চালক জ্ঞান হারালে হাইওয়েতে যেভাবে স্কুলবাস থামিয়ে দিল শিক্ষার্থীরা

বিপদের মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা ভয় না পেয়ে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে পরিস্থিতি সামলে নেয়ছবি: গার্ডিয়ান

২২ এপ্রিল, বুধবার মিসিসিপির কিলন শহরের হ্যানকক মিডল স্কুল সবে ছুটি হয়েছে। সব শিক্ষার্থী হইহুল্লোড় করে বাসে এসে বসে। বাসটি ঠিক সময়েই তাদের নিয়ে রওনা দেয়। কিন্তু কিছুদূর যেতেই চালক লিয়া টেলর তীব্র হাঁপানির সমস্যায় পড়েন। একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। চালকহীন দ্রুতগতির বাসটি তখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপজ্জনকভাবে চলতে থাকে। ঠিক এমন বিপদের মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা ভয় না পেয়ে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে পরিস্থিতি সামলে নেয়।

এই ঘটনায় চালক লিয়া টেলর সুস্থ হওয়ার পর জানান, ‘ওরা সেদিন আমার জীবন বাঁচিয়েছে। মূলত শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও সঠিক সময়ে বাসটি থামানোর কারণেই এক ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।’

মিসিসিপির সেই চলন্ত বাসে যখন চালক জ্ঞান হারালেন, তখন ১২ বছর বয়সী জ্যাকসন ক্যাসনাভ সিট থেকে উঠে কী করা যায় তা চিন্তা করছে। ষষ্ঠ শ্রেণির এই ছাত্রটি দেখল বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এদিক-ওদিক যাচ্ছে। কোনো কিছু না ভেবেই সে দ্রুত স্টিয়ারিং হুইলটি ধরে ফেলে। জ্যাকসন পরে জানায়, সেই সময় ভয় পাওয়ারও সুযোগ ছিল না, কারণ তার লক্ষ্য ছিল বাসের সবাইকে নিরাপদে রাখা।

আরও পড়ুন

জ্যাকসনের সঙ্গে যোগ দেয় ড্যারিয়াস ক্লার্ক নামের আরেক ছাত্র। বাসের গতি বাড়তে দেখে সে দ্রুত ব্রেক চেপে ধরার চেষ্টা করে। তবে স্কুলের বড় বাসগুলোতে ‘এয়ার ব্রেক’ থাকে, যা খুব শক্তিশালী হয়। ড্যারিয়াস যখন জোরে ব্রেক চাপে, তখন বাসের ঝাঁকুনিতে সে প্রায় জানালা দিয়ে বাইরে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তাদের এই প্রাণপণ চেষ্টাতেই বাসটি শেষ পর্যন্ত বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যায়।

বাসটির গতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর দুই শিক্ষার্থী মিলে সেটিকে রাস্তার ডিভাইডারের কাছে নিরাপদ জায়গায় থামাতে পারে

বাসটির গতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর দুই শিক্ষার্থী মিলে সেটিকে রাস্তার ডিভাইডারের কাছে নিরাপদ জায়গায় থামাতে পারে। এই কঠিন সময়ে ১৩ বছর বয়সী কেইলি দ্রুত ৯১১ নম্বরে ফোন করে সাহায্য চায়। বাসের ভেতর তখন অন্য ছাত্রছাত্রীদের চিৎকারে কান ঝালাপালা অবস্থা। ফোনে কথা শোনাও যাচ্ছিল না। কেইলি জানায়, সে খুব ভয় পেলেও জানত যে তাকে সাহায্য করতেই হবে।

অন্যদিকে, ১৫ বছর বয়সী ডেস্টিনি কর্নেলিয়াস চালক টেলরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। সে দেখতে পায় টেলরের হাতে একটি নেবুলাইজার রয়েছে। সময় নষ্ট না করে সে দ্রুত সেটি দিয়ে চালককে শ্বাস নিতে সাহায্য করে। ঠিক সেই মুহূর্তে ১৩ বছর বয়সী ম্যাকেনজি ফিঞ্চ চালকের মাথাটি সযত্নে আগলে ধরে রাখে। একই সঙ্গে সে চালকের বেজে ওঠা ফোনটি রিসিভ করে স্কুল কর্তৃপক্ষকে পুরো বিষয়টি দ্রুত জানিয়ে দেয়। এই একদল উদ্ধারকারীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর সাহসেই একটি নিশ্চিত বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

আরও পড়ুন
শিক্ষার্থীদের এই অসামান্য সাহসিকতাকে সম্মান জানাতে গত শুক্রবার স্কুলে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়
ছবি: নিউইয়র্ক পোস্ট

বাসটি নিরাপদে থামানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই জরুরি উদ্ধারকর্মীরা সেখানে পৌঁছান। চালক লিয়া টেলরকে দ্রুত চিকিৎসা সেবা দেন। বর্তমানে তিনি সেই কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। শিক্ষার্থীদের এই অসামান্য সাহসিকতাকে সম্মান জানাতে গত শুক্রবার স্কুলে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে সবার সামনে সেই শিক্ষার্থীদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

চালক টেলর অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘আমি এই শিক্ষার্থীদের নিয়ে গর্বিত। আমার বাসে যারা যাতায়াত করে, তাদের চেয়ে ভালো আর কেউ হতে পারত না। আমি তাদের প্রত্যেককে মন থেকে ভালোবাসি। আজীবন মনে রাখব কীভাবে তারা নিজের জীবন বাজি রেখে সেদিন আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছিল।’ মূলত বিপদের মুখে ঘাবড়ে না গিয়ে একে অপরকে সাহায্য করার মাধ্যমেই তারা এই বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক পোস্ট

আরও পড়ুন