চাপিলা কি ইলিশের বিকল্প হতে পারে

কক্সবাজার শহরের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ইলিশের মত দেখতে চাপিলা মাছছবি: প্রথম আলো

ইলিশের নিরাপদ প্রজননের লক্ষ্যে ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সময় দেশব্যাপী ইলিশ পরিবহন ও মজুতকরণ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এমন সময় ইলিশের বিকল্প হতে পারে চাপিলা মাছ। কাছাকাছি স্বাদের এই মাছ। ইলিশের তুলনায় এর দাম বেশ কম। ছোট আকারের রুপালি চাপিলা মাছ কি ইলিশের বিকল্প হতে পারে?

ইলিশ আর চাপিলা দূরের আত্মীয় নয়। দুটোই ক্লুপেইডি পরিবারের মাছ। শরীর চ্যাপটা, গায়ে রুপালি আঁশ। তফাতটা আকারে। ইলিশ বড় হয়ে কেজি ছাড়ায়। চাপিলা বেশির ভাগ সময় হাতের তালুর সমান থাকে। ইলিশ সাগর থেকে নদীতে ডিম পাড়তে আসে। চাপিলা থাকে মিঠা পানিতেই। নদী, বিল, হাওর, কখনো বড় পুকুরেও একে পাওয়া সম্ভব। অঞ্চল বদলালে এর নামও বদলায়। কিন্তু চেহারা দেখে মানুষ ঠিকই চিনে ফেলে।

স্বাদ আর কাঁটার হিসাব

ইলিশের স্বাদ নিয়ে বাঙালি তর্ক করে না। আগেই মেনে নেয়। এর তেলে আলাদা একটা ঘ্রাণ আছে। শর্ষে-ইলিশ বা ভাপা ইলিশে তুমি তা টের পাবে। চাপিলা সেই উচ্চতায় পৌঁছায় না।

তবে মাছটা মন্দ নয়। মাংস নরম, একটু মিষ্টি গোছের। হালকা ভাজলে বেশ লাগে। শর্ষে বেটে ঝাল করলে ইলিশের কাছাকাছি একটা ঘ্রাণ আসে। কেউ কেউ কাঁচা মরিচ আর কালোজিরা দিয়ে পাতলা ঝোল রাঁধে। গরম ভাতে সেটা ভালোই জমে। চোখ বন্ধ করে খেলে তুমি হয়তো ধরে ফেলবে, এটা ইলিশ নয়। তবু মুখ বিরক্ত হবে না।

অনেক বাড়িতে চাপিলা রান্না হয় আলু বা কুমড়া দিয়ে। মাছ একটু ভেঙে গেলে ঝোল আরও ঘন হয়। সেই ঝোলে ভাত মাখলে আলাদা কোনো তরকারির দরকার পড়ে না। শহরের রান্নাঘরে এই রান্না এখন কম দেখা যায়। অনেকে মাছটা চেনেই না।

কাঁটা নিয়ে ইলিশের বদনাম আছে। চাপিলার কাঁটাও কম নয়। মাছ ছোট, তাই কাঁটাগুলো খুব সরু। মচমচে করে ভাজলে বেশির ভাগ কাঁটা নরম হয়ে যায়। বড়রা সহজে খেয়ে ফেলে। শিশুদের পাতে দিলে চোখ সজাগ রাখতে হয়। ইলিশের বেলায় যে ধৈর্য লাগে, এখানেও তা-ই লাগে।

আরও পড়ুন

দাম, পুষ্টি আর নদীর চাপ

দামের জায়গায় চাপিলা এগিয়ে। ইলিশ এখন অনেক ঘরে উৎসবের মাছ। অতিথি এলে কেনা হয়। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তা প্রায় নাগালের বাইরে। চাপিলা মৌসুমে বাজারে প্রচুর আসে। দামও হাতের মধ্যে থাকে। এক কেজি কিনলে মাঝারি পরিবারের অন্তত দুই বেলার তরকারি হয়ে যায়।

পুষ্টির কথাও আছে। ইলিশে ওমেগা-থ্রি আছে বলে পুষ্টিবিদেরা হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য ভালো বলেন। চাপিলাও তেলওয়ালা মাছ, তবে তেলের পরিমাণ ইলিশের মতো নয়। ছোট মাছে সাধারণত প্রোটিন আর ক্যালসিয়াম বেশি থাকে। চাপিলা খেলে তাই সস্তায় আমিষ মেলে।

ইলিশের সংকট আমাদের অনেক দিনের। অতিরিক্ত ধরা হয়েছে, নদী ভরাট হয়েছে, দূষণও বেড়েছে। জাটকা রক্ষায় সরকার নিষেধাজ্ঞা দেয়। ডিম পাড়ার সময়ও জাল বন্ধ থাকে। জেলেদের অনেকে এই সময় কষ্টে কাটান। এই অবস্থায় চাপিলার দিকে নজর যাওয়াই স্বাভাবিক।

কিন্তু চাপিলাও নিরাপদে নেই। নদীতে বাঁধ আর ব্যারাজ হয়েছে। মাছের চলাচলের পথ আটকে গেছে। দেশি ছোট মাছ অনেক জায়গায় কমে এসেছে, চাপিলাও সেই তালিকায় আছে। হঠাৎ সবাই চাপিলার দিকে ঝুঁকলে চাপ গিয়ে পড়বে তার ওপরই। সংকট এক মাছ থেকে আরেক মাছে সরে যাবে, মিটবে না।

একটা আশার দিকও আছে। গবেষকেরা চাপিলা নিয়ে কাজ করছেন। পুকুরে চাষের চেষ্টাও চলছে। ইলিশ পুকুরে চাষ করা যায় না; কারণ, তার সাগর আর নদী দুটোই লাগে। চাপিলা মিঠা পানিতে বাঁচে।

আরও পড়ুন
ইলিশ মাছ
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

আলাদা মাছ, তবে বিকল্প নয়

ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। জিআই পণ্য হিসেবেও এর স্বীকৃতি আছে। পহেলা বৈশাখে পান্তার পাশে ইলিশ না থাকলে অনেকের মনে হয়, কিছু একটা কম পড়েছে। বর্ষায় বাড়িতে ইলিশ ভাজার গন্ধ উঠলে পাশের বাসার লোকও টের পায়। এই স্মৃতির দাম টাকায় মাপা যায় না। চাপিলা সেখানে পৌঁছাতে পারবে না।

তাহলে প্রশ্নের উত্তর কী? পেট ভরানোর হিসাবে চাপিলা চলে। দামের হিসাবে তো অবশ্যই। পুষ্টিতেও সে খারাপ নয়। কিন্তু স্বাদ আর স্মৃতির হিসেবে ইলিশের জায়গাও নিতে পারবে না।

তবে চাপিলাকে ইলিশের ছায়ায় রেখে বিচার করলে ওর প্রতি অন্যায় হয়। ওর নিজের স্বাদ আছে, রান্নার ভালো রেসিপিও আছে। চাপিলা আর ইলিশ তাই আলাদা জায়গায় থাকবে।

সূত্র: ফিশ ফার্মিং বিডি
আরও পড়ুন