মানুষের মস্তিষ্ক কেন কঠিন পথ বেছে নেয়

স্টার ওয়ার্সের আর২-ডি২ রোবটের কথা মনে আছে? পিপ-পিপ শব্দ করে কেমন অদ্ভুত ভাষায় কথা বলত! কম্পিউটারের ভাষাও অনেকটা তেমনই। শূন্য ও এক দিয়ে তৈরি বাইনারি কোড।

পৃথিবীতে এখন প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। চাইনিজ, ইংরেজি, স্প্যানিশ থেকে শুরু করে আমাদের বাংলাসহ সব ভাষারই কাজ এক। শব্দ জুড়ে বাক্য তৈরি করা আর মনের ভাব প্রকাশ করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কম্পিউটারের ভাষা তো অনেক বেশি দক্ষ। অল্প জায়গায় অনেক তথ্য দেওয়া যায়। তাহলে মানুষের মস্তিষ্ক কেন এত জটিল ব্যাকরণ ও লম্বা লম্বা বাক্য ব্যবহার করে? কেন আমরা রোবটের মতো ডিজিটাল কোডে কথা বলি না?

জার্মানির সারলান্ড ইউনিভার্সিটির মাইকেল হান এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির রিচার্ড ফুটরেল এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন। তথ্যের আকার ছোট করতে কম্পিউটার ওস্তাদ। কিন্তু মানুষের ভাষা বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিশে থাকে। ধরো, তুমি এমন এক প্রাণীর কথা বলতে চাইছ যেটার অর্ধেক বিড়াল ও অর্ধেক কুকুর। তুমি এই প্রাণীর নাম দিলে ‘গোল’। তুমি যদি কাউকে গিয়ে বলো, আমি একটা ‘গোল’ দেখেছি, কেউ কিচ্ছু বুঝবে না। কারণ, বাস্তবে কেউ এমন প্রাণী দেখেনি। আবার বিড়াল ও কুকুর মিলিয়ে যদি ‘গ্যাডকোট’ নাম দাও, সেটাও অর্থহীন শোনাবে।

আরও পড়ুন
আর২-ডি২ রোবট
উইকিপিডিয়া

তার চেয়ে তুমি যদি বলো ‘বিড়াল ও কুকুর’, তাহলে মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে প্রাণী দুটির ছবি চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলবে। কারণ, শব্দগুলো আমাদের চেনা। আমাদের ভাষা শুধু তথ্য আদান-প্রদান নয়, এটি আমাদের দেখার জগৎকে তুলে ধরে। কম্পিউটারের কোডে এই বাস্তব অনুভূতি থাকে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের মস্তিষ্ক আসলে কঠিন পথটাই বেছে নেয়, কারণ এটাই তার কাছে সহজ! শুনতে হয়তো একটু গোলমেলে লাগছে। ব্যাপারটা আসলে অভ্যাসের। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার রাস্তার কথা ভাবো। রাস্তাটা তোমার এত চেনা যে হাঁটার সময় খুব বেশি ভাবতে হয় না। মস্তিষ্ক যেন অটোপাইলট মোডে চলে যায়। মানে রাস্তার দিকে না তাকিয়েও বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে দিব্যি হেঁটে যেতে পারবে। কিন্তু একদিন যদি অন্য কোনো নতুন পথে যাও? রাস্তাটা হয়তো ছোট, কিন্তু প্রতিটা মোড়ে তোমাকে সতর্ক থাকতে হবে। এতে মস্তিষ্ক দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

ভাষার ক্ষেত্রেও তা–ই। আমাদের প্রচলিত ভাষা হয়তো একটু লম্বা বা জটিল, কিন্তু এটি আমাদের পরিচিত, ওই চেনা রাস্তার মতো। মস্তিষ্ক জানে এরপর কী হতে পারে। বাইনারি কোড ছোট হতে পারে, কিন্তু সেটি মস্তিষ্কের জন্য অচেনা। তাই প্রসেস করা অনেক বেশি পরিশ্রমের।

আরও পড়ুন

আমরা যখন কথা বলি বা শুনি, আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিমুহূর্তে ভবিষ্যদ্বাণী করতে থাকে। পরের শব্দটা কী হতে পারে, তা আগেভাগেই আন্দাজ করে নেয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরো, পাঁচটি সবুজ…। এটুকু শুনেই তোমার মস্তিষ্ক কাজ শুরু করে দেবে। পাঁচটি বলার সঙ্গে সঙ্গে তোমার মস্তিষ্ক কী চিন্তা করেছে? নিশ্চয়ই এমন কিছু যা গোনা যায়। পাঁচ বলার পরে নিশ্চয়ই ভালোবাসা বা কষ্টের কথা মনে হয়নি।

এবার বললাম সবুজ…। কী বুঝলে? এমন কিছু একটা যার সঙ্গে রঙের সম্পর্ক আছে। শেষে হয়তো শুনলে গাড়ি। তখন মস্তিষ্ক মিলিয়ে নেয়, হ্যাঁ, ঠিকই ভেবেছিলাম! সবুজ গাড়ি।

কিন্তু যদি কেউ বলে ‘সবুজ পাঁচটি টি গাড়ি’, তাহলে মস্তিষ্কের এই ভবিষ্যদ্বাণীর চেইনটা ভেঙে যায়। সে আর অর্থ খুঁজে পায় না। আমাদের প্রচলিত ভাষা এমনভাবে সাজানো যে মস্তিষ্ক খুব কম খাটুনিতেই পরের শব্দটা আন্দাজ করতে পারে। ডিজিটাল কোডে এই সুবিধা নেই।

মাইকেল হান ও রিচার্ড ফুটরেল গণিতের মাধ্যমে এই তত্ত্ব প্রমাণ করেছেন। তাঁদের এই গবেষণা বিখ্যাত জার্নাল নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ারে প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আবিষ্কার চ্যাটজিপিটি বা মাইক্রোসফটের কো-পাইলটের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করবে। মানুষ কীভাবে ভাবে ও কথা বলে, তা মেশিনকে শেখানো আরও সহজ হবে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন