সৌরজগতের বাইরে পাওয়া গেছে পৃথিবীর মতো গ্রহের বায়ুমণ্ডল
আমাদের সৌরজগতের বাইরে কি প্রাণ আছে? এই প্রশ্ন বহুকালের। বহু মানুষ দীর্ঘকাল প্রশ্নটি করেছেন। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে প্রাণের সন্ধান না পাওয়া গেলেও নতুন এক তথ্য এই প্রমাণকে এগিয়ে নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে ৪৯ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহ খুঁজে পেয়েছেন, যার চারদিকে বায়ুমণ্ডল আছে। গ্রহটির পৃষ্ঠে তরল পানি থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে মহাকাশে থাকা গ্যাসীয় দানব গ্রহ এবং ‘সাব-নেপচুন’ গ্রহগুলোর চারপাশে বায়ুমণ্ডলের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল। এ ছাড়া বাসযোগ্য অঞ্চলের বাইরে অবস্থিত কিছু পাথুরে গ্রহের চারপাশেও বায়ুমণ্ডলের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। বাসযোগ্য অঞ্চল বলতে নক্ষত্রের চারপাশের এমন দূরত্বকে বোঝায়, যেখানে তীব্র ঠান্ডা বা গরমের বদলে তাপমাত্রা এমন থাকে, যেখানে গ্রহের পৃষ্ঠে তরল পানি থাকা সম্ভব। পানির কারণে সেখানে প্রাণ বিকশিত হতে পারে।
তবে এসব থেকে নতুন এই অনুসন্ধান পুরোপুরি আলাদা। এই গবেষণার প্রধান লেখক এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাবেক গবেষক ড. কলিন চেরুবিন বলেছেন, ‘আমাদের সৌরজগতের বাইরে বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা কোনো পাথুরে গ্রহের চারপাশে বায়ুমণ্ডল থাকার বিষয়টি এটিই প্রথম। সরাসরি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।’
ড. কলিন চেরুবিন আরও জানান, বাসযোগ্য অঞ্চলে হোক বা বাইরে, এটিই প্রথম কোনো পাথুরে গ্রহের বায়ুমণ্ডলে নির্দিষ্ট কোনো গ্যাসের সরাসরি উপস্থিতি শনাক্ত করার ঘটনা।
গ্রহটির নাম এলএইচএস ১১৪০বি, যার ভর আমাদের পৃথিবীর চেয়ে ৫.৬ গুণ বেশি। এর ব্যাসার্ধ বা আকার পৃথিবীর চেয়ে ৭০ শতাংশ বড়। গ্রহটির ভেতরের উপাদান এবং তাপমাত্রা পৃথিবীর সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে অমিলও আছে। যেমন, গ্রহটি এর নক্ষত্রের সঙ্গে জোয়ারভাটার মতো আটকে আছে। এর মানে, গ্রহটির এক পিঠ সব সময় এর নক্ষত্রের দিকে মুখ করে থাকে। যেমন চাঁদের এক পিঠ সব সময় পৃথিবীর দিকে থাকে। গ্রহটিতে পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি পানি থাকতে পারে। এর বায়ুমণ্ডলের গঠনও হয়তো একেবারেই আলাদা।
২০১৭ সালে আবিষ্কৃত এ গ্রহটি আমাদের তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থিত। এটি ‘কেটাস’ (তিমি বা সমুদ্রদানব) নক্ষত্রমণ্ডলের একটি ছোট লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এ নক্ষত্রটি আমাদের সূর্যের চেয়ে আকারে ছোট এবং কম উজ্জ্বল হলেও এটি থেকে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর আয়নাইজিং বিকিরণ বা রেডিয়েশন নির্গত হয়।
নতুন এই গবেষণার ফলে আমরা এখন জানি, গ্রহটিতে একটি বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলার সব উপাদানই মজুত আছে। এটি একটি পাথুরে গ্রহ। এর তাপমাত্রা তরল পানি ধরে রাখার অনুকূল। এর বায়ুমণ্ডল পানিকে মহাকাশে উড়ে যাওয়া থেকে আটকে রাখছে। ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে গ্রহের পৃষ্ঠকে রক্ষা করছে। এর পাশাপাশি এর মাতৃনক্ষত্রটি বেশ শান্ত প্রকৃতির। এই নক্ষত্র থেকে হুটহাট তীব্র অগ্নিশিখা বা ফ্লেয়ার বের হয় না।
তবে একই নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরা আরেকটি পাথুরে গ্রহ আছে। যেটির চারপাশে কোনো বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে চেরুবিন ও তাঁর সহকর্মীরা জানান, চিলির লাস ক্যাম্পানাস অবজারভেটরিতে অবস্থিত ম্যাগেলান ক্লে টেলিস্কোপে বসানো একটি ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফের সাহায্যে তাঁরা গ্রহটিকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। গ্রহটি তখন এর নক্ষত্রের সামনে দিয়ে পার হচ্ছিল।
২০২৪ সালে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, গ্রহটির বায়ুমণ্ডল থেকে ‘হিলিয়াম’ গ্যাস মহাকাশে দিকে চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে ২০২৫ সালের পর্যবেক্ষণে। সে বছর গ্রহটি থেকে কোনো হিলিয়াম গ্যাস নির্গত হতে দেখা যায়নি। বিষয়টি বিজ্ঞানীদের জন্য ছিল এক বড় ধাক্কা। এই বিপরীত তথ্যের কারণে তাঁরা প্রাথমিক তথ্যগুলো আবার নতুন করে বিশ্লেষণ করতে বাধ্য হন।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক জেন বার্কবি এ কাজটিকে একটি দারুণ আবিষ্কার বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মহাবিশ্বে লাল বামন নক্ষত্রগুলোই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এদের বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা পাথুরে গ্রহগুলোই আমাদের জন্য প্রাণের সন্ধান করার সবচেয়ে বড় সুযোগ। কিন্তু এই নক্ষত্রগুলো সাধারণত খুব সক্রিয় হয়। সক্রিয়তার কারণে এদের গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল তীব্র ঝড়ে উড়ে যায়। এভাবে গ্রহগুলো বাতাসহীন পাথরের টুকরায় পরিণত হয়।
গ্রহটির চারপাশে বায়ুমণ্ডলের আবিষ্কার সেখানে প্রাণ থাকার সম্ভাবনার ব্যাপারে আমাদের আশাবাদী করে। গ্রহটির বায়ুমণ্ডল এর নক্ষত্রের চরম অতিবেগুনি বিকিরণের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এই তথ্য থেকে আমরা জানতে পারি, গ্রহটির পৃষ্ঠের অবস্থা কেমন। স্বাভাবিকভাবেই এ থেকে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এখানে কি প্রাণের বিকাশ ঘটা সম্ভব? আর যদি সম্ভব হয়, তবে সেই প্রাণকে ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে বাঁচতে কেমন প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়েছে?
গ্রহটি এত বেশি পরিমাণে বায়ুমণ্ডলের গ্যাস হারাচ্ছে যে বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে তা শনাক্ত করতে পারছেন। একটি ছোট ও পাথুরে গ্রহের ক্ষেত্রে এটি হিসাব করা মোটেও সহজ কাজ নয়।
বিজ্ঞানীদের এই পর্যবেক্ষণ গ্রহটির উপরিভাগের বায়ুমণ্ডলের গ্যাস হারিয়ে যাওয়া বিষয়ে। এর নিচের বায়ুমণ্ডল বা পৃষ্ঠদেশের কাছাকাছি অঞ্চলের তথ্য এই পর্যবেক্ষণে নেই। যেখানে সাধারণত প্রাণ বিকশিত হওয়ার কথা। এই ফলাফল থেকে গ্রহটিতে প্রাণ আছে এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান