তমান ইরানের স্থানীয়। প্রাচীন সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যে রাজাদের অন্যতম পছন্দের ফুল ছিল টিউলিপ। তাই তাঁরা তাঁদের প্রাসাদ ও বাগানে টিউলিপ ফুল দিয়ে সজ্জিত করে রাখতেন। ১৬০০ সালের শেষের দিকে ক্যারোলাস ক্লুসিয়াস নামের এক ডাচ উদ্ভিদবিজ্ঞানী পারস্য থেকে কিছু টিউলিপ ফুলের চারা নিয়ে আসেন এবং ইউনিভার্সিটি অব লেইডেনের সামনে একটা জায়গায় সেই চারা রোপণ করেন। এটিই ছিল নেদারল্যান্ডসে প্রথম টিউলিপ ফুলের আগমন। আস্তে আস্তে নেদারল্যান্ডসে টিউলিপ ফুটতে শুরু করে।
নেদারল্যান্ডসের টিউলিপকে সহজেই আলাদা করা যেত। কারণ, তখন টিউলিপ ছিল অন্য ফুলের তুলনায় তুলনামূলক রঙিন। টিউলিপ হাতে ধরলেই কাপড়ের মতো মসৃণ লাগত, যা অন্য ফুল ধরলে বোঝা যেত না। টিউলিপ শুধু বসন্তকালে ফোটে। বছরের অন্য সময়ে এই ফুল ফোটে না।
তবে সমস্যার শুরু হয় তখন, যখন টিউলিপের ঋতু শেষ হয়ে অর্থাৎ বসন্তকাল শেষ হয়ে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে টিউলিপ হারিয়ে যায়।
এসব কারণে ডাচরা টিউলিপ ফুল অনেক পছন্দ করেন। টিউলিপ ফুল বাসায় আনা শুরু করেন। এ ঘটনা যখন ঘটতে থাকে, তখন এর মধ্যে আরেকটা বড় ঘটনা ঘটে। টিউলিপ ব্রেকিং ভাইরাস নামের একটি ভাইরাস টিউলিপের গঠন ও আকার ভেঙে যায়। ভাইরাসটি টিউলিপ ফুলের পাপড়ির একহারা রংকে ‘ভেঙে’ দিয়ে সেখানে আকর্ষণীয় নকশা বা আগুনের শিখার মতো দাগ তৈরি করে।
এই ঘটনা যখন ঘটল, তখন মানুষ আরও বেশি টিউলিপ ফুল কিনতে শুরু করল। বিশেষ করে যে ফুলগুলো ব্রেকিং ভাইরাসে আক্রান্ত, সেগুলো। ব্যবসায়ীরা এই ভাইরাসকে ব্যবহার করে নতুন নতুন জাতের টিউলিপ বাজারে নিয়ে আসতে শুরু করেন।
মানুষ তখন হুমড়ি খেয়ে পড়ে টিউলিপের ওপর। টিউলিপ হয়ে যায় সম্ভ্রান্ত ও রুচিশীল মানুষের প্রতীক। টিউলিপের দাম হয়ে যায় আকাশচুম্বী।
পুরো নেদারল্যান্ডসের অনেক মানুষ ধীরে ধীরে টিউলিপ চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মানুষ তখন টিউলিপকে সৌন্দর্যের জন্য নয়, তার অর্থনৈতিক মূল্যের জন্য কিনতে শুরু করেন। যার ফলে, বেশির ভাগ মানুষ টিউলিপ কিনে থাকলেও তা আর বিক্রি করেননি। এতে টিউলিপের দাম দিনে দিনে বাড়তে থাকে।
তবে সমস্যার শুরু হয় তখন, যখন টিউলিপের ঋতু শেষ হয়ে অর্থাৎ বসন্তকাল শেষ হয়ে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে টিউলিপ হারিয়ে যায়।
তখন ব্যবসায়ীরা খুব দারুণ একটা কাজ করলেন। টিউলিপের দলিল লিখে দিতে শুরু করলেন তাঁরা। মানে, তাঁরা টিউলিপের জায়গায় টিউলিপের দলিল বিক্রি করা শুরু করেন, যেখানে লেখা ছিল ক্রেতার নাম এবং তিনি কয়টি টিউলিপের মালিক ছিলেন। মানুষ তখন এই টিউলিপের দলিলগুলো কিনতে শুরু করেন। মানুষ তখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টিউলিপ কিনতে থাকেন। এমনকি নিজেদের যা ছিল, সবকিছু বিক্রি করে দেন শুধু টিউলিপ কেনার জন্য। কারণ, টিউলিপের দাম প্রতিদিনই বেড়ে চলছিল।
শুধু যে ছড়িয়ে পড়ে তা নয়, অনেক মিথ্যা খবরও ছড়িয়ে যেতে থাকে টিউলিপ নিয়ে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
