বইয়ের জনরা যেভাবে মস্তিষ্ক বদলে দেয়

মনোযোগ বাড়াতে বই পড়া একটা ভালো অভ্যাসছবি: প্রথম আলো

প্রত্যেক পাঠকের একটা নিজস্ব পছন্দের জনরা থাকে। কেউ হয়তো ফ্যান্টাসি ভালোবাসে, আবার কেউ হরর। আমার ক্ষেত্রে সেটা থ্রিলার। ফ্যান্টাসি বা কল্পকাহিনিও মন্দ লাগে না। তবে একটা প্রশ্ন আমাকে প্রায়ই ভাবায়, কেন আমাদের একেকজনের একেক ধরনের বই ভালো লাগে? কেউ ফ্যান্টাসি নিয়ে পাগল, কেউ থ্রিলার পেলেই গোগ্রাসে গেলে, আবার কেউ আত্মজীবনী ছাড়া কিছুই পড়তে চায় না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একটা গল্পের ভেতরে যখন আমরা পুরোপুরি ডুবে যাই, তখন আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে ঠিক কী ঘটে? আমার থ্রিলার-পাগল মস্তিষ্কের সঙ্গে স্টিফেন কিংয়ের হরর পছন্দ করা মানুষটির মস্তিষ্কের কোনো পার্থক্য তৈরি হয় কি? নাকি দুজনের মস্তিষ্কে একই রকম জিনিস ঘটে? সেটাই এই লেখায় বোঝার চেষ্টা করব।

বই পড়ার সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে

বই পড়া মানে মস্তিষ্কের জন্য একটা বিশাল কাজ। তুমি যখন পড়ো, তখন তোমার মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল বা দেখার অংশগুলো অক্ষরগুলো চেনে, ভাষার নেটওয়ার্কগুলো সেই আকারগুলোকে শব্দ ও অর্থে রূপান্তর করে। তোমার মনোযোগ তোমাকে পড়ার পাতায় ধরে রাখে, আর তোমার স্মৃতিশক্তি প্রতিটি নতুন শব্দকে আগের পড়া ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেয়।

তবে ফিকশন বা কল্পকাহিনি পড়ার সময় মস্তিষ্ক আরও দারুণ একটা কাজ করে। বাস্তবের মতো একটা পরিস্থিতি তৈরি করে। তুমি যখন গল্পের কোনো চরিত্রের অবস্থা কল্পনা করো, তখন তোমার নিজের স্মৃতি ও জ্ঞান মিলেমিশে সেই চরিত্রটিকে তোমার চোখের সামনে জ্যান্ত করে তোলে। এ কারণেই বইয়ের কোনো চরিত্রের দুঃখে আমরা কেঁদে ভাসাই বা ভয়ে শিউরে উঠি! মস্তিষ্ক তখন এই আবেগগুলোকে বাস্তবের মতোই সত্য বলে ধরে নেয়।

আরও পড়ুন

আমরা কেন নির্দিষ্ট জনরার বই পছন্দ করি

আমরা কেন নির্দিষ্ট কোনো বই পছন্দ করি, তার হাজারটা কারণ থাকতে পারে। কখনো হয়তো আমাদের গল্পের পটভূমি ভালো লাগে, কখনো চরিত্র। আবার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বা জীবনের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেও আমাদের পছন্দ বদলে যেতে পারে।

তবে গবেষকেরা বলেন, যারা জীবনে একটু বেশি উত্তেজনা খোঁজে, তারা হরর বা অ্যাকশন থ্রিলারের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। অন্যদিকে যারা জীবনে একটু শান্তি খোঁজে, তারা হালকা মেজাজের রোমান্টিক বা আরামদায়ক গল্পের বই বেছে নেয়।

কোন জনরা মস্তিষ্কে কেমন প্রভাব ফেলে

১. মিস্ট্রি ও থ্রিলার

থ্রিলার পড়ার সময় তোমার মস্তিষ্ক রীতিমতো গোয়েন্দাগিরি শুরু করে দেয়! নতুন নতুন সূত্র বা ক্লু পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক অনুমান করতে থাকে এরপর কী হবে। সঙ্গে সঙ্গে আগের অনুমানগুলো বাতিল করতে থাকে। ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, থ্রিলার পড়ার সময় মস্তিষ্কের যে অংশগুলো ভবিষ্যৎ অনুমান করা এবং চরিত্রের ভয় বা ইচ্ছা বোঝার কাজ করে, সেগুলো অনেক সক্রিয় হয়ে ওঠে। মস্তিষ্ক তখন আর শুধু কাহিনি শেষ করার জন্য অপেক্ষা করে না, সে নিজেই একটা থিওরি দাঁড় করায় এবং প্রতিটি নতুন তথ্যের সঙ্গে সেটা মিলিয়ে দেখে।

২. রোমান্স

রোমান্স বা প্রেমের উপন্যাস পড়ার সময় মস্তিষ্ক মানুষের আবেগ, আকর্ষণ ও সম্পর্কের রসায়ন বুঝতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি রোমান্স ফিকশন পড়েন, তাঁদের অন্য মানুষের আবেগ বোঝার ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে ভালো হয়। প্রেমে পড়লে আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন নামের হরমোন যেমন কাজ করে, রোমান্স উপন্যাস পড়ার সময়ও মস্তিষ্ক অনেকটা সেই রকম ছন্দ তৈরি করে।

