ফোন কেটে টেক্সট দেওয়া কি অভদ্রতা

টেক্সট করার পক্ষে কিন্তু জোরালো যুক্তি আছে

হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভাসছে পরিচিত কারও নাম। রিংটোন বাজার সঙ্গে সঙ্গেই তোমার বুকের ভেতরটা কি একটু কেঁপে উঠল? কলটা রিসিভ না করে লাল বাটন চেপে কেটে দিলে। তারপর টাইপ করলে, ‘ব্যস্ত আছি। পরে ফোন করছি।’

এই দৃশ্যপট আজকাল আমাদের অনেকের জীবনেরই নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু মনের কোণে কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে, কারও ফোন কেটে দিয়ে উল্টো টেক্সট করাটা কি আসলেই অভদ্রতা? নাকি যুগ বদলেছে বলে ফোন রিসিভ করাটা এখন ঐচ্ছিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে? চলো, বিষয়টা খোলাসা করা যাক।

টেক্সট করার পক্ষে কিন্তু জোরালো যুক্তি আছে। পরিসংখ্যান বলছে, এখনকার যুগের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ফোনকলের চেয়ে টেক্সট মেসেজ বেশি পছন্দ করে। এমনকি ৭৫ শতাংশ তরুণ প্রজন্মের কাছে ফোনকল মানেই একধরনের আতঙ্ক!

কেন এমন হলো? কারণ, টেক্সট হলো এমন এক যোগাযোগের মাধ্যম, যেখানে তোমাকে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে হয় না। তুমি যখন মানসিকভাবে প্রস্তুত, ঠিক তখনই উত্তর দিতে পারো। হয়তো তুমি সুপারশপের লাইনে দাঁড়িয়ে আছ কিংবা ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষা করছ, এমন সময় চাইলেই একটা টেক্সট করে দেওয়া যায়। কিন্তু ফোনকল দাবি করে তোমার তাৎক্ষণিক মনোযোগ। তা ছাড়া টেক্সটে সবকিছুর একটা লিখিত প্রমাণ থাকে। ঠিকানা বা জরুরি তথ্য সহজে খুঁজে পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন
কর্মক্ষেত্রে এখনো ফোনকলের কদর আছে। বস বা কোনো ক্লায়েন্টের কল কেটে টেক্সট করা চরম অপেশাদার আচরণ হিসেবে ধরা হয়।
এখনকার যুগের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ফোনকলের চেয়ে টেক্সট মেসেজ বেশি পছন্দ করে। এমনকি ৭৫ শতাংশ তরুণ প্রজন্মের কাছে ফোনকল মানেই একধরনের আতঙ্ক!

কিন্তু যারা শুধু টেক্সটেই আটকে থাকতে চাও, তাদের জন্য বিজ্ঞান একটা দুঃসংবাদ দিচ্ছে! জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল সাইকোলজি জার্নালের প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন টেক্সটের বদলে সরাসরি কথা বলে, তখন তারা একে অপরের সঙ্গে অনেক বেশি গভীর সম্পর্ক অনুভব করে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা ভেবেছিল, ফোন করাটা হয়তো বেশ অস্বস্তিকর হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, কলের মাধ্যমে কথা বললে মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ হয়, যা মানুষের মধ্যে বন্ধন বা মায়া বাড়ায়। টেক্সট করার সময় এমন কোনো হরমোন নিঃসরণ হয় না। সেখানে তুমি শুধু শব্দ আদান–প্রদান করছ, কোনো আবেগ বা উষ্ণতা নয়।

ফোন কেটে দেওয়া অভদ্রতা কি না, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে ফোনের ওপাশে কে আছে, তার ওপর। ওপাশ থেকে যদি বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ কল করেন, তবে অবশ্যই ফোন রিসিভ করা উচিত। বয়স্কদের কাছে ফোনকল শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি তাঁদের ভালোবাসা ও খোঁজখবর নেওয়ার উপায়। তুমি যদি তাঁদের কল কেটে দিয়ে টেক্সট করো, তবে সেটা তাঁদের কাছে ভীষণ অপমানের মনে হতে পারে।

কিন্তু খুব কাছের বন্ধু হলে তুমি বলতেই পারো, ‘এখন ব্যস্ত, রাতে কল দিচ্ছি।’ তবে সবচেয়ে বড় সামাজিক অপরাধ হলো, রাতে কল দেব বলে আর কল না করা!

আরও পড়ুন
দিন শেষে সত্যিটা হলো, ফোন কেটে দিয়ে টেক্সট করা এখন আমাদের সমাজের একটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এটা অনেক সময় বেশ কাজেরও বটে।

কর্মক্ষেত্রে এখনো ফোনকলের কদর আছে। বস বা কোনো ক্লায়েন্টের কল কেটে টেক্সট করা চরম অপেশাদার আচরণ হিসেবে ধরা হয়।

তবে ওপাশে যদি নতুন প্রজন্মের কেউ থাকে, তবে নির্দ্বিধায় টেক্সট করতে পারো। কারণ, তারা নিজেরাও ফোনকলের চেয়ে টেক্সটেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

কিছু কিছু পরিস্থিতিতে টেক্সট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যেমন মৃত্যু, বড় কোনো অসুখ, চাকরি চলে যাওয়া বা সম্পর্ক ভাঙার মতো খবরগুলো কখনো টেক্সটে দিতে নেই। টেক্সটে মানুষের কণ্ঠের সহানুভূতি বা আবেগ বোঝানো যায় না। আবার কেউ যদি তোমাকে পরপর ছয়বার কল করে, তবে বুঝতে হবে ব্যাপারটা জরুরি। তখনো যদি তুমি টেক্সট করে এড়িয়ে যেতে চাও, তবে সেটা রীতিমতো অন্যায়। কোনো দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাত ১১টায় কোথাও আটকা পড়ার মতো বিপদে অবশ্যই কল রিসিভ করতে হবে। যে কথা বোঝাতে তোমার ৪৭টি টেক্সট করতে হবে, তার চেয়ে দুই মিনিট কথা বলে নেওয়া অনেক সহজ ও বুদ্ধিমানের কাজ। আবার ধরো, তুমি নিজেই কাউকে বললে, ‘আমাকে পরে কল দিয়ো।’ সে যখন কল দিল, তুমি সেটা কেটে দিলে! এর চেয়ে বড় বোকামি আর কী হতে পারে?

দিন শেষে সত্যিটা হলো, ফোন কেটে দিয়ে টেক্সট করা এখন আমাদের সমাজের একটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এটা অনেক সময় বেশ কাজেরও বটে। কিন্তু একই সঙ্গে এটা একধরনের নীরব অভদ্রতাও। যেখানে তোমার হাতে একটু সদয় ও ভদ্র হওয়ার সুযোগ আছে, সেখানে শুধু নিজের সাময়িক স্বস্তির জন্য কল কেটে দেওয়াটা সম্পর্কগুলোকে ধীরে ধীরে শীতল করে দেয়।

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সম্পর্ক যত গভীর হয়, মানুষের জীবন তত সুখী ও দীর্ঘায়ু হয়। আর গভীর সম্পর্ক তৈরি হয় কণ্ঠস্বর শোনার মাধ্যমে, শুধু টাইপ করা স্ক্রিনের অক্ষরে নয়। তাই ফোনে পরিচিত কারও নাম ভেসে উঠলে সবুজ বাটনটা স্লাইড করে হ্যালো বলে দেখতে পারো। প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর শোনার অনুভূতিটা টেক্সটের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর!

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন