বই পড়ার সময় মাথার মধ্যে কেন ছবি তৈরি হয়
টান টান উত্তেজনার একটা গল্পের বই পড়ছ। গল্পের হিরো তখন খাদের কিনারে ঝুলছে। নিচে ভয়ংকর নদীর গর্জন। পড়ার সময় তোমার চোখের সামনে ঠিকই ভেসে ওঠে খাদের কিনারে থাকা সেই হিরোর ক্লান্ত মুখ। তুমি যেন নদীর সেই ভয়ংকর গর্জনও শুনতে পাও! কিন্তু তোমার হাতে তো আছে কেবল একটা কাগজের বই। সাদা কাগজের ওপর কালো কালির কিছু অক্ষর। সেখানে কোনো ছবি নেই, কোনো ভিডিও নেই, নেই কোনো সাউন্ড স্পিকারও। তাহলে মাথার ভেতর দারুণ ছবিগুলো কোথা থেকে আসে? কোথা থেকে আসে এত শব্দ ও উত্তেজনা?
সত্যি কথা বলতে, বই পড়া মোটেও কোনো সাধারণ কাজ নয়। এটি অনেকগুলো ধাপে ঘটা একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। আমরা যখন বইয়ের দিকে তাকাই, তখন আমাদের চোখ সবার আগে কাগজের ওপর থাকা আলাদা আলাদা অক্ষরকে চেনে। এরপর মস্তিষ্ক অক্ষরগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে একটি শব্দ তৈরি করে। তারপর শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তৈরি হওয়া পুরো বাক্যটির গঠন বিশ্লেষণ করে এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করে। এই যে এত কাজ, এগুলো এত দ্রুত ঘটে যে আমরা টেরই পাই না!
এই পুরো সময় আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করতে থাকে। তারা গল্পের চারপাশের পরিবেশ, দৃশ্য, চরিত্র ও তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে নানা তথ্য জোগাড় করে। এরপর সেই সব তথ্যকে তোমার আগে থেকে জানা কোনো ঘটনা বা তোমার নিজের অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে। যেমন ধরো, তুমি যখন কোনো বৃষ্টির দৃশ্য পড়ো, তখন মস্তিষ্ক তোমার নিজের জীবনে দেখা বৃষ্টির স্মৃতিগুলোকে ওই লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। এভাবেই একটু একটু করে মাথার ভেতর একটা পুরো জ্যান্ত দৃশ্য তৈরি হতে থাকে।
মজার ব্যাপার হলো, গল্পের বই পড়ার সময় শুধু যে মস্তিষ্ক কাজ করে, তা কিন্তু নয়। তোমার পুরো শরীরই এ কাজে অংশ নেয়! কখনো কি খেয়াল করেছ, খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ার সময় তোমার নিজের অজান্তেই ঠোঁট বা জিহ্বা একটু একটু নড়তে থাকে? যেন তুমি নিজেই কথাগুলো বলছ! অথবা খুব ভয়ংকর কোনো ভূতের গল্প পড়ার সময় শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়? টান টান উত্তেজনার কোনো দৃশ্য পড়ার সময় আমাদের শরীরের পেশিগুলোও শক্ত হয়ে যায়। আমাদের শরীরের এই সব দারুণ শারীরিক প্রতিক্রিয়াই আসলে মাথার ভেতর একটা জীবন্ত ছবি তৈরি করতে সাহায্য করে।
কিন্তু বিজ্ঞানের একটা অদ্ভুত বিষয় জানলে তুমি চমকে যাবে। আমাদের মাথার ভেতর আসলে আক্ষরিক অর্থে এমন কোনো ছবি তৈরি হয় না! বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের দেখার ক্ষমতা কোনো ছবি আঁকার যন্ত্র নয়। এটি হলো চারপাশের বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের একটা মাধ্যমমাত্র। তাই আমরা যখন বই পড়ি, তখন মস্তিষ্ক বাস্তবের মতো কোনো ছবি প্রিন্ট করে না, বরং শব্দগুলোকে আমাদের অনুভূতির সঙ্গে মিশিয়ে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে, যাকে আমরা ছবি বলে মনে করি।
এখানে আরও একটা দারুণ চমকপ্রদ ব্যাপার আছে। আমরা অনেকেই হয়তো ভাবি, লেখক যদি তাঁর লেখায় অনেক বেশি বিস্তারিত বর্ণনা দেন, তাহলে মাথার ভেতর ছবিটা আরও বেশি স্পষ্ট হবে। কিন্তু বাস্তবে ঠিক উল্টোটাই ঘটে! অনেক বেশি বিস্তারিত বর্ণনা দিলে মাথার ভেতরের ছবিটা বরং আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। এর চেয়ে সহজ ও সাধারণ বর্ণনাই বেশি কাজ করে। লেখক যখন খুব সহজ ভাষায় কিছু লেখেন, তখন তুমি তোমার নিজের আবেগ ও অনুভূতি দিয়ে ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ করে নিতে পারো। আর নিজের কল্পনার রং মেশানো জগৎটা তোমার কাছে আরও বেশি আবেগপূর্ণ ও বাস্তব হয়ে ওঠে।
মস্তিষ্ক নিয়ে যখন এত কথা হলো, তখন আরেকটা চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে শেষ করি। আমাদের শরীরের ওজনের মাত্র ২ শতাংশ হলো এই মস্তিষ্কের ওজন। অর্থাৎ পুরো শরীরের তুলনায় এটি বেশ ছোট একটা অঙ্গ। কিন্তু ওজনে ছোট হলে কী হবে, এটি আমাদের শরীরের সবচেয়ে বড় খাদক! আমাদের শরীরের মোট শক্তির ২০ থেকে ২৫ শতাংশ একাই খরচ করে ফেলে মস্তিষ্ক। কারণ, ওই যে বই পড়ার সময় তোমার মাথার ভেতর এত এত দৃশ্য তৈরি করতে হয়, সেগুলোর জন্য তো প্রচুর শক্তির দরকার, তা–ই না?