পিটুলিগাছ যেভাবে আগলে রাখে নদীর পাড়
পিটুলিগাছ চেনো তুমি? নদীর ধারে, বিলের কিনারে, রাস্তার পাশে অযত্নে বেড়ে ওঠা একটি গাছ। দেখতে সুদর্শন নয় মোটেই। কাণ্ড বাঁকানো, মোচড়ানো, ডালপালা এলোমেলো ছড়ানো। প্রথম দেখায় চোখে লাগার মতো কিছু নেই এতে। অথচ অবহেলিত এ গাছটাই বাংলাদেশের নদীভাঙন আর ভূমিক্ষয়ের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে কাজ করছে।
বৈজ্ঞানিক নাম Trewia nudiflora। ইউফোরবিয়াসি পরিবারের সদস্য। ইংরেজিতে ডাকা হয় ফলস হোয়াইট টিক নামে। তবে গ্রামে এর পরিচিতি মেড্ডা, লাটিম, লাড্ডু, মেড়াগোটা, মেড়া, গোটাগামার, পিটালি, গুটু, পিটাডোংগা। এত এত নাম দেখলেই বোঝা যায় গাছটা কতটা ছড়িয়ে ছিল। মাঝারি আকারের গাছ। ১০ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। জঙ্গলে পুকুরপাড়ে বিলের ধারে নদীর কিনারে জন্মে। কখনো কখনো পানির মধ্যেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় একে।
এখানেই লুকিয়ে আছে গল্পটা। যে জায়গায় সাধারণ গাছ বাঁচতে পারে না, জলাবদ্ধ মাটি, বছরে কয়েক মাস ডুবে থাকা চর, নদীর টানা স্রোতের ধাক্কা, সেখানেই পিটুলি বেঁচে থাকে অনায়াসে। শিকড় ছড়িয়ে দেয় গভীরে আর চারপাশে। মাটির কণাগুলোকে আঁকড়ে রাখে শক্ত করে। নদীর পাড় যখন বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠে, স্রোত যখন পাড় কেটে নিয়ে যেতে চায় প্রতি মৌসুমে একটু একটু করে, তখন এই শিকড়ের জালই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মাটি ধুয়ে যাওয়ার পথটা বন্ধ করে দেয় ও।
গ্রামের পুরোনো দিনের মানুষেরা এই কথাটা জানত ভালোভাবেই। তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই পিটুলি লাগানো হতো নদীর ধারে, বিলের কিনারে। কোনো কৃষি বিভাগের পরামর্শ লাগেনি। শুধু বংশপরম্পরায় পাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে লাগানো হয়েছে এই গাছ। কেউ জানত না ঠিক কোন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় গাছটা কাজ করে, কিন্তু এটা সবাই জানত, যেখানে পিটুলি আছে সেখানে পাড় সহজে ভাঙে না। এই এক টুকরা লোকজ্ঞান আসলে আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের একটা সত্যকেই ধরে রেখেছিল বহু বছর ধরে। নদীর পাড়ে বা ঢালু জমিতে গাছের শিকড়ের জাল যত ঘন আর ছড়ানো হয় মাটি ততই স্থিতিশীল থাকে। আর গাছের পাতা, ডালপালার ছাউনি বৃষ্টির ফোঁটাকে সরাসরি মাটিতে আছড়ে পড়তে দেয় না। এতে মাটির উপরিভাগের ক্ষয়ও কমে যায় অনেকখানি।
পিটুলির ফুল ফোটে বসন্তে। রংটা হলুদ। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সারা বছর যে গাছটাকে দেখলে চোখ ফিরে যায় না, ফুল ফোটার মৌসুমে সেই একই গাছ হয়ে ওঠে অপরূপ। ফল হয় বড় ডুমুরের মতো দেখতে, গোলাকার। গ্রামের ছেলেমেয়েদের কাছে এই ফলটা ছিল খেলনার উৎস। ফলের ভেতর কাঠি ঢুকিয়ে বানানো হতো লাটিম, কখনো গাড়ির চাকা, ঢিল ছোড়াছুড়ির খেলাতেও ব্যবহার করা হতো এটা। এখনকার প্রজন্মের কাছে এই খেলাগুলো অনেকটা অপরিচিত। একসময় গ্রামের বিকেলগুলোতে খেলায় এই সাধারণ ফল নিয়মিত ব্যবহার হতো।
শুধু ভূমিক্ষয় ঠেকানো নয়, পিটুলির আরও কিছু ব্যবহার আছে। এর পাতা, ছাল আর শিকড় ব্যবহার হয় নানা লোকজ চিকিৎসায়। পিত্তরোগ, ক্ষত, থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, বাতের ব্যথা—এসব নিরাময়ে গ্রামের চিকিৎসকেরা এই গাছের ওপর ভরসা রাখতেন। কাঠ দিয়ে বানানো হয় দেশলাইয়ের কাঠি। অর্থাৎ একটা গাছ, অথচ কতভাবে যে মানুষের কাজে লেগেছে বছরের পর বছর, তার হিসাব রাখেনি কেউ।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই গাছটা নিয়ে কথা বলা এত জরুরি এই মুহূর্তে? কারণ, বাংলাদেশের নদীভাঙন সমস্যাটা প্রতিবছরই আরও গুরুতর হয়ে উঠছে। পদ্মা, যমুনা, মেঘনার মতো বড় নদীগুলোর পাড় ভেঙে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবছর ঘরবাড়ি হারায়। এখন কংক্রিটের ব্লক আর জিও ব্যাগ বসিয়ে নদীর পাড় রক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের চেনা পরিচিত এই স্থানীয় গাছগুলো কাজে লাগতে পারে কি না? কারণ, এর খরচ কম, রক্ষণাবেক্ষণ সহজ। আর মাটির সঙ্গে যে গাছ শত বছর ধরে মানিয়ে নিয়ে বেঁচে আছে, এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশও কম।
তবে বাস্তবতা হলো, নগরায়ণ আর জমির ব্যবহারের চাপে পিটুলির মতো গাছগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের ভূমি থেকে। নদীর পাড় এখন অনেক জায়গায় ন্যাড়া। আগে যেখানে সারি সারি পিটুলি বা এ–জাতীয় গাছ দাঁড়িয়ে থাকত, সেখানে এখন শুধু ফসলের জমি বা বসতি। ফলাফল হাতেনাতে দেখা যাচ্ছে। প্রতি বর্ষায় ভাঙনের মাত্রা বাড়ছে। চর পড়ছে অস্বাভাবিক হারে। নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে আগের চেয়ে দ্রুত।
গ্রামের একজন প্রবীণ কৃষকের সঙ্গে কথা বললে হয়তো শুনতে পাবে—আগে নদীর পাড়জুড়ে ছিল সারি সারি মেড্ডাগাছ, আর এখন সেই জায়গায় খালি চর। কথাটা শুনতে সাধারণ লাগলেও এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা বড় বার্তা। প্রকৃতি নিজেই তার সমাধান রেখে গিয়েছিল আমাদের হাতে, শুধু আমরা চিনতে ভুলে গেছি সেটাকে। পিটুলির মতো গাছ লাগানো কোনো জটিল বা ব্যয়বহুল কাজ নয়। একটি চারা, কিছুটা সময়, আর অপেক্ষা—এই তিনটি জিনিস থাকলেই নদীর পাড় আবার সবুজ হয়ে উঠতে পারে, আগের মতোই শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে মাটি।