মানুষ কেন ভাইরাল হতে চায়
ইন্টারনেটের কারণে এখন আমরা খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। কিন্তু এত মানুষের সঙ্গে যুক্ত থেকেও অনেকে নিজেকে একা মনে করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয়, সবার সঙ্গে থেকেও একা হয়ে যাওয়া।
অনেকে এখন মনে করে, নিজের ভালো কোনো কাজ বা সুন্দর কোনো মুহূর্ত ফেসবুকে বা ইন্টারনেটে শেয়ার না করলে সেটার কোনো দাম নেই। অর্থাৎ অন্যকে না দেখালে নিজের গুরুত্ব নিয়ে মনে একধরনের সন্দেহ তৈরি হয়। আর এ কারণেই মানুষের মধ্যে ভাইরাল হওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগে। তারা মনে করে, ইন্টারনেটে সবাই তাকে চিনলে হয়তো মনের এই একাকিত্ব দূর হবে।
কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেটে এই অতিরিক্ত যোগাযোগ আমাদের মনের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজারো মানুষের সঙ্গে কথা হলেও সামনাসামনি আড্ডার অভাব পূরণ হয় না। ফলে মানুষের মনে কষ্ট বা বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে। আসলে আমরা ডিজিটাল দুনিয়ায় একে অপরের খুব কাছে থাকলেও বাস্তবে দিন দিন অনেক দূরে সরে যাচ্ছি।
আসলে ভাইরাল হওয়ার ইচ্ছাটা কেবল বিখ্যাত হওয়া বা মানুষের মনোযোগ পাওয়ার জন্য হয়, এমন নয়। এর আসল উদ্দেশ্য মানুষের স্বীকৃতি পাওয়া। এটি মনের ভেতর থাকা একটি প্রশ্নের উত্তরের মতো, ‘আমার কি কোনো গুরুত্ব আছে?’ একটি ভাইরাল পোস্ট মানুষের সে প্রশ্নের কিছুটা উত্তর দেয়। যখন কেউ কোনো পোস্টে লাইক দেয় বা মন্তব্য করে, তখন মনে হয় যে কেউ অন্তত আমার কথা শুনেছে বা খেয়াল করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সবার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিলেও এটি মনে মনে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার জেদ তৈরি করে দেয়। আমরা সব সময় অন্যের সাজানো জীবন, সাফল্য বা হাসিমুখ দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন কারও কথা মন দিয়ে শোনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় লাইক বা শেয়ারের সংখ্যা। যখন অন্য কেউ ভাইরাল হয়, তখন মনে হয় সে হয়তো বিশেষ কিছু। আর যখন নিজের ক্ষেত্রে এমনটা হয় না, তখন অনেকে মনে করে, মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করছে।
এ কারণেই মানুষ ভাইরাল হতে নিজেকে মানিয়ে নেয়। তারা নিজের জটিল আবেগগুলোকে খুব সহজ কিছু কথায় সাজায়। অনেকে নিজের কষ্টকে অনেক বড় করে দেখায় অথবা আনন্দকে অনেক বেশি তুলে ধরে। এটি সব সময় মিথ্যা বলার জন্য নয়; বরং মানুষের নজরে আসার প্রয়োজনেই অনেকে এমনটা করে। বর্তমান সময়ে মানুষের মনোযোগ পাওয়াটাই যেন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর চুপচাপ থাকাকে মনে করা হচ্ছে একধরনের ব্যর্থতা।
ভাইরাল হওয়ার এই প্রবল ইচ্ছার পেছনে আসলে কাজ করে একধরনের ভয়, সবাই আমাকে ভুলে যাবে না তো? আজকের এই প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে অনেকের মনেই সাধারণ জীবন কাটানো নিয়ে একধরনের ভয় কাজ করে। তারা মনে করে, যদি ইন্টারনেটে কেউ তাদের পোস্টে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখায় বা লাভ না দেয়, তবে হয়তো সমাজে তাদের কোনো গুরুত্বই থাকবে না।
কিন্তু সত্যি কথা হলো, ভাইরাল হওয়াটা খুব সাময়িক একটি বিষয়। আজকের যে পোস্ট ইন্টারনেটে তোলপাড় সৃষ্টি করছে, কালকেই মানুষ নতুন কোনো পোস্টের খোঁজে সেটি ভুলে যাবে। সবাই সব সময় নতুন নতুন উত্তেজনার খোঁজে থাকে। তাই ভাইরাল হওয়ার পর যখন সেই আলোচনা থেমে যায়, তখন অনেকেই আবার সেই আগের মতো একাকিত্বে ফিরে যায়।
আরেকটি বিষয় আমাদের বুঝতে হবে। সব গুরুত্বপূর্ণ বা ভালো বিষয়ই যে ইন্টারনেটে হইচই ফেলবে, তা কিন্তু নয়। অনেক ভালো চিন্তার কোনো লাইক জোটে না। অনেক সময় বড় পরিবর্তনগুলো ঘটে খুব নীরবে, যা কোনো কম্পিউটার বা ইন্টারনেট হিসাব করে বের করতে পারে না।
আসল প্রশ্ন এটা নয় যে মানুষ কেন ভাইরাল হতে চায়। প্রশ্ন হলো, কেন এত মানুষ নিজেদের গুরুত্বহীন বা অদৃশ্য মনে করছে? এর সমাধান হয়তো আরও বেশি ইন্টারনেটে সময় কাটানো বা লোকদেখানো কাজ করা নয়; বরং এর সমাধান হলো একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো। আর এমন এক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কারও প্রশংসা ছাড়াও মানুষ হিসেবে নিজেকে মূল্যবান মনে করা যায়।