ডাকটিকিটে জাম্বিয়ার লোকগল্প

দক্ষিণ-মধ্য আফ্রিকায় অবস্থিত স্থলবেষ্টিত একটি দেশ জাম্বিয়া। দক্ষিণে বয়ে চলা নদী জাম্বেজির নামানুসারে দেশটির এমন নাম রাখা হয়েছে। মানচিত্রে দেখলে দেশটিকে মনে হয় একটি প্রজাপতি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ দেশে রয়েছে ৭০–এর বেশি জাতিগোষ্ঠী। সেই জাতিগোষ্ঠীর আবার রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। জাতিভেদে জাম্বিয়ার মানুষের মুখে মুখে আজও রটে বেড়ায় অনেক গল্প। সেসব গল্পের মধ্য থেকে জাম্বিয়ার ডাক বিভাগ ১৯৯৮ সালে কাসালি ও নাগাঙ্গা নামের দুটি গল্প নিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এখানে গল্প দুটি তুলে ধরা হলো। গল্পগুলো অনুবাদ করেছেন নিজাম বিশ্বাস

কাসালি

জাম্বিয়ার এক ছোট্ট গ্রাম। চারদিকে বিস্তীর্ণ প্রান্তর। ঘাসে ঢাকা সবুজ মাঠ। দূরে নীলাভ পাহাড়। সেই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এক নদী। ছোট ছোট ঢেউ বয়ে চলে নদীর বুকে। কী শান্ত শীতল নদী! জলের রং নীলচে ঠিক ওই দূর পাহাড়ের মতো। সকালে সূর্যের আলোয় রুপার মতো ঝিলমিল করে সেই জল। কিন্তু এই শান্ত নদী গ্রামবাসীর কাছে এক আতঙ্কর নাম। কারণ, আর কিছুই নয়— কুমির। এক মস্ত বড় ভয়ংকর কুমিরের বাস এ নদীতে।

লোকজন তাকে শুধু কুমির বলে না, বলে নদীর দানব। তার চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো। মুখভরা দাঁত যেন ধারালো ছুরি। কেউ নদীর ধারে গেলে, হঠাৎ জলের ভেতর থেকে উঠে এসে তাকে টেনে নিয়ে যায়।

দিনের পর দিন এভাবে কাটছে। গ্রামের লোকজন একসময় নদীর ধারে যাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিল। কিন্তু পানি ছাড়া কি আর জীবন চলে! গ্রামের কুয়োগুলো শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়। পানির তেষ্টায় শিশুরা কাঁদতে থাকে। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির মরার দশা। কেউ একটু লুকিয়ে সাবধানে যে জল আনবে, তেমন কেউ নেই। কুমিরের ভয়ে সবাই থরথর করে কাঁপে।

এ গ্রামেই ছিল কাসালি নামের এক ছোট্ট ছেলে। তার চোখে-মুখে কৌতূহল। বুকে অসীম সাহস। অন্য সবাই যখন ভয়ে জবুথবু, তখন এই ছেলে ভাবল—এ আর এমন কী!

তাই একদিন সে তার মাকে বলল, ‘মা, আমরা কি সারা জীবন এই দানবের ভয়ে ঘরে বসে থাকব?’

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বাবা, কিছু ব্যাপারে সত্যি ভয় পাওয়ার মতো কিছু থাকে। কিছু ভয় দূর করা মানুষের পক্ষে কঠিন।’

মায়ের মুখে অমন কথা শুনে কাসালি চুপ হয়ে গেল। কিন্তু তার মনে হলো, ‘কঠিন মানে অসম্ভব তো আর নয়।’

পরদিন সকালবেলা। আকাশে হালকা মৃদু ডিমের কুসুমের সূর্য। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে। মোরগের গলায় কুকউক কু। কাউকে কিছু না বলে কাসালি নদীর দিকে রওনা দিল।

দূর থেকে সে দেখল, নদীর মাঝখানে বিশাল কুমিরটি ভেসে আছে। স্থির, নিঃশব্দ যেন মস্ত বড় একটি গাছের গুঁড়ি। তার ভয়ংকর নিশ্বাসে নদীর চারপাশ স্তব্ধ হয়ে আছে। সূর্যের আলোতে তার চোখ জ্বলছে। কাসালির বুক ধড়ফড় করতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যেই সে নিজেকে সামলে নিল। জোরে গলা ছেড়ে ডাকল, ‘হে নদীর রাজা!’

আরও পড়ুন

কুমিরটি নড়েচড়ে উঠল। গর্জন করে বলল, ‘কে রে আমারে ডাকিছ?’

‘আমি কাসালি। তোমার জন্য পানি এনেছি।’ কুমিরকে বলল ছেলেটি।

কুমির অবাক।

‘হুম, আমি তো পানির মধ্যেই থাকি। আবার নতুন করে পানির কী দরকার?’

কাসালি হেসে বলল, ‘এই পানি আলাদা। এটা মিষ্টি ও গরম পানি।’

কুমির কৌতূহলী হয়ে মুখ খুলল। কাসালি ধীরে ধীরে সেই পানি কুমিরের মুখে ঢালল।

এভাবে কয়েক দিন চলতে লাগল। কুমিরের সঙ্গে কাসালির বেশ ভাব জমে গেল।

একদিন কাসালি বলল, ‘তোমার দাঁতগুলো খুব ময়লা হয়ে গেছে। আমি পরিষ্কার করে দেব?’

