ম্যাপে আফ্রিকাকে এত ছোট দেখায় কেন

পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হতে পারে, আফ্রিকা মহাদেশটি বোধ হয় পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে একটু বেশিই হেলে আছে। কিন্তু ভূগোলের বই ও বিশ্ব মানচিত্র মাঝেমধ্যে আমাদের কাছ থেকে আসল সত্য লুকিয়ে রাখে। তুমি জানলে চমকে উঠবে, ম্যাপে দেখতে যেমনই লাগুক না কেন, পৃথিবীর চার গোলার্ধেই আছে আফ্রিকা মহাদেশ।

পৃথিবীকে উত্তর ও দক্ষিণ ভাগে ভাগ করেছে যে কাল্পনিক রেখাটি, তার নাম নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা। এই রেখা ঠিক আফ্রিকার বুক চিরে চলে গেছে। ফলে আফ্রিকার কিছুটা পড়ল উত্তর গোলার্ধে, আর বাকিটা দক্ষিণ গোলার্ধে। মজার বিষয় হলো, আফ্রিকার প্রায় দুই–তৃতীয়াংশই উত্তর গোলার্ধে পড়েছে।

এবার আসি পূর্ব–পশ্চিমের হিসাবে। পৃথিবীর উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত যে রেখা টানা আছে, তাকে বলে জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমারেখা বা প্রধান মধ্যরেখা। এই রেখা পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ করেছে। এই রেখাটিও সোজা নেমে গেছে আফ্রিকার আলজেরিয়া, মালি, বুরকিনা ফাসো, টোগো ও ঘানার ওপর দিয়ে।

আরও পড়ুন

এবার একটু জ্যামিতির হিসাবটা মেলাও! নিরক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখার এই কাটাকুটিতে আফ্রিকার কিছু অংশ গিয়ে পড়ল উত্তর–পূর্বে, কিছু উত্তর–পশ্চিমে, কিছু দক্ষিণ–পূর্বে আর কিছু দক্ষিণ–পশ্চিমে। ব্যস! পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ হিসেবে আফ্রিকা চার গোলার্ধেই নিজের চিরস্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে ফেলল।

এবার আরও কিছু মজার তথ্য বলি। আফ্রিকার মোট আয়তন প্রায় তিন কোটি চার লাখ বর্গকিলোমিটার। এশিয়ার পরেই এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ। কিন্তু শুধু সংখ্যা দিয়ে কি আর বিশালত্ব মাপা যায়? তার চেয়ে বরং একটা মজার কাজ করা যাক।

তোমার কাছে যদি আফ্রিকা নামে বিশাল আকারের একটা জাদুর স্যুটকেস থাকে, তবে তার ভেতর তুমি কী কী ঢোকাতে পারবে জানো? আস্ত যুক্তরাষ্ট্র, বিশাল চীন, আমাদের প্রতিবেশী ভারত আর পুরো ইউরোপ মহাদেশের বড় একটা অংশ! সায়েন্টিফিক আমেরিকান সাময়িকীর হিসাব অনুযায়ী, এই সব কটি দেশ একসঙ্গে জোড়া লাগালেও তা আফ্রিকার বিশালত্বের কাছে হেরে যাবে।

তাহলে ম্যাপে এত ছোট দেখায় কেন? এখানেই লুকিয়ে আছে মানচিত্রের আসল কারসাজি। পৃথিবী তো আর কাগজের মতো চ্যাপ্টা নয়, এটি গোলক। এখন গোল একটা বলের ওপর আঁকা ম্যাপকে তুমি যদি জোর করে টেনেটুনে চ্যাপ্টা কাগজের ওপর বসাতে চাও, তবে ম্যাপের আকার তো বিকৃত হবেই!

আরও পড়ুন

মানচিত্র তৈরির এই পদ্ধতিগুলোর নাম হলো ম্যাপ প্রজেকশন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাতটির নাম মার্কেটর প্রজেকশন। ১৫৬৯ সালে জেরারডাস মার্কেটর নামের এক মানচিত্রকার নাবিকদের সমুদ্রে পথ খোঁজার সুবিধার জন্য এটি বানিয়েছিলেন। এর একটি মারাত্মক সাইড ইফেক্ট হলো, এই ম্যাপ পৃথিবীর মেরুর কাছাকাছি থাকা দেশগুলোকে টেনেহিঁচড়ে বিশাল বড় বানিয়ে দেয়!

এই ম্যাপের কারণেই আমাদের মনে হয়, বরফে ঢাকা গ্রিনল্যান্ড বুঝি আফ্রিকার সমান বড়! কিন্তু বাস্তব হলো, গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে আফ্রিকা প্রায় ১৪ গুণ বড়! শুধু গ্রিনল্যান্ড নয়, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার উত্তরের দেশগুলোকেও মানচিত্রে তাদের আসল আকারের চেয়ে অনেক বড় দেখায়। অন্যদিকে বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকায় আফ্রিকার মতো বিশাল মহাদেশকে মনে হয় একদম ছোটখাটো।

২০১০ সালে জার্মান কম্পিউটার গ্রাফিক ডিজাইনার কাই ক্রাউজ ম্যাপের এই মিথ্যাচার দেখে মানুষের ভুল ভাঙাতে চাইলেন। তিনি ‘দ্য ট্রু সাইজ অব আফ্রিকা’ নামে চমৎকার একটি গ্রাফিক তৈরি করে ফেললেন। সেখানে তিনি আফ্রিকার আসল আয়তন বোঝাতে এর ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো বড় দেশগুলোকে বসিয়ে দেখালেন। ছবিটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষের তো রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! তারা বুঝতে পারল, এত দিন ম্যাপ দেখে তারা কতটা বোকা বনে ছিল।

অবশ্য মানচিত্রকারদের খুব বেশি দোষ দিয়েও লাভ নেই। কাগজের সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁদের আকার, দূরত্ব বা দিকের যেকোনো একটিকে তো বিকৃত করতেই হতো। তবে এখন থেকে তুমি সত্যিটা জেনে রাখো, কাগজের ওই মানচিত্রটিকে পুরোপুরি বিশ্বাস কোরো না। কারণ, আফ্রিকার আসল রূপ মানচিত্রের চেয়ে অনেক বিশাল!

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, সায়েন্টিফিক আমেরিকান ও ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস
আরও পড়ুন