মাছ যত বড়, স্বাদ তত কম—বাগাড়ের এমন উল্টো নিয়ম কেন

বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলায় ৯০ কেজি ওজনের একটি বাগাড়ের দাম হাঁকা হয়েছে সোয়া লাখ টাকা।ছবি: ফোকাস বাংলা

বাগাড় নাম শুনলে চোখে ভাসে বিশাল একটা মাছ, নদীর তলা থেকে টেনে তোলা কালচে দাগওয়ালা এক দানব। জেলেপাড়ায় এই মাছ নিয়ে গল্পের শেষ নেই—কেউ বলে পদ্মায় ছয় ফুট লম্বা একটা উঠেছিল, কেউ যমুনার কথা টানে। প্রতিবার গল্প বলার সময় মাছটা যেন আরেকটু বড় হয়ে যায়।

মজাটা অন্য জায়গায়। বাগাড় যত বড় হয়, খেতে তত কম ভালো লাগে। বড় মাছ মানে বেশি স্বাদ—এ ধারণা এখানে খাটে না। উল্টো নিয়মটাই বাগাড়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বিশাল আকারের বাগাড়ের মাংস শক্ত হয়ে যায়। খেতে তন্তুময়, চিবিয়ে খেতে হয়। প্রায় গরুর মাংসের মতো। মুখে দিলে সেই গলে যাওয়া নরম ভাবটা থাকে না। খাদকমহলে তাই কদর পায় ছোট বা মাঝারি বাগাড়। হাত দুয়েক লম্বা, বড়জোর পাঁচ কেজি ওজনের মাছ হবে। এই আকারের বাগাড়ের মাংস নরম। ঝোলে রান্না করলে তেলতেলে একটা স্বাদ তৈরি হয়। পুরোনো দিনের বাবুর্চিরা বাজারে গিয়ে সবচেয়ে বড় বাগাড়টা তাই এড়িয়ে যান। খোঁজেন মাঝারি আকারেরটা। বিশাল আকার দেখে মুগ্ধ হওয়া, আর সেটা রান্নাঘরে বা পাতে তোলা এক জিনিস নয়।

কারণটা লুকিয়ে আছে মাছের দেহে। বয়স বাড়লে পেশিতন্তু মোটা হতে থাকে, সংযোজক কলা বা কোলাজেন জমতে থাকে, চর্বির বণ্টনও পাল্টায়। ফলে মাংস আঁশটে, রুক্ষ হয়ে ওঠে। বাগাড়ের একার সমস্যা নয় এটা। বুড়া রুই বা বড় ইলিশেও কমবেশি একই ঘটনা ঘটে। তবে বাগাড়ে পার্থক্যটা এত স্পষ্ট যে দুটি সাইজ যেন দুই আলাদা মাছ।

আরও পড়ুন

নাম নিয়েও একটা গোলমাল আছে। গায়ে বাঘের ডোরার মতো অনিয়মিত দাগ, মাথা চ্যাপটা, চোয়াল চওড়া-দেখতে বেশ হিংস্র। এখান থেকেই নামের প্রথম অংশ এসেছে। প্রথমে এটা ছিল বাঘা। তারপর সেখান থেকে বাগা। আইড় শব্দটা শুনে অনেকে ধরে নেন এটা বুঝি আইড় মাছেরই কোনো প্রজাতি। আসলে তা নয়। শিলন্ড আইড় বা গুজি আইড়ের মতো প্রকৃত আইড় মাছ আসে অন্য পরিবার থেকে। সিসোরিডি পরিবারের সদস্য এই মাছ। জিনগত দূরত্বটা এদের কম নয়। অনেকটা বিড়াল আর কুকুরকে এক পরিবারের প্রাণী ভেবে নেওয়ার মতো ভুল। বাংলা লোকভাষায় এমন হয়ই। চেহারায় মিল পেলেই একই ছাঁচে নাম বসিয়ে দেওয়া হয়। যেমন তিমিকে মাছ ভেবে নেওয়া, যদিও সে আসলে স্তন্যপায়ী।

এই মাছ দক্ষিণ এশিয়ার বড় নদীতে থাকে—গঙ্গা, পদ্মা, যমুনার গভীর ঘোলা জলে। তলদেশে শুয়ে থাকে পাথর বা বালুর ফাঁকে গা এলিয়ে দিয়ে। ছোট মাছ আর জলজ প্রাণী শিকার করে বাঁচে। দৈর্ঘ্যে ১ দশমিক ৮ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ওজন ২০ কেজি হতে পারে। এমন আকারের বাগাড় বাংলাদেশের নদীতে এখন প্রায় দেখাই যায় না অবশ্য। অতিরিক্ত মাছ ধরা, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ—সব মিলিয়ে এদের সংখ্যা কমে গেছে। নদীতীরের হাটে টুকরা টুকরা বাগাড় বিক্রি হতে দেখা যায় প্রায়ই।

আরও পড়ুন

জেলেপাড়ার পুরোনো লোকেরা বাগাড় ধরার গল্প বলতে গিয়ে থামেন না সহজে। রাতভর বড়শি ফেলে বসে থাকতে হতো; কারণ, এই মাছ চট করে টোপ গেলে না। বড় বাগাড় ধরা পড়লে খুশির চেয়ে একরকম দ্বিধাই কাজ করত বেশি। এত বড়টা কি আসলে খেতে ভালো হবে? রাঁধুনিরা তাই আগেভাগে সাবধান করে দিতেন, মাঝারিটাই কিনো।

গ্রামে বাগাড়ের ঝোল রান্না করা হয় শর্ষেবাটা, কাঁচা মরিচ, সামান্য পাঁচফোড়ন দিয়ে। মাঝারি আকারের টুকরা এই ঝোলে সেদ্ধ হতে হতে এমন নরম হয়ে ওঠে। কাঁটাগুলো প্রায় নিজে থেকেই আলগা হয়ে আসে। একই রেসিপিতে বড় মাছের টুকরা রাঁধলে ফল হয় উল্টো। ঝোল যতই ফুটুক, মাংস শক্তই থেকে যায়। রান্নাঘরের এই ছোট্ট অভিজ্ঞতাটাই বলে দেয়, আকার আর স্বাদের সেই উল্টো সম্পর্কের কথা।

নদীর নাব্যতা যেভাবে কমছে, যেভাবে চর জেগে উঠছে একের পর এক, গভীর জলের এই মাছের বসতিও ছোট হয়ে আসছে সেভাবেই। বাঘের মতো দাগ নিয়ে জন্মানো এই মাছ হয়তো একদিন নামেই বাঘ থেকে যাবে, নদীর কোনো বাঁকে আর দেখা মিলবে।

সূত্র: ফিশফার্মিং বিডি

আরও পড়ুন