কুমির একটু হাসল, ‘তুমি এত পুঁচকে ছেলে, পারবে?’

‘পারব’, বেশ দৃঢ় কণ্ঠে বলল কাসালি।

তারপর কুমির মুখ খুলল।

কাসালি মুখের ভেতরে ঢুকল। তার হাতে ছিল একটি শক্ত লাঠি। সে ধীরে ধীরে দাঁত পরিষ্কার করার ভান করল। হঠাৎ দ্রুত সেই লাটি মুখের মধ্যে আটকে দিল!

এখন কুমির কিছুতেই তার মুখ বন্ধ করতে পারছে না।

কাসালি মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে গ্রামের সবাইকে ডাকল, ‘তোমরা সবাই আসো, এদিকে আসো।’

গ্রামবাসী ছুটে এল নদীর ধারে। ভয় পেলেও কাসালিকে দেখে এবার তারা সাহস পেল। তারপর সবাই মিলে কুমিরটিকে শক্ত করে বেঁধে ফেলল।

বাঁধার পর তারা সিদ্ধান্ত নিল, কুমিরটিকে ঠিক মেরে ফেলবে না। একে দূরে নিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসবে। যা ভাবা তা–ই। দল বেঁধে সবাই কুমিরটিকে পাহাড়ের ওপারে নির্জন জলাশয়ে ছেড়ে দিয়ে এল।

এই আনন্দে সেদিন গ্রামে উৎসব হলো। শিশুদের মুখে হাসি ফিরে এল। গ্রামবাসীরা মনের আনন্দে নাচল, গাইল, মেতে উঠল নানারকম খুনসুটিতে।

আরও পড়ুন

মা কাসালিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তুই আমাদের বাঁচিয়েছিস।’

কাসালি মৃদু হেসে বলল, ‘আমি শুধু ভয়কে ভয় পাইনি, মা।’

নাগাঙ্গা

জাম্বিয়ার এক রহস্যঘেরা বনের গভীরে বাস করতেন লুচেলে নাগাঙ্গা নামের এক চিকিৎসক। একই সঙ্গে তাঁর ছিল জাদুবিদ্যার দারুণ ক্ষমতা।

তার ছোট্ট কুঁড়েঘর। সেই ঘরের সামনে ঝুলত শুকনা ভেষজ। বাতাসে ভেসে বেড়াত অদ্ভুত গন্ধ। কেউ অসুস্থ হলে সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে ছুটে আসত।

একদিন এক যুবক এল। তার মুখে ক্লান্তি, চোখে হতাশা। সে বলল, ‘গুরু, আমার জীবনে কোনো আনন্দ নেই। আমি সুখ চাই।’

নাগাঙ্গা গভীরভাবে তার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘সুখ পাওয়া যায় না। সুখ খুঁজে নিতে হয়।’

‘কোথায় খুঁজব?’ যুবকটি বলল।

নাগাঙ্গা তাঁর হাতে একটি লাঠি দিয়ে বললেন, ‘এটি তোমাকে মনে করিয়ে দেবে—তুমি একা নও।’

যুবক যাত্রা শুরু করল। বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে শুনল কেউ একজন কাঁদছে। কাছে গিয়ে দেখল, একজন বৃদ্ধ লোক মাটিতে পড়ে আছেন।

যুবকটি ভাবল, এখানে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই। তাই সে আবার হাঁটতে শুরু করল। একটু পর তার মনে হলো মানুষকে সাহায্য করাই তো আসল কাজ। আবার বৃদ্ধের কাছে সে ফিরে এল। তাকে সে সাহায্য করল। বৃদ্ধ হাসল। তারপর মুহূর্তের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল।

যুবক অবাক হয়ে গেল। সামনে এগিয়ে চলল। এরপর সে দেখল, একটি শিশু নদীতে পড়ে যাচ্ছে। সে ছুটে গিয়ে তাকে বাঁচাল। শিশুটিও হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

তৃতীয়বার সে পৌঁছাল এক গ্রামে, সেখানে সবাই ঝগড়া করছে। সে শান্তভাবে সবার উদ্দেশে বলল, ‘আমরা যদি একে অন্যকে না বুঝি, তবে সুখ কোথায় পাব?’

তার কথা শুনে সবাই থেমে গেল। ধীরে ধীরে শান্তি ফিরে এল গ্রামে। তারপর হঠাৎই সবকিছু অদৃশ্য হয়ে গেল।

যুবকটি আবার চিকিৎসক নাগাঙ্গার সামনে এসে দাঁড়াল। নাগাঙ্গা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী শিখলে?’

যুবক বলল, ‘সুখ কোনো বস্তু নয়। এটা মানুষের কাজের মধ্যে থাকে।’

নাগাঙ্গা হাসলেন, ‘তুমি সত্য জেনে গেছ।’

তারপর সেই যুবক তার গ্রামে ফিরে গেল। বিপদে সে সবার পাশে দাঁড়াতে লাগল। এভাবে ধীরে ধীরে পুরো গ্রাম বদলে গেল। এখন মানুষ একে অন্যকে সাহায্য করে। তারা হাসে, গান গায়, নেচে বেড়ায় মনের আনন্দে।

আর দূরে বসে নাগাঙ্গা মৃদু হেসে বলে, ‘মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় জাদু।’

আরও পড়ুন