২০২৫ সালে আলাস্কায় আঘাত হানা সুনামিটি এযাবৎকালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ

২০২৫ সালের ১০ আগস্টের সকালে এই সুন্দর এলাকাটিতেই ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটে

দক্ষিণ–পূর্ব আলাস্কার টঙ্গাস ন্যাশনাল ফরেস্টের ভেতরে ট্রেসি আর্ম ফিয়র্ড নামের একটি এলাকা আছে। জায়গাটি দেখতে খুব সুন্দর। চারপাশে উঁচু গ্রানাইট পাথরের পাহাড়, ঝরনা আর হিমবাহে ঘেরা একটি সরু সামুদ্রিক খাঁড়ি। কিন্তু ২০২৫ সালের ১০ আগস্টের সকালে এই সুন্দর এলাকাটিতেই ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটে। হঠাৎ একটি শক্তিশালী ভূমিধস হওয়ায় সেখানে এক বিশাল সুনামির সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, ২০২৫ সালের সেই সুনামিটি ছিল এযাবৎকালের রেকর্ড করা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উচ্চতার সুনামি। সেই সময় ঢেউয়ের উচ্চতা ১ হাজার ৫৭৮ ফুট (৪৮১ মিটার) পর্যন্ত উঠেছিল। এটি কতটা উঁচু ছিল, তা বোঝার জন্য একটি তুলনা দেওয়া যেতে পারে। নিউইয়র্ক শহরের বিখ্যাত এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের উচ্চতা ১ হাজার ২৫০ ফুট। বুঝতেই পারছ এই সুনামির ঢেউ এই ১০২ তলা বিল্ডিংয়ের চেয়ে কত উঁচু ছিল। সেই বিশাল ঢেউ যখন ফিয়র্ডের সরু খাঁড়ি দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে যাচ্ছিল, তখন পাহাড়ের খাড়া দেয়াল থেকে গাছপালাকে একনিমেষেই উপড়ে ফেলে দিয়েছিল।

ট্রেসি আর্ম ফিয়র্ড এলাকাটি পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। প্রতিদিন অসংখ্য জাহাজ ও নৌকা এখানে চলাচল করে। তবে ২০২৫ সালের সেই ভয়াবহ সুনামিটি ঘটেছিল ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে। এত ভোরে কোনো ক্রুজ জাহাজ বা পর্যটকবাহী নৌকা সেখানে না থাকায় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি ও কেউ আহত হয়নি।

আরও পড়ুন
সুনামি হলো সমুদ্রের বিশাল ঢেউ, যা সাধারণত পানির নিচে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা পাহাড়ধসের কারণে তৈরি হয়

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই ভয়াবহ ভূমিধসের পেছনে দায়ী হলো জলবায়ু পরিবর্তন। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়ের শিলাস্তরকে ধরে রাখা হিমবাহটি গলে পিছু সরে গিয়েছিল। এর ফলে পাহাড়ের সেই অংশটি অবলম্বনহীন হয়ে পড়ে এবং একসময় হুড়মুড় করে ধসে পড়ে।

ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যান শুগার এ ঘটনাকে অবিশ্বাস্য সৌভাগ্য বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও জানান, ‘ভূমিধসটি ভোরে হওয়ায় আমরা এবার বেঁচে গেছি। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন আবার এমন ঘটনা ঘটবে, তখন আমরা হয়তো এতটা ভাগ্যবান না–ও হতে পারি।’ গত ৬ এপ্রিল সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই সুনামি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

পৃথিবীর যে জায়গাগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে আগে ও স্পষ্টভাবে দেখা যায়, এই ফিয়র্ডগুলো তার মধ্যে অন্যতম। ২০২৫ সালের সেই সুনামির কোনো সরাসরি ছবি বা ভিডিও হাতে ছিল না। তাই বিজ্ঞানীরা পরে ড্রোন ও স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি, ভূমিকম্পের তথ্য ও সে সময় আশপাশে থাকা মানুষের বর্ণনার সাহায্য নেন। এসব তথ্য থেকেই তাঁরা পুরো ঘটনাটি নতুন করে বোঝার চেষ্টা করেছেন।

আরও পড়ুন

আলাস্কার রাজধানী জুনো থেকে প্রায় ৫০ মাইল দক্ষিণে এই ট্রেসি আর্ম ফিয়র্ড অবস্থিত। এটি প্রায় ২৫ মাইল লম্বা ও মাত্র ১ মাইল চওড়া। এর চারপাশের খাড়া পাহাড়গুলো ৩ হাজার ২৮০ ফুটের বেশি উঁচু। এত বিশাল ঢেউ ওঠার মূল কারণ ছিল পাহাড়ধসের ফলে পড়া বিশাল পাথরখণ্ড। সরু জায়গার মধ্যে হঠাৎ প্রচুর পানি যাওয়াই ঢেউটি বাথটাবের পানির মতো উপচে পড়ে আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল। বিজ্ঞানীরা পাহাড়ের দেয়ালে উপড়ে যাওয়া গাছপালার ক্ষতচিহ্ন মেপে এই উচ্চতা নিশ্চিত করেছেন।

গবেষক ড্যান শুগার এলাকাটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সুনামির ফলে পাহাড়ের গায়ে একটি স্পষ্ট রেখা তৈরি হয়েছে। এই রেখার নিচের অংশে কোনো গাছপালা নেই, আছে কেবল পাথর, পলি আর কিছু ভাঙা শিকড়। কিন্তু এই রেখার ঠিক ওপরের অংশটি একদম আগের মতোই ঘন অরণ্যে ঢাকা।

মাত্র ১ মিনিটের মধ্যে পাহাড় থেকে প্রায় ৮৩ মিলিয়ন ঘন গজ পাথর নিচে ধসে পড়েছিল। এই পরিমাণটা ঠিক কতটা বিশাল, তা বোঝাতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক স্টিফেন হিকস বলেন, এটি মিসরের গিজার পিরামিডের চেয়েও প্রায় ২৪ গুণ বড়। এত বিশাল ওজনের পাথর যখন একসঙ্গে আছড়ে পড়ে, তখন পৃথিবীতে এমন এক কম্পন সৃষ্টি হয়, যা সারা বিশ্বের সিসমোমিটার বা ভূমিকম্প মাপার যন্ত্রে ধরা পড়েছিল।

আরও পড়ুন
সুনামির ফলে পাহাড়ের গায়ে একটি স্পষ্ট রেখা তৈরি হয়েছে

পাহাড়ধসের পর কিছু ঢেউ ফিয়র্ডের সরু খাঁড়ির ভেতরে আটকা পড়ে যায়। ফলে পানি সেখানে শান্ত না হয়ে বারবার এপাশ–ওপাশ আছড়ে পড়তে থাকে। এই ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ও পানির দুলুনি বেশ কয়েক দিন ধরে চলেছিল। এর আগে ২০২৩ সালে গ্রিনল্যান্ডেও ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। যেখানে ভূমিধসের ফলে প্রায় ৬৫০ ফুট উঁচু ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়েছিল।

সুনামি হলো সমুদ্রের বিশাল ঢেউ, যা সাধারণত পানির নিচে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা পাহাড়ধসের কারণে তৈরি হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে উঁচু সুনামিটিও ঘটেছিল আলাস্কায়। ১৯৫৮ সালে লিটুয়া উপসাগরে বিশাল এক ভূমিধসের ফলে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট উঁচু ঢেউ সৃষ্টি হয়েছিল।

গভীর সমুদ্রে সৃষ্ট সুনামি অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে এবং উপকূলে ব্যাপক ক্ষতি করে। ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরের সুনামিতে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। অন্যদিকে ২০১১ সালে জাপানের সুনামিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৫ হাজারের বেশি মানুষ। ভূমিকম্পের সময় সমুদ্রের তলদেশের মাটি ফেটে গিয়ে পানিকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়, ফলে সুনামির সৃষ্টি হয়। আর ভূমিধসের ক্ষেত্রে ওপর থেকে বিশাল ওজনের পাথর বা মাটি সরাসরি পানিতে পড়ার কারণে বড় ঢেউ তৈরি হয়।

ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চূড়ান্ত ভূমিধসের প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই ওই এলাকায় ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছিল। এটি ছিল মূলত পাহাড়ের সেই বিশাল অংশটিতে ফাটল ধরার সংকেত। এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে ভবিষ্যতে হয়তো ভূমিধস বা সুনামির সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।

সূত্র: রয়টার্স

আরও পড়ুন