টিউলিপের দাম যেভাবে হঠাৎ বেড়ে ছিল, ঠিক তেমনি হঠাৎ পড়তে শুরু করে। অনেক গবেষকদের মতে, এটি হয়েছিল টিউলিপের অধিক প্রাচুর্যতার কারণে, আবার অনেকে বলেন অর্থনৈতিক কারণে হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ দাম পড়তে শুরু করেছিল। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় একটি নিলামের ঘটনায়।
টিউলিপের দাম যখন আকাশচুম্বী হওয়ার পথে, তখন অনেক নিলাম ঘর বিভিন্ন ধরনের টিউলিপের নিলাম শুরু করে। অর্থাৎ নিলামে উপস্থিত যে ব্যক্তি টিউলিপের সর্বোচ্চ দাম দিতে পারবেন, তিনি টিউলিপগুলো কিনতে পারবেন।
১৬৩৭ সালে নেদারল্যান্ডসের হারলেম শহরে এমনই একটি নিলাম অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, যেখানে টিউলিপ নিলামে তোলা হয়েছিল। তবে কোনো এক কারণে কেউ সেদিন সেই নিলামে কোনো টিউলিপ কেনেননি। অনেকে ধারণা করে থাকেন, হয়তো সেদিন সেখানে কারও টিউলিপ কেনার প্রয়োজন পড়েনি অথবা তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত টিউলিপ ছিল। তাই তাঁরা শুধু সেখানে নিলাম দেখতে গিয়েছিলেন। তবে নির্দিষ্টভাবে এর সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
এ কথাটি বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে যে একটি নিলামে কেউ টিউলিপ কেনেননি। শুধু যে ছড়িয়ে পড়ে তা নয়, অনেক মিথ্যা খবরও ছড়িয়ে যেতে থাকে টিউলিপ নিয়ে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মানুষ যাঁর কাছে যত টিউলিপ ছিল, সব বিক্রি করার জন্য ছুটে যান। পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটা সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। যখন কোনো ব্যাংক নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে, তখন মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েন সেই ব্যাংক থেকে টাকা তোলার জন্য। ঠিক একই ঘটনা টিউলিপের ক্ষেত্রেও ঘটে।
যাঁরা তাঁদের সব সম্পত্তি বিক্রি করে টিউলিপ কিনেছিলেন, তাঁরা দেউলিয়া হয়ে যান। যাঁরা তাঁদের বাড়িঘর, খামার, ঘোড়া সবকিছু বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছিলেন, তাঁরাও দেউলিয়া হয়ে যান।
অর্থনীতির ভাষায়, যখন কোনো জিনিস সবাই একসঙ্গে বিক্রি করতে যান এবং সেই জিনিস কেনার মতো ক্রেতা থাকেন না, তখন সেই জিনিসের মূল্য দ্রুত ধসে যায়। বলা চলে, জিনিসটি প্রায় মূল্যহীন হয়ে দাঁড়ায়। টিউলিপের দামও তখন দ্রুত পড়তে থাকে।
যাঁরা তাঁদের সব সম্পত্তি বিক্রি করে টিউলিপ কিনেছিলেন, তাঁরা দেউলিয়া হয়ে যান। যাঁরা তাঁদের বাড়িঘর, খামার, ঘোড়া সবকিছু বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছিলেন, তাঁরাও দেউলিয়া হয়ে যান। তখন নেদারল্যান্ডস সরকার পরিস্থিতি সামলানোর জন্য একটা অধ্যাদেশ জারি করে, তা হলো যাঁদের কাছে টিউলিপের দলিল ছিল, তাঁরা সেই দলিল সরকারের কাছে নিয়ে গিয়ে কিছু অর্থের বিনিময়ে অকার্যকর করতে পারবেন। উপায় না পেয়ে মানুষ তখন এই কাজটিই করেন।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশটির অর্থনীতি বিশাল ধাক্কা খায় এবং বিনিয়োগকারীরা দেউলিয়া হয়ে পড়েন শুধু একটি ফুলের জন্য, যার নাম ‘টিউলিপ’।
অর্থনীতিতে এই গল্পটিকে বলা হয় ‘টিউলিপ ম্যানিয়া’।