আমাজন নয়, তবে বিশ্বের বৃহত্তম বন কোনটি
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বনের নাম কী? যদি আমাজন ভেবে থাকো, তবে উত্তরটি ভুল। কিন্তু চিন্তার কিছু নেই, অনেকেই একই উত্তর দেয়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বনটি সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই জানে না। আর সেখানে মানুষের যাতায়াতও বেশ কম। এর নাম বোরিয়াল বন। তবে অনেকেই একে তাইগা (Taiga) বন নামে চেনে। পাইন ও সিডারগাছে ভরা বিশাল বনটি পৃথিবীর ওপরের দিকটাকে বলয়ের মতো পেঁচিয়ে রেখেছে।
এই বোরিয়াল বন প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। পুরো পৃথিবীর মোট বনের তিন ভাগের এক ভাগই এই বন, যা আমাজনের চেয়েও অনেক বড়।
এত বড় একটি বন থাকা সত্ত্বেও এটি নিয়ে মানুষ খুব একটা আলোচনা করে না। তাই চলো, আজ এই বিশাল বনের ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
আমাজন নয়, সবচেয়ে বড় বোরিয়াল বন
বিষয়টি শুরুতেই পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। কারণ, এটা অনেকেই গুলিয়ে ফেলে। আমাজন হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৃষ্টিপ্রধান অরণ্য বা রেইনফরেস্ট। প্রায় ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বনটি সত্যিই বিশাল। তবে সব ধরনের বন যদি একসঙ্গে হিসাব করা হয়, তবে বোরিয়াল বন বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে যায়। এমনকি কেবল সাইবেরিয়ার বোরিয়াল বনটুকুও পুরো আমাজন বনের চেয়ে বড়। তাই আমাজন সবচেয়ে বড় রেইনফরেস্ট হলেও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বন কিন্তু এটি নয়।
পুরো পৃথিবীকে ঘিরে রাখা এক বন
বিশ্বের এই বোরিয়াল বন বা তাইগা মূলত উত্তর গোলার্ধের ওপরের অংশে অবস্থিত। এটি বৃক্ষহীন সুমেরু অঞ্চলের ঠিক নিচে একটি সবুজ বলয়ের মতো পুরো পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে। রাশিয়া, কানাডা, আলাস্কা ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মতো মোট আটটি দেশজুড়ে এটি বিস্তৃত।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি রয়েছে রাশিয়ায়। সেখানকার এ বনকে পৃথিবীর একক বৃহত্তম বন হিসেবে ধরা হয়। বনটি এত বিশাল যে কেবল সাইবেরিয়ার অংশটি পার হতেই ১১টি টাইম জোন পার হতে হয়। এই বনের যেকোনো জায়গায় দাঁড়ালে তুমি পৃথিবীর মোট গাছের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ গাছ দিয়ে ঘেরা থাকবে। এই বনের বেশির ভাগ অংশে কোনো মানুষ বাস করে না। আর সে কারণেই বনটি আজও অক্ষত ও সুরক্ষিত রয়েছে।
কানাডার বোরিয়াল বন
উত্তর আমেরিকার বোরিয়াল বনটি আলাস্কা থেকে কানাডা হয়ে নিউফাউন্ডল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বোরিয়াল এলাকা। পুরো পৃথিবীর যেকোনো পরিবেশের চেয়ে এখানে সবচেয়ে বেশি মিঠাপানি রয়েছে। ১০ লাখের বেশি হ্রদ, নদী ও জলাভূমিতে ভরা এই বন। এটি পাখি ও প্রাণীদের এক বিশাল আবাসস্থল। উত্তর আমেরিকার প্রায় ৬০ শতাংশ প্রজাতির পাখি শীতের আগে এই বনে আসে। শীতে পরিযায়ী হয়ে চলে যায়। ফলে বরফে ঢাকা এই বন হয়ে ওঠে পাখিদের অভয়ারণ্য।
হাড়কাঁপানো ঠান্ডা
বোরিয়াল বন মোটেও আরামদায়ক কোনো জায়গা নয়। এখানকার শীতকাল দীর্ঘ ও ভয়াবহ। পূর্ব সাইবেরিয়ার তাইগা অঞ্চলের ওইমিয়াকন নামে একটি জায়গায় তাপমাত্রা মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়। এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল জনবসতি।
এখানে গাছপালা বড় হওয়ার সময় পায় বছরে মাত্র ৮০ দিনের মতো। তীব্র এই ঠান্ডা সহ্য করে বেঁচে থাকে স্প্রুস, পাইন, ফার ও লার্চজাতীয় সুচালো পাতার গাছ। এদের মধ্যে লার্চগাছ একটু আলাদা। কনিফার বা সুচালো পাতার গাছ হওয়া সত্ত্বেও এটি প্রতি শরৎকালে সব পাতা ঝরিয়ে দেয়। সাইবেরিয়ার যেসব তীব্র শীতল জায়গায় অন্য কোনো গাছ বাঁচতে পারে না, সেখানেও লার্চ জন্মায়। আর বনের মাটিতে ছেয়ে থাকে শেওলা ও ক্র্যানবেরির মতো নানা ছোট ফল।
তাইগা শব্দটি মূলত একটি রুশ শব্দ, যার অর্থ ছোট লাঠির দেশ। তীব্র ঠান্ডার কারণে এখানকার গাছগুলো বেশি মোটা হতে না পেরে চিকন ও সোজা লাঠির মতো দেখায় বলে পৃথিবীর বৃহত্তম এই বনের এমন অদ্ভুত নাম দেওয়া হয়েছে।
বরফের দেশে কারা থাকে
এত তীব্র ঠান্ডা হওয়া সত্ত্বেও তাইগাতে অনেক ধরনের প্রাণীর বাস। নেকড়ে, বাদামি ভালুক, বনবিড়াল ও উলভারিন নামের প্রাণীদের বেশি দেখা মেলে। তবে এই বনের প্রধান আকর্ষণ হলো সাইবেরিয়ান বাঘ। এরা রাশিয়ার সুদূর পূর্বের বরফে ঢাকা বনে শিকার করে বেড়ায়।
পৃথিবীতে এটিই একমাত্র জায়গা, যেখানে তুষারের ওপর দিয়ে বাঘ হেঁটে যেতে দেখা যায়। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ঘটনাটি একদম সত্যি। বিড়াল প্রজাতির সবচেয়ে বড় এই প্রাণী পৃথিবীর অন্যতম শীতল এক বনে বাস করে।