বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে কোন দল সবচেয়ে বেশি ফাউল করেছে, সবচেয়ে ভদ্র কারা

নরওয়ের অস্কার ববকে ডি–বক্সের ভেতর ফাউল করেন ফ্রান্সের থিও হার্নান্দেজ। নরওয়ে পেনাল্টি পায়। কিন্তু নরওয়ের ইয়র্গেন স্ট্রান্ড লারসেন পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই টানটান উত্তেজনা, গ্যালারিভরা দর্শকের কান ফাটানো গর্জন, মাঠের ভেতরে স্নায়ুচাপের চূড়ান্ত পরীক্ষা। ধরো, টিভির সামনে বসে তুমি উত্তেজনায় নখ কামড়াচ্ছ। তোমার প্রিয় দলের স্ট্রাইকার বল নিয়ে দৌড় দিয়েছে বিপক্ষ দলের ডি–বক্সের দিকে। গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে গোলটা করেই ফেলবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে উড়ে এল একটা পা! ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল সে, রেফারি বাজালেন কড়া বাঁশি। গ্যালারি থেকে ভেসে এল, ‘ফাউল! ফাউল!’

এমন দৃশ্য নিশ্চয়ই তুমি বিশ্বকাপে অনেকবার দেখেছ। আসলে প্রতি ম্যাচেই দেখার কথা! বিশ্বকাপের মাঠে কোনো দলই তো আর কাউকে বিনা যুদ্ধে ছেড়ে দিতে আসে না। কিন্তু এই যুদ্ধ করতে গিয়ে অনেকেই একটু বেশিই আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। আজ আমরা বিশ্বকাপের এমন একটা মজার কিন্তু রোমাঞ্চকর দিক নিয়ে আলোচনা করব। জানব, বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে কোন দলগুলো একটু বেশিই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে, মানে সবচেয়ে বেশি ফাউল কারা করেছে! পাশাপাশি কোন দল সবচেয়ে ভদ্র ছিল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে।

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো সব সময়ই একটু স্পেশাল হয়। কারণ, এখানে প্রতিটা ম্যাচই যেন বাঁচা-মরার লড়াই। একটু এদিক-ওদিক হলেই সোজা বাড়ির টিকিট ধরতে হবে। তাই খেলোয়াড়দের মধ্যেও থাকে হার না মানার এক অদ্ভুত জেদ। আর এই জেদের বশেই অনেক সময় তারা এমন সব ট্যাকল করে বসে, যা নিয়মের বাইরে চলে যায়।

আরও পড়ুন

ফুটবল মাঠে রেফারির চোখ ফাঁকি দিয়ে বা রেফারির সামনেই প্রতিপক্ষকে অবৈধভাবে বাধা দেওয়ার নামই ফাউল। সেটা হতে পারে পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়া, জার্সি টেনে ধরা কিংবা বলের বদলে সরাসরি খেলোয়াড়ের পায়ে লাথি বা ট্যাকল করে বসা। আর এই কাজগুলো করার জন্যই রেফারি পকেট থেকে হলুদ বা লাল কার্ড বের করে সতর্ক করেন।

নেইমারকে ফাউল করা হয় বেশি, প্রতিক্রিয়াও দেখান একটু বেশি।
ছবি: রয়টার্স

যাহোক, এবার আসল প্রশ্নে ফেরা যাক। বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানের পাতা ঘাঁটলে তুমি এমন কিছু দলের নাম পাবে, যারা ফাউল করার দিক থেকে একদম ওপরের দিকে আছে। তুমি হয়তো ভাবছ, সবচেয়ে বেশি ফাউল নিশ্চয়ই কোনো অচেনা বা দুর্বল দল করেছে? ধারণাটাকে কিন্তু মোটেই ভুল বলা যায় না। তবে পুরোপুরি ঠিকও নয়।

২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকালে দেখবে, গ্রুপ পর্বে ফাউল করার তালিকায় সবার ওপরে জ্বলজ্বল করছে হাইতির নাম! পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গ্রুপ পর্বের মাত্র তিন ম্যাচে তারা ফাউল করেছে ৫৫ বার! গত কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে বেশি ফাউল করেছিল সৌদি আরব—৫৬ বার। প্রায় কাছাকাছি। পরিসংখ্যানের পরের দলগুলো যথাক্রমে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (৪৭), ঘানা (৪৬), পানামা (৪৬), উজবেকিস্তান (৪৫), স্কটল্যান্ড (৪২), জাপান (৪২) ও প্যারাগুয়ে (৪১)। এই দলগুলো তিন ম্যাচে ৪০টির বেশি ফাউল করেছে।

আরও পড়ুন

এবার বড় দলগুলোর বিষয়টা একটু দেখা যাক। বড় দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফাউল করেছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল (৪০)। এরপর রয়েছে ইংল্যান্ড (৩৭), স্পেন (৩৭), জার্মানি (৩৩), আর্জেন্টিনা (৩৩), পর্তুগাল (২৯), ফ্রান্স (২৪)।

সবচেয়ে কম ফাউলও করেছে খাতা–কলমের একটি ছোট দল। দলটি ইতিমধ্যে নিজেদের খেলার মাধ্যমে সবাইকে অবাক করেছে, প্রশংসা কুড়িয়েছে। দলটির নাম কেপ ভার্দে। মাত্র ১৫টি ফাউল করে দলটি রয়েছে সবার নিচে। এই দলটিকেই গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে ভদ্র দল বলা যায়। ১৭টি ফাউল করে ৪৭ নম্বরে আছে আলজেরিয়া। এরপর যথাক্রমে রয়েছে আইভরিকোস্ট (২৩), সেনেগাল (২৪), দক্ষিণ কোরিয়া (২৫), নেদারল্যান্ডস (২৬)।

আচ্ছা, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ফাউলের বিষয়টা তো জানা হলো। এখন কিছু বাড়তি কথা বলি। ফুটবলের কিন্তু একটা লুকানো অস্ত্র আছে। এর নাম ট্যাকটিক্যাল ফাউল বা কৌশলগত ফাউল। অনেক সময় বড় দলগুলো ইচ্ছা করেই ফাউল করে। ধরো, প্রতিপক্ষ দল এমন একটা কাউন্টার অ্যাটাকে গেল, যা থেকে নিশ্চিত গোল হতে পারে। তখন ডিফেন্ডাররা বুদ্ধি করে মাঝমাঠেই তাঁকে ফাউল করে ফেলে দেন।

মার্কেজের ফাউল, রোবেনের ডাইভ। বিতর্ক উসকে দেওয়া সেই মুহূর্ত l এএফপি

এতে হয়তো ডিফেন্ডারকে একটা হলুদ কার্ড দেখতে হয়, কিন্তু দলের একটা নিশ্চিত গোল হজম করার হাত থেকে তো বেঁচে যায়! এটা কোচদের শেখানো একটা বড় কৌশল। তাই ফাউল করা মানেই যে খেলোয়াড়েরা খারাপ খেলছেন বা ইচ্ছা করে কাউকে আঘাত করছেন, বিষয়টা কিন্তু সব সময় তেমন নয়। এটা আসলে আধুনিক ফুটবলেরই একটা অংশ।

আবার ফাউল ছাড়া কিন্তু ফুটবলের আসল মজাই পাওয়া যায় না! এই যে রেফারি বাঁশি বাজান, দুই দলের খেলোয়াড়েরা রেফারির সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেন, গ্যালারিতে উত্তেজনা ছড়ায়, এবং সবচেয়ে বড় কথা, ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত সব গোল হয়! এগুলো তো ফাউল থেকেই আসে, তাই না? ফাউল না থাকলে কি আর ডেভিড বেকহ্যাম বা লিওনেল মেসিদের সেই জাদুকরি ফ্রি-কিকগুলো আমরা দেখতে পেতাম? কিংবা পেনাল্টি শুটআউটের সেই শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তগুলো?

সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বটা হয়ে ওঠে ফাউল, হলুদ কার্ড আর স্নায়ুচাপের এক দারুণ প্যাকেজ। পরিসংখ্যানের ওই ওয়েবসাইটটিতে ঢুঁ মারলে তুমি আরও অনেক দলের এমন অবাক করা তথ্য পাবে, যা ফুটবলের ভেতরের অনেক না-বলা কথা বলে দেয়।

তবে দিন শেষে ফুটবল মানেই আনন্দ, উত্তেজনা এবং আবেগের খেলা। কেউ ফাউল করে জেতে, কেউ আবার সেই ফাউল থেকে পাওয়া ফ্রি-কিকে গোল করে দর্শকদের আনন্দের জোয়ারে ভাসায়!

আরও পড়ুন