৩. ফ্যান্টাসি

ফ্যান্টাসি উপন্যাস পড়ার সময় পাঠককে এমন একটা নতুন দুনিয়া তৈরি করতে হয়, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। সেখানে নতুন নিয়মকানুন শিখতে হয় এবং সেই নিয়ম ভাঙলে বুঝতে হয় যে কী ঘটতে যাচ্ছে। হ্যারি পটার সিরিজের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্যান্টাসি পড়ার সময় মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ সক্রিয় হয়, যেগুলো অপ্রত্যাশিত তথ্য মেলানো এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। তুমি যখন কোনো ফ্যান্টাসি পড়ছ, তখন তুমি আসলে মস্তিষ্কের ভেতরে নতুন একটা বিশাল কৌশলগত গেম খেলছ!

৪. হরর

ভয়ের গল্প আমাদের আনন্দদায়ক ভয় দেয়। অর্থাৎ আমরা জানি যে আমরা নিরাপদ জায়গায় আছি, তবু আমরা ভয় পেতে চাই। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ভয় যেমন অস্বস্তিকর, তেমনি ভয় না থাকাও একঘেয়ে। বই আমাদের সেই মাঝামাঝি আনন্দটা দেয়। মজার ব্যাপার হলো, হরর ফ্যানদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, মহামারির মতো কঠিন সময়েও তারা মানসিকভাবে বেশি শক্ত থাকে। কারণ, তাদের মস্তিষ্ক আগে থেকেই ভয়ংকর সব পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত!

আরও পড়ুন

৫. ঐতিহাসিক কল্পকাহিনি

ঐতিহাসিক ফিকশন আমাদের অন্য একটা যুগে নিয়ে যায়। শুধু তারিখ ও নাম মুখস্থ করার বদলে, তুমি বুঝতে পারো ওই সময়কার মানুষের জীবন কেমন ছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, ঐতিহাসিক ফিকশন পড়লে মানুষের অন্যকে বোঝার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

৬. স্মৃতিকথা

কারও আত্মজীবনী পড়ার সময় আমরা অবচেতনভাবেই তার জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করতে থাকি। আমি কি এমন পরিস্থিতিতে পড়লে একই কাজ করতাম? এই তুলনা আমাদের নিজেদের স্মৃতিগুলোকেও নতুন করে ভাবতে সাহায্য করে।

৭. রম্যরচনা

রম্যরচনা বা জোকস পড়ার সময় মস্তিষ্ককে দুটো কাজ করতে হয়। প্রথমে বুঝতে হয় জোকসটা আসলে কী নিয়ে, আর তারপর সেটা বোঝার আনন্দটা নিতে হয়। জোকস বোঝা মানে মস্তিষ্কের জন্য একটা ছোট সমস্যা সমাধান করা। এরপরই তুমি আসল আনন্দ পাবে, যা একটা পুরস্কারের মতো।

কোন জনরার বই পড়া সবচেয়ে ভালো

আসলে এভাবে নির্দিষ্ট করে কোনো জনরার নাম বলা সম্ভব নয়। একেক জনের একেক জনরা ভালো লাগে এবং এটাই স্বাভাবিক। ‘অমুক’ জনরা সবচেয়ে ভালো বলে কোনো কথা নেই! ফ্যান্টাসি তোমার কল্পনাশক্তিতে শাণ দেয়, থ্রিলার অনুমান করার ক্ষমতা বাড়ায়, নন-ফিকশন জ্ঞান বাড়ায়। সবচেয়ে ভালো বই সেটাই, যেটা পড়তে তোমার ভালো লাগে আর যা তোমার মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।

পড়ার সময় মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ ব্যবহার কীভাবে করবে

মনোযোগ ধরে রাখো: পড়ার সময় ফোন দূরে সরিয়ে রাখো, নোটিফিকেশন বন্ধ রাখো। মন যদি বারবার অন্যদিকে চলে যায়, তবে গল্পের ভেতরে ঢোকা সম্ভব নয়।

অনুমান করো: পড়ার ফাঁকে ফাঁকে একটু থামো এবং ভাবো, এরপর কী হতে পারে? তোমার অনুমান ভুল হলেও সেটা তোমাকে গল্পের সঙ্গে আটকে রাখবে।

মনে করার চেষ্টা করো: পড়ার পর বই বন্ধ করে একটু ভাবার চেষ্টা করো—কী পড়লে, কোন চরিত্র কী চায়। এই ছোট্ট রিভিশনটা পড়া বিষয়গুলোকে তোমার মস্তিষ্কে স্থায়ী করে দেবে।

নিজের ভাষায় বোঝাও: বইটা পড়ে তোমার কী মনে হলো, সেটা কাউকে বলো বা লিখে রাখো। চাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা পোস্ট করে অন্যদেরও জানাতে পারো।

বারবার পড়ো: প্রিয় বই দ্বিতীয়বার পড়লে কোনো ক্ষতি নেই। এতে তুমি হয়তো এমন কিছু নতুন বিষয় বা ইঙ্গিত খুঁজে পাবে, যা প্রথমবার পড়ার সময় তাড়াহুড়াতে খেয়ালই করোনি!

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট
আরও পড়ুন