নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু, তবু ক্লাসরুমে ফিরতে ভয় পাচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের মাসাফের ইয়াত্তার শিশুদের মন থেকে স্কুল হারানোর ভয় কাটছে না। তারা চিন্তিত, তাদের পড়ার স্কুলটি আদৌ টিকে থাকবে তো?

ভাঙাচোরা সেই ভবনেই তারা আবার পড়াশোনা শুরু করতে যাচ্ছে

অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলের গ্রাম মাসাফের ইয়াত্তায় থাকে ১৭ বছরের ফারাহ, ৮ বছরের মোহাম্মদ এবং ৭ বছরের জাওয়াদ। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ায় তারা ক্লাসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তারা সবাই শাব আল-বুতুম নামের একটি স্কুলে পড়াশোনা করে। তবে এবার স্কুলে ফিরে তারা আগের মতো পুরো ভবনটি দেখতে পাবে না। গত ৪ আগস্ট ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালিয়ে স্কুলটির দুটি প্রশাসনিক কক্ষ ও একটি গুদামঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ভাঙাচোরা সেই ভবনেই তারা আবার পড়াশোনা শুরু করতে যাচ্ছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, স্কুল ভবনের কক্ষগুলো ভাঙার ব্যাখ্যায় ইসরায়েল দাবি করেছে সেগুলো তাদের সরকারের অনুমতি না নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ‘সি’ অঞ্চলটি সম্পূর্ণ ইসরায়েলি সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকায় ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো ভবন নির্মাণের অনুমতি পাওয়া বলতে গেলে অসম্ভব।

স্কুলটির অবশিষ্ট অংশটুকুও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। পুরো ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য ইসরায়েল আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ–সংক্রান্ত মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

গ্রামটির একমাত্র স্কুলটি পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে এখানকার শিক্ষার্থীরা। ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষের ভয় ও পড়ার একমাত্র জায়গাটি হারানোর আতঙ্কে শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

অবিরাম ভয় ও টিকে থাকার শিক্ষা

নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু মানে নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় ফেরা। তবে শাব আল-বুতুমের শিশুদের উৎসাহের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে গভীর উদ্বেগ।

১৭ বছর বয়সী ফারাহ বলে, এটিই তার জীবনের একমাত্র স্কুল ছিল। পড়াশোনার এই শেষ সময়ে এসে কী ঘটে, সেই চিন্তায় চরম শঙ্কিত। ৮ বছর বয়সী মোহাম্মদও একই ভয় প্রকাশ করে বলে, যেটুকু এখনো দাঁড়িয়ে আছে, ইসরায়েলি বাহিনী হয়তো এসে তা–ও গুঁড়িয়ে দেবে। অন্যদিকে ৭ বছরের ছোট জাওয়াদ প্রিয় স্কুলের এমন ধ্বংসস্তূপ দেখে নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে আশা করে, স্কুলটি হয়তো আবারও আগের মতো সুন্দর হয়ে যাবে।

মাসাফের ইয়াত্তার স্থানীয় পরিষদের প্রধান নিদাল ইউনিসের মতে, এই উদ্বেগ কোনো একক ঘটনা নয়; বরং পুরো অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নেমে আসা এক ধারাবাহিক হুমকির অংশ। ১৯৮০-এর দশকে মাসাফের ইয়াত্তাকে ইসরায়েল নিজেদের সামরিক মহড়াস্থল বা ‘ফায়ারিং জোন’ হিসেবে ঘোষণা করে। সেই বাহানাতেই দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

নিদাল ইউনিস বলেন, দখলদার বাহিনীর এমন নজিরবিহীন আগ্রাসনের মুখে প্রতি শিক্ষাবর্ষেই এখানকার শিশুদের জন্য পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। এ বছর দখলদার বাহিনীর স্কুল গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। পাশাপাশি এই গ্রামগুলোর সবকিছু ধুলায় মিশিয়ে দিতে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাও ব্যাপক হারে বেড়েছে।

এই সহিংসতা ও আতঙ্ক শিশুদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। স্কুলে যাওয়া–আসার পথে, ক্লাসরুমে পড়ালেখার সময়, এমনকি নিজের বাড়ির ভেতরেও ফিলিস্তিনি শিশুরা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

নিদাল ইউনিসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, পুরো মাসাফের ইয়াত্তা এলাকার সাতটি স্কুলের প্রতিটিই এখন ইসরায়েলি বাহিনীর ভেঙে ফেলার চরম হুমকির মুখে। চলতি শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই বিদ্যালয়গুলো টিকে থাকবে কি না, তা কারোরই জানা নেই। আর আগামী বছর নতুন শিক্ষাবর্ষের আশা করা তো আরও দূরের কথা। তবে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও এত যন্ত্রণার মধ্যেও নিজেদের ভিটামাটিতে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার ব্যাপারে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের সংকল্প এখনো অটুট।

আরও পড়ুন

বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা

অবৈধ বসতি দ্রুত বাড়ছে এবং স্কুল ভাঙার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে গেছে। ইসরায়েলি বুলডোজার কখন আসবে, তা আগে থেকে শিক্ষক বা অভিভাবকদের জানানো হয় না। কথাটি বলেছেন কর্মী ও শিক্ষক তারিক হাথালিন।

গত শিক্ষাবর্ষে জর্ডান উপত্যকার ‘রাস আইন আল-আউজা’ স্কুলে ঢোকে ইসরাইল বাহিনী। তারা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ চালায়। এসব হামলা প্রমাণ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন নিরাপদ নয়।

ইসরায়েলের এই কাজগুলো শুধু শিক্ষা নয়, আবাসন, যাতায়াত ও জীবিকাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবে প্রান্তিক এলাকার এই স্কুলগুলো শিক্ষার স্থানের চেয়ে বড় কিছু। এগুলো ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকা ও টিকে থাকার প্রতীক।

সুশৃঙ্খল ধারা

উপনিবেশ ও প্রাচীর প্রতিরোধ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশোনা নির্ভর করে এমন ৮৪টি ফিলিস্তিনি স্কুল বর্তমানে ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ বা কাজ বন্ধের আদেশের মুখে পড়েছে।

কমিশনের কর্মকর্তা আমির দাউদ জানান, দক্ষিণ হেবরনের মাসাফের ইয়াত্তা ও বেথলেহেমের আল-ওয়ালাজা এলাকার স্কুলগুলো বেশি হুমকির মুখে পড়েছে। অনুমতিপত্র না থাকার অজুহাতে ইসরায়েল এগুলো ভেঙে দিতে চায়। কিন্তু এই স্কুলগুলো বন্ধ হলে শিক্ষার্থীদের অন্য কোথাও পড়ার সুযোগ নেই।

প্রকৃতপক্ষে, বুলডোজার আসার অনেক আগেই ধ্বংসের হুমকি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং নিষেধাজ্ঞা ও হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।

সূত্র: আল জাজিরা
আরও পড়ুন