বিশ্বের অর্ধেক বড় শহর কি ‘ডে জিরো’ দেখতে যাচ্ছে
পৃথিবীর ডিজিটাল মানচিত্রে বড় বড় শহর বেশ আলোকিত। শহরের আলোর সঙ্গে আর্থিক কাজ, রাজনৈতিক ক্ষমতা, সংস্কৃতি আর মানুষের ঘনবসতির সম্পর্ক আছে। কিন্তু এসব ঝলমলে শহরের আলোর নিচে লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকট। নতুন এক বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বের ১০০টি বৃহৎ শহরের অর্ধেকই এখন মারাত্মক পানির চাপ বা অভাবের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে আবার ৩৯টি শহর এমন এলাকায় পড়েছে, যেখানে পানির চাহিদা সরবরাহের চেয়ে বেশি, যাকে বলা হচ্ছে ‘অতি উচ্চ পানিসংকট’ অঞ্চল।
পানির চাপ বা ওয়াটার স্ট্রেস মানে শুধু পানির অভাব নয়। এর মানে হলো, যে পরিমাণ পানি শহরগুলো ব্যবহারের জন্য টেনে নিচ্ছে, সেই পরিমাণ পানি সেখানে নেই। খাওয়ার পানি, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানি প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া পানির তুলনায় কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে আছে দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত পানির ব্যবহার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।
এই সংকটের তালিকায় আছে বিশ্বের বিখ্যাত শহরগুলো। বেইজিং, দিল্লি, নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, রিও ডি জেনিরোর মতো শহরগুলো ‘চরম পানিসংকটের’ তালিকায় আছে। আবার লন্ডন, ব্যাংকক আর জাকার্তার মতো শহরগুলো পড়ছে ‘উচ্চ পানিসংকট’ শ্রেণিতে। মানে উন্নত অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক শক্তি থাকলেও পানি নিয়ে অনিশ্চয়তা এড়াতে পারছে না কেউই।
নাসার স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানীরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি সামনে এনেছেন। গত দুই দশকে কোন কোন শহর শুকিয়ে যাচ্ছে আর কোনগুলো তুলনামূলক বেশি পানি পাচ্ছে, তা ধরা পড়েছে এই বিশ্লেষণে। দেখা যাচ্ছে, চেন্নাই, তেহরান আর চীনের ঝেংঝৌ শহরে দীর্ঘ মেয়াদে শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা প্রবল। অন্যদিকে টোকিও, লাগোস আর কামপালার মতো শহরে পানির উপস্থিতি বাড়ছে। সব মিলিয়ে এ তথ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ ‘ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যাটলাস’। এটি একনজরে দেখলে বোঝা যায়, কোন শহর কোন পথে এগোচ্ছে।
সংখ্যাগুলো ভয় ধরানোর মতো। প্রায় ১১০ কোটি মানুষ বাস করে এমন বড় শহরাঞ্চলগুলো দীর্ঘ মেয়াদে শুকিয়ে যাওয়ার অঞ্চলে অবস্থিত। বিপরীতে, যেসব এলাকায় পানি বৃদ্ধির প্রবণতা বাড়ছে, সেখানে শহরবাসীর সংখ্যা মাত্র ৯ কোটি ৬০ লাখের মতো। অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে শহুরে জনসংখ্যার বড় অংশই ধীরে ধীরে পানিশূন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ তেহরান। টানা ছয় বছর ধরে খরার মধ্যে থাকা এই শহর এখন ‘ডে জিরো’র খুব কাছাকাছি। এই শহরে যেকোনো দিন কল খুললে আর পানি আসবে না। পরিস্থিতি এত গুরুতর যে গত বছর ইরানের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বলেছেন, খরা চলতে থাকলে তেহরান খালি করে দিতে হতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন আর ভারতের চেন্নাইও অতীতে এমন বিপদের মুখে পড়েছিল। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অনেক শহরই এমন অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ভবিষ্যতে পানির ঘাটতি আরও তীব্র হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্যাটেলাইট থেকে মোট পানি সঞ্চয়ের পরিবর্তন খেয়াল করা এখন সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। যুক্তরাজ্যর ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দুহা বলছেন, ‘নাসার গ্রেস মিশনের মতো প্রকল্প আমাদের আগেভাগেই জানিয়ে দিচ্ছে যে কোথায় পানি কমছে, কোথায় বাড়ছে। কিন্তু এসব তথ্য শহরের ভেতরের ছোট ছোট বাস্তবতা পুরোপুরি দেখাতে পারে না।’
বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, গত ২০ বছরে পৃথিবী প্রতিবছর গড়ে ৩২৪ বিলিয়ন ঘনমিটার মিঠাপানি হারাচ্ছে। যা দিয়ে বছরে প্রায় ২৮ কোটি মানুষের পানির চাহিদা মেটানো যেত। এই ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে প্রায় সব মহাদেশের বড় নদী অববাহিকায়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি খুব শিগগির ডে জিরোর মুখোমুখি হচ্ছি? নাকি পানি সমস্যা সমাধানে আমাদের হাতে আরও কিছু সময় বাকি আছে?
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান