প্রথম এশিয়া প্যাসিফিক এআই অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের তিন স্বর্ণপদক

২৬ জুন রাত। এশিয়া প্যাসিফিক অলিম্পিয়াড ইন এআইতে (এপিওএআই) বাংলাদেশ দলের আট সদস্যের মতো আমারও সময় কাটছিল উৎকণ্ঠায়। ১৩ জুন আয়োজিত হয়েছিল প্রথম এশিয়া প্যাসিফিক এআই অলিম্পিয়াড। পরদিন সকালে এই প্রতিযোগিতার ফল প্রকাশ হওয়ার কথা। সকাল সাড়ে সাতটার দিকেই আনুষ্ঠানিক ফলের খবর এল। তৃতীয় বছরেই বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডে এসেছে প্রথম স্বর্ণপদক! শুধু তা-ই নয়, একসঙ্গে বাংলাদেশ স্বর্ণপদক জিতেছে তিনটি, যা অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। কীভাবে বাংলাদেশের ঝুলিতে তিনটি স্বর্ণ এল—এটা বলার জন্যই লেখাটা লিখেছি।

গল্পের শুরু হয়েছিল এপ্রিলে। এ সময় এ বছরের বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডের ঘোষণা দেওয়া হয়। গত বছরের অক্টোবরে উইন্টার এআই অলিম্পিয়াডের ক্যাম্পে এবারের দুজন স্বর্ণপদকজয়ী প্রস্তুতি নিচ্ছিল ভালো ফলের জন্য।

এআই অলিম্পিয়াড ব্যাপারটা বিশ্বজুড়ে বেশ নতুন। ২০২৪ সালে শুরু হয় এই অলিম্পিয়াড। বছরে এর দুটি করে এডিশন হয়। একটা গ্রীষ্মকালীন, আরেকটা শীতকালীন। বাংলাদেশ একদম শুরুর আসর থেকেই এখানে অংশ নিচ্ছে। বুলগেরিয়া, সৌদি আরব ও চীনের প্রথম তিনটি আসরে বাংলাদেশ তিনটি ব্রোঞ্জ ও দুটি সিলভার মেডেল পেয়েছিল। সর্বশেষ স্লোভেনিয়ায় আয়োজিত শীতকালীন এআই অলিম্পিয়াডে ভিসা জটিলতায় বাংলাদেশ অংশ নিতে পারেনি। অন্যদিকে এ বছর শুরু হয়েছে এআই অলিম্পিয়াডের আন্তমহাদেশীয় আয়োজন, যার এশিয়া প্রশান্ত মহাদেশীয় অংশ হলো এপিওএআই। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের এ আয়োজনে এবার বাংলাদেশসহ অংশ নিয়েছে চীন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, জাপানসহ মোট ১৮টি দেশ।

আরও পড়ুন

আন্তর্জাতিক এআই অলিম্পিয়াডের দল নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াড-বিডিএআইও আয়োজন করা হয়। গত দুই বিডিএআইও শুধু ঢাকায় হয়েছিল। এবারের এডিশনে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী মোট ছয়টি ভেন্যুতে আঞ্চলিক পর্বের আয়োজন করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে সরাসরি আঞ্চলিক ভেন্যুতে, রাজশাহী ও খুলনায় এবং এর বাইরের বাকি অঞ্চলগুলোয়ও অনলাইনে আঞ্চলিক বাছাইপর্ব আয়োজিত হয়। প্রতিযোগিতাগুলো চলে ২ থেকে ১০ মের মধ্যে। আঞ্চলিক পর্যায়ে কুইজ ও কোডিং রাউন্ড মিলিয়ে হাজারখানেক শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করে। ১৬ মে ঢাকায় আয়োজন করা হয় ফাইনাল রাউন্ড। সেখান থেকে নির্বাচিত সেরা ৩০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে ২০ থেকে ২৩ মে হয় ন্যাশনাল ক্যাম্প। ক্যাম্পে সিলেকশন কনটেস্ট ও ভাইভার মধ্য দিয়ে জুনের এপিওএআইয়ের জন্য আটজনের দল নির্বাচিত হয়। বাংলাদেশ দলে সুযোগ পায় হোমনা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির লাবিব শাহরিয়ার, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির মো. সাইদুজ্জামান আরাফ, নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির ত্রিদিব রায় আর্য, দারুস সালাম সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির নাওফিল রহমান, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিলের একাদশ শ্রেণির নাঈরা নাওয়ার আহমেদ, মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির অনন্য যারিফ আকন্দ, নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির মোবতাসিম চৌধুরী প্রিয়ম এবং ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের দশম শ্রেণির মুরতাযা আবদুল্লাহ। আমি ছিলাম এই অলিম্পিয়াডের একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর।

এআই অলিম্পিয়াডে বেশ কয়েকটি বিষয় থেকে প্রশ্ন আসে। এর মধ্যে আছে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং বা এনএলপি, ইমেজ প্রসেসিং, অডিও প্রসেসিং এবং ট্যাবুলার ডেটা প্রসেসিং। নাম শুনেই বিষয়গুলো কী বোঝা যায়। বর্তমানে আমরা চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো যেসব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহার করি কিংবা গুগল ট্রান্সলেটরে এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় অনুবাদ করি, তা এনএলপির উদাহরণ। তোমার মোবাইল ফোনে গুগল ফটোজ যে একই ধরনের ছবিগুলো একসঙ্গে সাজিয়ে দেয় বা ফেস লক যে তোমার মুখ চেনে, সেটি হয় ইমেজ প্রসেসিং দিয়ে। স্পটিফাইয়ের মতো গান শোনার অ্যাপগুলো অডিও প্রসেসিং করে তোমার পছন্দ অনুযায়ী গান খুঁজে দেয়। মেসি আগামী ম্যাচে কয়টি গোল দেবে, সেটা আগের খেলাগুলোর বিভিন্ন ডেটা ব্যবহার করে অনুমান করা যায় ট্যাবুলার ডেটা প্রসেসিং করে।

এবারের আঞ্চলিক পর্বে আসা একটি প্রশ্ন শুনে তোমার মজা লাগতে পারে। আগের রাতে কতক্ষণ ঘুমিয়েছে, ক্লাস কতটা ইন্টারেস্টিং হচ্ছে, আবহাওয়া কতটা গরম, অনেক শিক্ষার্থীর এ রকম বেশ কিছু ডেটা দিয়ে মেশিন লার্নিং মডেল বানিয়ে অনুমান করতে হবে, ক্লাসে একজন শিক্ষার্থী গড়ে কতবার হাই তুলবে!

অলিম্পিয়াডের সমস্যাগুলো পাইথন দিয়ে সমাধান করতে হয়। তোমাদের হাইস্কুলের আইসিটি টেক্সট বইয়েই পাইথন শেখানো হয়। পাইথনের মৌলিক বিষয়গুলো শেখার পরে শিখে নিতে হয় নাম্পাই, পান্ডাজ, ম্যাটপ্লটলিব, সাইকিটলার্ন ও পাইটর্চের মতো কিছু লাইব্রেরি। অনেক বড়সংখ্যক সংখ্যা নিয়ে কাজ করা, সুন্দর সুন্দর গ্রাফ তৈরি করা, মেশিন লার্নিং মডেল ও নিউরাল নেটওয়ার্ক বানানো—এ রকম অনেক মজার মজার কাজ করা যায় এই লাইব্রেরিগুলো দিয়ে। এখন শেখাও খুব সহজ। ইন্টারনেটে আর ইউটিউবে প্রচুর ফ্রি রিসোর্স পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন

আমাদের এপিওএআই দলের কিছু সদস্য অনেক ছোট বয়সে পাইথন শেখা শুরু করেছিল। যেমন ক্লাস এইটের নাওফিল। চার বছর বয়সে প্রথম কম্পিউটার ব্যবহার করা নাওফিল ক্লাস ফোরে উঠে প্রোগ্রামিং শুরু করে। অনন্যর গল্পটাও শুরু হয় চার বছর বয়সে। ওর স্বপ্ন ছিল এমন একটি রোবট বানানোর, যেটা ওর মতো করে ওকে বুঝতে পারবে। ছেলের স্বপ্নপূরণে তার বাংলা শিক্ষক বাবা প্রথমে নিজে সি প্রোগ্রামিং শেখেন, তারপর তাঁর ছোট্ট ছেলের জন্য বাংলা ভাষায় নিজের মতো কারিকুলাম তৈরি করে শেখানো শুরু করেন!

এপিওএআইকে সামনে রেখে বাংলাদেশ টিমের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল তিন দিনের একটি আলাদা ক্যাম্প। এটা চলে ৫ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত। ৫ ও ৭ তারিখে অফিশিয়াল দুটি প্র্যাকটিস কনটেস্ট ছিল। পুরো ক্যাম্পটি ডিজাইন করা হয়েছিল মূল কনটেস্টের আদলে। পরীক্ষার হলে ভিডিও রেকর্ডিং ছিল, প্রত্যেকের স্ক্রিন ওবিএস স্টুডিও সফটওয়্যার দিয়ে রেকর্ড করা হচ্ছিল। মূল পরীক্ষার আদলে প্র্যাকটিস সবাইকে একটা বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগায়। এর পাশাপাশি একাডেমিক টিম থেকে প্রতিদিন কনটেস্টদের প্র্যাকটিস মনিটর করা হয়, গাইড করা হয়। ক্যাম্প ও কনটেস্টগুলোয় সিরিয়াস প্র্যাকটিসের পাশাপাশি চলতে থকে হাসি-আড্ডার প্রাণখোলা সময়।

এবারের প্রস্তুতিতে এক্স ফ্যাক্টর ছিল আমাদের আগের ইন্টারন্যাশনাল এআই অলিম্পিয়াডের পদক পাওয়া বিজয়ীরা। সিলভার পদকজয়ী আরেফিন ও ইনান এবং ব্রোঞ্জপদকজয়ী রাহিক ও রাফিদ তাদের অভিজ্ঞতার সবটুকু দিয়ে একাডেমিক টিমের অংশ হয়ে প্র্যাকটিস গাইডলাইন তৈরিতে সহায়তা করেছে। ফলে কনটেস্টের ছোটখাটো অনেক বিষয় নিয়ে টিমের সবার একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়ে যায় আগেভাগেই।

১৩ জুন কনটেস্ট শুরু হওয়ার সময় ছিল দুপুর ১২টা। ৬ ঘণ্টায় ৪টি মেশিন লার্নিং প্রবলেম নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রতিটি দেশ নিজ নিজ দেশের ভেন্যু থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে পরীক্ষা দিচ্ছিল। বাংলাদেশের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের ৪০৭ নম্বর রুম। সকাল ৯টাতেই কেন্দ্রে হাজির হয়ে যায় আর্য আর আরাফ। একে একে জড়ো হয় নাঈরা, নাওফিল, মুরতাযা, লাবিব, প্রিয়ম। অনন্য আসে ১১টার দিকে। যেহেতু দুপুরে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা কনটেস্ট, সে কারণে সকাল থেকেই সবাই অল্প বিরতিতে হালকা নাশতা করতে থাকে। কাঠবাদাম, খেজুর, দই, স্যান্ডউইচ, প্যাটিস, চকলেট, জুস। কনটেস্ট টাইমে এ রকম প্রচুর নাশতা দেওয়া হয়, যাতে করে ভারী খাবার না খেয়েও ওরা কনটেস্ট দিতে পারে। কনটেস্ট শুরুর আগে সবাই গোল হয়ে জড়ো হয়। সবাই মডেল প্রেডিকশন নামের একটি খেলা বানিয়ে খেলতে শুরু করে। এখানে একজন একটি মডেলের কিছু বৈশিষ্ট্য বলছিল, বাকিরা পাঁচটি প্রশ্নের মধ্যে সেই মডেলটি কী আন্দাজ করতে চেষ্টা করছিল। এই খেলার মাধ্যমে সবাই হাসি-আনন্দের ভেতর দিয়ে চাপমুক্ত হয়, কনটেস্টের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে নেয়। সাড়ে ১১টার দিকে টিম ফটো তুলে সবাই যার যার সিটে বসে যায়। শুরু হয় ছয় ঘণ্টার লড়াই।

আরও পড়ুন

কনটেস্টের প্রথম প্রবলেমটি ছিল স্লোন ডিজিটাল স্কাই সার্ভের (এসডিএসএস) ডেটাসেট ব্যবহার করে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং কোয়াজার শনাক্ত করার মডেল বানানো। ৩০ হাজার সারির এই ডেটাসেটে ডেটা ইমব্যালেন্স সামলে বুদ্ধিদীপ্ত ফিচার ইঞ্জিনিয়ারিং করা ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। মজার ব্যাপার হলো, প্রবলেমের সঙ্গেই দুটি রিসার্চ পেপারও দিয়ে দেওয়া হয়েছিল! দ্বিতীয় প্রবলেমটি ছিল একটি অডিও ক্ল্যাসিফিকেশন প্রবলেম। ২৪ হাজার ট্রেইনিং ডেটা দিয়ে এখানে হাঁচি, হাসি, কান্না, সাইরেন, কুকুরের ডাক—এ রকম ১০ ধরনের শব্দ আলাদা করে চিনতে পারে এমন মডেল বানাতে হতো। তৃতীয় প্রবলেমে ২০০টি অণুর গাঠনিক কাঠামো, এনার্জি এ রকম কিছু প্রোপার্টি দিয়ে এমনভাবে মডেল ট্রেইন করতে হতো, যেটি গাঠনিক কাঠামো দেখেই বলে দিতে পারবে নতুন কোনো একটি অণুর এনার্জি প্রোপার্টি কেমন হবে। সবশেষ প্রবলেমটি ছিল একটি ইমেজ প্রসেসিং প্রবলেম। এখানে ৫৩টি আলাদা চিতাবাঘের ছবি ছিল। ছবিগুলো তোলা হয়েছে ইনফ্রারেড ক্যামেরা ট্র্যাপ ব্যবহার করে। ফলে একেকটি ছবিতে আলোর পরিমাণ, অ্যাঙ্গেল, ব্যাকগ্রাউন্ড, দাঁড়ানোর ভঙ্গি—সবই ছিল আলাদা ধরনের। এ ছবিগুলো থেকে মডেল ট্রেইন করতে হতো যাতে মডেল প্রতিটি চিতাবাঘকে আলাদা করে চিনতে পারে!

প্রবলেম সেটের দিকে তাকালে একটি জিনিস পরিষ্কার হয়ে যায়, একজন শিক্ষার্থী যে ফিল্ডেই বড় হয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখুক না কেন, সেখানে মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার তাকে অন্য রকম একটা শক্তি দেবে। কেউ রসায়নে অণুর অদ্ভুত জগতের অর্থ বুঝতে চায়? মহাকাশের যে বিশাল পরিমাণ ডেটা টেলিস্কোপগুলো ক্রমাগত তুলে যাচ্ছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বের রহস্য ভেদ করতে চায়? ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি করে বের করতে চায় সুন্দরবনের কোন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের স্বভাব কেমন? বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে বের করতে চায় প্রাচীন কোনো লিপির অর্থ? বিজ্ঞান হোক আর ইতিহাস হোক—সবকিছুতেই আজকাল মেশিন লার্নিং দিয়ে এমন সব চমকপ্রদ কাজ করা যাচ্ছে, যেটা মাত্র এক যুগ আগেও লাখ লাখ টাকা খরচ করেও সম্ভব ছিল না। এই যুগে মেশিন লার্নিং পরিণত হয়েছে সব বিষয়ের জন্য দরকারি একটি সাধারণ দক্ষতায়।

কনটেস্টের শুরুতেই লাবিব অ্যাস্ট্রোনমির প্রবলেমে লিডারবোর্ডের প্রথম স্থানে উঠে আসে। পরবর্তী অডিও প্রসেসিং প্রবলেমেও লাবিব ভালো করে। কনটেস্ট শেষে এই প্রবলেমে লাবিবের অবস্থান ছিল তৃতীয়। চিতাবাঘ চেনার প্রবলেমে আর্য প্রথম হয়। নাওফিল এই প্রবলেমে ছিল অষ্টম। অণুর গঠন থেকে এনার্জি প্রোপার্টি বের করার প্রবলেমে আরাফ হয় চতুর্থ। অ্যাস্ট্রোনমির প্রবলেমে অনন্য নবম অবস্থানে ছিল।

কনটেস্ট চলাকালে দুটি ক্যামেরা দিয়ে পুরো রুমের ভিডিও রেকর্ড করা হচ্ছিল। পাশাপাশি ক্যামেরা দুটি সংযুক্ত ছিল একটি জুম মিটিংয়ে, যার মাধ্যমে পুরো প্রতিযোগিতা মনিটর করছিল চীনের আয়োজক কমিটি। প্রতিযোগীদের প্রত্যেকের কম্পিউটার স্ক্রিন ওবিএস স্টুডিও দিয়ে রেকর্ড করা হয়েছিল। কনটেস্ট শেষে আমরা এই রেকর্ডিংগুলো আয়োজকদের কাছে পাঠিয়ে দিই। এরপর শুরু হয় ফল ঘোষণার অপেক্ষা। দুই সপ্তাহ পরে ২৭ জুন ফল ঘোষণার দিন ঠিক করে আয়োজক কমিটি। এ সময়ের মধ্যে তারা অংশগ্রহণকারী সব দেশের ভিডিও রেকর্ডিং যাচাই-বাছাই করে দেখে, কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি না। পাশাপাশি প্রতিযোগীদের তৈরি করা মডেল নতুন একটি টেস্ট সেটে চালিয়ে সমন্বিত লিডারবোর্ড তৈরি করে।

আরও পড়ুন

ফল ঘোষণার পরে দেখা গেল, লাবিব, আরাফ ও আর্য তিনটি স্বর্ণপদক জিতে নিয়েছে, যথাক্রমে চতুর্থ, পঞ্চম ও নবম স্থানে থেকে! এর পাশাপাশি নাওফিল, নাঈরা, অনন্য ও প্রিয়ম সম্মানজনক স্বীকৃতি জিতে নেয়। আর মুরতাযাও সম্মানজনক স্বীকৃতির খুব কাছে চলে যায়। আসলে পুরো কনটেস্টেই সবাই হাল ছেড়ে না দিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। যেমন সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা যাওয়া পরে অ্যাস্ট্রোনমি প্রবলেমে আরাফের পজিশন ছিল ১১০-এরও বাইরে। কিন্তু হাল ছেড়ে না দিয়ে ও শেষ মুহূর্তে সেরা ২০-এর মধ্যে উঠে আসে এবং শেষমেশ সোনা জেতে।

যখন জুম মিটিংয়ে অন্য দেশগুলোর ভেন্যু দেখছিলাম, বাংলাদেশের ভেন্যুকে সবচেয়ে সাদামাটা মনে হচ্ছিল। সৌদি আরব, চীন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, ভিয়েতনাম, হংকং—প্রতিটি দেশেই কনটেস্টরা ঝাঁ-চকচকে ভেন্যুতে বসে কনটেস্ট দিচ্ছিল। একটা রুমে অনেকগুলো কম্পিউটার ছাড়া আমাদের ভেন্যুর আর কোনো বিশেষত্ব ছিল না। কিন্তু ফল ঘোষণার পরে দেখা গেল, সব দেশ ছাপিয়ে বাংলাদেশের নামটি সবচেয়ে উজ্জ্বল!

ব্যাপারটি বাংলাদেশ দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আপ্লুত করেছে। প্রত্যেকের মাথায় গেঁথে গিয়েছিল, কেউ শুধু নিজেকে প্রতিনিধিত্ব করছে না, বরং সবাই মিলে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছে বাংলাদেশকে।

তুমিও কি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডের হয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে চাও? তাহলে বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডের ফেসবুক পেজ এবং অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে চোখ রেখো। (www.bdaio.org)

এপিওএআইয়ের এবারের প্রবলেমগুলার মিরর কনটেস্ট চলছে বোরিয়াম প্ল্যাটফর্মে, চলবে ৩১ জুলাই পর্যন্ত। প্রবলেমগুলো দেখতে পারো এই লিংকে:https://www.bohrium.com/en/competitions/91841752314?tab=introduce

আরও পড়ুন