পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধটা বুঝি আমিই করেছি
সকাল সাড়ে সাতটার টিফিনের ঘণ্টা পড়ল। মুহূর্তেই যেন ভারতেশ্বরী হোমসের সকালের নীরবতা ভেঙে যেত। সারিবদ্ধ পায়ের শব্দ, বন্ধুদের চাপা হাসি আর টিফিনের লাইনে দাঁড়ানোর সেই চেনা দৃশ্য—সব মিলিয়ে দিনের শুরুটাই ছিল এক অন্য রকম অনুভূতি।
সেদিনও আমরা সবাই নিয়মমতো টিফিন নিতে গেলাম। প্লেটে ছিল সেই বিশেষ ধরনের পাউরুটি, যাকে আমরা সবাই মজা করে ডাকতাম ‘ধম্বা’। নামটা শুনলেই সবার মুখে হাসি ফুটে উঠত; কিন্তু আমার কাছে ধম্বা ছিল একেবারে দুঃস্বপ্ন! যতই চেষ্টা করি, কিছুতেই সেটা খেতে পারতাম না। অথচ খাবার ফেলে দেওয়া ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই আমার দুষ্টু বন্ধুদের মাথায় প্রতিদিনই জন্ম নিত নতুন নতুন কৌশল—কীভাবে ধম্বাটাকে পৃথিবী থেকেই গায়েব করে দেওয়া যায়!
সেদিনও শুরু হলো সেই গোপন অভিযান। আমি ধম্বাটা ছোট ছোট টুকরা করে একেকটা একেক দিকে ছুড়ে দিচ্ছিলাম। বেশ কয়েকটি টুকরা সফলভাবেই অদৃশ্য হয়ে গেল। শেষে রইল শেষ টুকরাটি। মনে হলো, এবার চোখ বন্ধ করেই ছুড়ে দিই—যেখানে পড়ার পড়ুক!
চোখ বন্ধ করে টুকরাটা পেছনের দিকে ছুড়ে দিলাম। পরের মুহূর্তেই চারপাশে নেমে এল এক অদ্ভুত নীরবতা।
চোখ খুলে দেখি, সেই শেষ টুকরাটা গিয়ে পড়েছে আমাদের সবচেয়ে রাগী স্টাফ মিসেস ঘোষের পায়ের ওপর!
তারপর আর কিছু বোঝার বাকি ছিল না। মুহূর্তেই তাঁর রাগ যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। আমার পিঠে পড়ল তাঁর হাতের শাসন। তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল, মনে হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধটা বুঝি আমিই করেছি। অথচ আজ এত বছর পর সেই ঘটনাটা মনে পড়লে হাসিই পায়। একটা ছোট্ট ধম্বার টুকরা যে একদিন এত বড় স্মৃতি হয়ে থাকবে, তখন কে জানত!
এমন কত শত গল্প ছড়িয়ে আছে ভারতেশ্বরী হোমসের প্রতিটি ইট, প্রতিটি করিডর, প্রতিটি ডাইনিং টেবিলে। শুধু সকাল সাড়ে সাতটার টিফিন নয়, দুপুরের লাঞ্চ, রাতের ডিনার—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে অগণিত স্মৃতি। আমরা সবাই সারিবদ্ধ হয়ে ডাইনিং হলে ঢুকতাম, একসঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতাম, তারপর পাশাপাশি বসে খেতাম। খাওয়া শেষ হলে আবার নিজেরাই ডাইনিং হল পরিষ্কার করতাম। নিয়মের ভেতরেই ছিল আমাদের আনন্দ, শাসনের আড়ালেই ছিল অগাধ মমতা; আর একসঙ্গে কাটানো প্রতিটি দিন ছিল একেকটি অমূল্য স্মৃতি।
আজ আমরা সবাই জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পথে হাঁটছি। সেই ডাইনিং হলে আর আমাদের সারি লাগে না, প্রার্থনার সেই কণ্ঠও আর শোনা যায় না। হয়তো মিসেস ঘোষ এখনো কাউকে শাসন করেন, হয়তো নতুন কোনো ব্যাচ আজও ধম্বা লুকিয়ে ফেলার নতুন কৌশল খুঁজে বেড়ায়।
আর আমি? আমি শুধু স্মৃতির দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি—যদি একবারের জন্যও আবার সাড়ে সাতটার টিফিনের ঘণ্টা বেজে ওঠে! এবার আর ধম্বা লুকিয়ে ফেলব না। কারণ, আজ বুঝি ধম্বা নয়, ফেলে এসেছি আমার কৈশোরের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো। সময় হয়তো ফিরে আসে না; কিন্তু কিছু ঘণ্টার শব্দ সারা জীবন বুকের ভেতর বাজতেই থাকে।
লেখক: শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি, হলিক্রস কলেজ, ঢাকা