মহাজাগতিক সংঘর্ষ কখন ঘটে

রাতের পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকালে আমরা কী দেখি? মিটমিট করে জ্বলতে থাকা অসংখ্য তারা দেখি, চাঁদ দেখি। খালি চোখে দেখলে মনে হয়, তারাগুলো যেন একে অপরের খুব কাছাকাছি গায়ে গা ঘেঁষে বসে আছে। যেন চাইলেই একটা তারা আরেকটা তারার সঙ্গে ধাক্কা লেগে যাবে! আসলেই কি তারায় তারায় ধাক্কা লাগে?

সত্যি কথা বলতে কী, সাধারণ অবস্থায় মহাকাশে তারায় তারায় ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। কারণ মহাশূন্যের বিশালতা। মহাকাশের বিশালত্ব আমাদের সাধারণ কল্পনার চেয়েও অনেক, অনেক বেশি। একটি তারা থেকে আরেকটি তারার দূরত্ব এত বেশি যে তাদের মধ্যে কোনো দিন দেখাই হয় না।

পুরো ব্যাপারটা একটু সহজ করে বোঝানো যাক। ধরো, আমাদের সূর্য হলো একটি ছোট্ট মার্বেল পাথর। এই মার্বেল পাথরটি যদি আমাদের ঢাকায় রাখা হয়, তবে তার সবচেয়ে কাছের মার্বেলটি থাকবে সুদূর জাপানে বা আমেরিকায়! আর মাঝখানের পুরো জায়গাটা একদম ফাঁকা। এখন তুমিই বলো, এই দুটি মার্বেলের মধ্যে কি কখনো ধাক্কা লাগা সম্ভব? মোটেও না। ঠিক এ জন্যই সাধারণ নিয়মে মহাকাশে দুটি নক্ষত্রের মধ্যে কখনো সংঘর্ষ হয় না। তারা কোটি কোটি বছর ধরে নিজেদের কক্ষপথে খুব শান্তিতেই ঘুরে বেড়ায়।

কিন্তু মহাবিশ্বের সব জায়গা তো আর এক রকম নয়। মহাশূন্যে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে নিয়মকানুন একটু আলাদা। এই জায়গাগুলোতে নক্ষত্রদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই জায়গাগুলোকে বলা হয় গ্লোবুলার ক্লাস্টার। এগুলোকে তুমি নক্ষত্রদের খুব ব্যস্ত শহর বলতে পারো।

আমাদের পৃথিবীতে যেমন খুব ভিড়ভাট্টাওয়ালা রাস্তায় গাড়িগুলোর মধ্যে প্রায়ই ধাক্কাধাক্কি লেগে যায়, গ্লোবুলার ক্লাস্টারেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। সেখানে প্রচুর নক্ষত্র একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকে। ফলে এক নক্ষত্র তার বিশাল মহাকর্ষ বলের টানে আরেক নক্ষত্রকে নিজের দিকে টেনে আনে। আর তখনই ঘটে সেই ভয়ংকর মহাজাগতিক দুর্ঘটনা! দুটি জ্বলন্ত নক্ষত্রের মধ্যে প্রচণ্ড বেগে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

এই নক্ষত্রদের ধাক্কাধাক্কির ফলে মহাকাশে এক অদ্ভুত রহস্যের জন্ম হয়। বিজ্ঞানীরা যখন টেলিস্কোপ দিয়ে গ্লোবুলার ক্লাস্টারগুলোর দিকে তাকান, তখন তাঁরা সেখানে বেশ কিছু বিশাল আকৃতির এবং প্রচণ্ড উত্তপ্ত নক্ষত্র দেখতে পান। এই নক্ষত্রগুলো গাঢ় নীল আলো ছড়িয়ে জ্বলতে থাকে। বিজ্ঞানীরা এদের নাম দিয়েছেন ব্লু স্ট্র্যাগলার।

প্রথম দিকে এই নক্ষত্রগুলোকে দেখে বিজ্ঞানীরা খুব অবাক হয়েছিলেন। এটা ছিল তাঁদের কাছে একটা বড় ধাঁধা। কারণ, বিজ্ঞানের হিসাব অনুযায়ী এই নক্ষত্রগুলোর বয়স এত বেশি যে কোটি কোটি বছর আগেই সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে এদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এদের এত দিনে বুড়ো হয়ে নিভে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে তারা এখনো দিব্যি তরতাজা যুবকের মতো জ্বলজ্বল করছে! এটা কীভাবে সম্ভব?

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণার পর অবশেষে এই ধাঁধার উত্তর খুঁজে পেলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন, এই ব্লু স্ট্র্যাগলার নক্ষত্রগুলো আসলে কোনো সাধারণ নক্ষত্র নয়। এরা হলো নক্ষত্রদের সেই ভয়ংকর সংঘর্ষের ফসল!

পৃথিবী থেকে নক্ষত্র বিস্ফোরণের ছবি দেখা যাবে
ফাইল ছবি: ফ্রিপিক

যখন দুটি সাধারণ ও পুরোনো নক্ষত্রের মধ্যে ধাক্কা লাগে, তখন তারা ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যায় না। বরং তারা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। দুটো বুড়ো নক্ষত্র গলে গিয়ে একেবারে নতুন একটা বিশাল ও প্রচণ্ড উত্তপ্ত নক্ষত্র তৈরি করে। অর্থাৎ দুটো নিভে আসা নক্ষত্র মিলে একটা টগবগে তরুণ নক্ষত্রের জন্ম দেয়! ঠিক এ জন্যই ব্লু স্ট্র্যাগলার নক্ষত্রগুলোকে দেখতে এত উজ্জ্বল ও তরতাজা মনে হয়।

শুধু গ্লোবুলার ক্লাস্টারেই নয়, মহাকাশের আরও কিছু জায়গায় এমন ধাক্কাধাক্কি হতে পারে। যেমন যেকোনো গ্যালাক্সির একেবারে কেন্দ্রের দিকের অঞ্চলগুলোতে। সেখানেও নক্ষত্রদের প্রচুর ভিড় থাকে।

এ ছাড়া আমাদের মহাকাশে অনেক বাইনারি স্টার বা যমজ নক্ষত্র আছে। এই দুটি সব সময় একে অপরের চারদিকে ঘুরতে থাকে। এই যমজ নক্ষত্রদের মধ্যেও একধরনের অদ্ভুত সংঘর্ষ হয়। এদের মধ্যে যখন একটি নক্ষত্রের জ্বালানি বা বয়স ফুরিয়ে আসে, তখন সেটি ধীরে ধীরে আকারে বড় হতে থাকে বা ফুলতে থাকে। ফুলে বড় হতে হতে একসময় সে তার পাশের ছোট সঙ্গী নক্ষত্রটিকে আস্ত গিলে ফেলে! এটাও একধরনের মহাজাগতিক সংঘর্ষ।

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস
আরও পড়ুন