জেন-জি কি আসলেই মিলেনিয়ালদের চেয়ে কম বুদ্ধিমান

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, যা বিজ্ঞানীদের বেশ চিন্তায়ও ফেলে দিয়েছে। সাধারণত প্রতিটি নতুন প্রজন্ম আগের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ফ্লিন ইফেক্ট’। কিন্তু জেন-জি বা জেনারেশন জেড প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি উল্টে গেছে।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আজকের তরুণদের গড় আইকিউ (IQ) কমছে। তাদের বুদ্ধিমত্তা মিলেনিয়াল মা–বাবার চেয়েও কম। অথচ আমরা এখন আগের থেকে অনেক বেশি উন্নত। তবে কী কারণে আগের প্রজন্ম থেকেও জেন-জিদের আইকিউ কমছে?

১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যাদের জন্ম, তারাই হলো জেন-জি (Gen Z) বা জেনারেশন জেড। বর্তমানে এই প্রজন্মের সদস্যদের বয়স ১২ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে। আর তাদের আগের প্রজন্ম অর্থাৎ ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে যাদের জন্ম, তাদের বলা হয় মিলেনিয়াল (Millennials)। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই মিলেনিয়াল মা-বাবার তুলনায় তাদের জেন-জি সন্তানেরা পড়াশোনা ও আইকিউয়ে বেশ পিছিয়ে।

আরও পড়ুন

ফলে বিশ্বের বড় বড় নামী বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সিলেবাস সহজ করে ফেলছে। কারণ, জেন-জি প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য আগের পড়াগুলো বেশ কঠিন মনে হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জেন-জি প্রজন্মটি আইকিউ টেস্টে পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মনোযোগ ধরে রাখা ও স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে তাদের স্কোর বেশ কম। অনেক শিক্ষার্থী এখন একটি লম্বা বাক্য ঠিকমতো পড়তে পারছে না। এমনকি সাধারণ অঙ্কের সমাধান করতেও কষ্ট হচ্ছে। এটি আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় বিপদের সংকেত।

স্নায়ুবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ জ্যারেড কুনি হরভাথ দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণার ফল মোটেও ভালো নয়। তিনি দেখেছেন, বর্তমান প্রজন্মের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা ও পড়ার দক্ষতা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। ২০২৬ সালের একটি জার্নালে তিনি জানান, একজন কিশোর দিনে অর্ধেকটা সময় কাটায় মোবাইল বা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে।

কোনো কিছু শেখার উপায় হলো সেই বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের কাছ থেকে সেই ধৈর্য কেড়ে নিয়েছে। সবকিছু এখন এত সহজে পাওয়া যায় যে পড়াশোনার জন্য যে পরিশ্রম প্রয়োজন, তা কেউ করতে চাইছে না। শিক্ষার্থীরা এখন গভীর আলোচনার চেয়ে সংক্ষেপে সব শেষ করতে পছন্দ করে। তারা গুণের চেয়ে গতির পেছনে বেশি ছুটছে। এর ফলে তাদের চিন্তা করার ক্ষমতা আমাদের তুলনায় অনেকখানি কমে গেছে।

আরও পড়ুন
গবেষণার পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীরা আগের মতো আনন্দের জন্য বই পড়ছে না।

জ্যারেড কুনি চলতি বছর মার্কিন সিনেটের একটি কমিটিতে এই তথ্যগুলো জমা দেন। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখান, গত ২০ বছরে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে সাক্ষরতা, গণিতে দক্ষতা ও মনোযোগের ক্ষমতা বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা কমে গেছে।

জ্যারেড কুনি এই সমস্যার জন্য প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারকে দায়ী করেছেন। তিনি মনে করেন, আমরা ভেবেছিলাম ডিজিটাল যন্ত্র বা ল্যাপটপ পড়াশোনায় সাহায্য করবে। কিন্তু বাস্তবে এগুলো শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে আমাদের গভীর চিন্তা করার শক্তি কমে যাচ্ছে।

বর্তমানে মোবাইল আর এআই আমাদের জীবনের বড় অংশ জুড়ে আছে। প্রযুক্তির এই দাপট যেমন সুবিধার, তেমনি এর একটি অন্ধকার দিকও আছে। এটি আমাদের মস্তিষ্ককে অলস করে দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে এখন বিশেষজ্ঞরাও বেশ চিন্তিত। আসলে মানুষের বুদ্ধি বা আইকিউ কোনো স্থির বিষয় নয়। নিয়মিত কঠিন সমস্যার সমাধান আর মস্তিষ্কের চর্চা করলেই বুদ্ধি বাড়ে। কিন্তু নিজে চেষ্টা না করে কেবল এআইয়ের সাহায্য নিলে আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যায়। মেধার আসল বিকাশ ঘটে নিজের বুদ্ধিকে খাটানোর মাধ্যমে।

আরও পড়ুন
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, ১৮ মাস বয়স থেকেই শিশুদের শব্দ বোঝার ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

গবেষণার পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীরা আগের মতো আনন্দের জন্য বই পড়ছে না। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রতি তিনজনের মধ্যে মাত্র একজন শিশু শখ করে বই পড়ে। আর প্রতিদিন বই পড়ার অভ্যাস আছে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে মাত্র একজনের। গত ২০ বছরে বড়দের মধ্যেও প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। হয়তো এই পরিসংখ্যান আমাদের দেশে আরও ভয়াবহ।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, ১৮ মাস বয়স থেকেই শিশুদের শব্দ বোঝার ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। যেসব শিশু ছোটবেলায় পড়ার সঠিক সুযোগ বা সাহায্য পায় না, পরবর্তী জীবনে তাদের মনোযোগ ও চিন্তা করার ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো মোবাইল বা কম্পিউটারে একটানা স্ক্রলিং করা। এটি আমাদের মস্তিষ্কের কার্যকরী স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে। যখন মস্তিষ্ক কেবল ছোট ছোট ভিডিও বা তথ্যের টুকরা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন কোনো গভীর বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলে।

তবে আশার কথা হলো, বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ বাড়ানো আমাদের নিজেদের হাতেই। নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস আর নতুন কিছু শেখার চেষ্টা আমাদের মস্তিষ্ককে আবার সচল করে তুলতে পারে। তাই প্রয়োজন যন্ত্রের দাসে পরিণত না হওয়া।

সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট, ডেইলি মেইল

আরও পড়ুন