নদীতে ভেসে যাওয়া ছোট্ট হাতিকে পৌঁছে দেওয়া হলো মা হাতির কাছে

এই দলে ছিলেন মিঠু দাস, রাজেশ দাস, বিশ্বনাথ দাস, গোপাল দাস এবং বাবলু দাস।টেলিগ্রাফ থেকে নেওয়া

চারদিকে ঘোলা জলের প্রবল ঘূর্ণি। তিস্তা নদীর তীব্র স্রোত যেন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। এর মধ্যেই জলের ওপরে জেগে আছে ছোট্ট একটি শুঁড়। বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টায় জল থেকে শ্বাস নেওয়ার জন্য শুঁড়টি বারবার ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে। ঘটনাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা ব্যারাজ এলাকার। মাত্র তিন-চার দিন বয়সী একটি হাতিশাবক নদী পার হতে গিয়ে দলছুট হয়ে পড়ে। মা হাতিটি স্রোতের উজানে গজলডোবায় আটকা পড়ে থাকলেও, প্রবল জলের তোড়ে ছোট্ট শাবকটি ভেসে যায় প্রায় চার কিলোমিটার ভাটিতে। মৃত্যুর সঙ্গে যখন তার দূরত্ব মাত্র কয়েক মুহূর্তের, ঠিক তখনই নদীর বুকে ত্রাতা হয়ে হাজির হয় একটি ছোট জেলে নৌকা।

নর্থ বেঙ্গল ফিশারমেনস ফোরামের পাঁচ সদস্য তখন নদীতে ছিলেন। দূর থেকে জলের ওপর ওই ছোট্ট শুঁড়টি ভাসতে দেখেই তাঁরা বিপদের আঁচ পান। কালবিলম্ব না করে ক্রান্তি-পাঞ্জাব বাঁধ থেকে প্রায় তিন মাইল পথ ওই ছোট কাঠের নৌকাতেই পাড়ি দেন তাঁরা। এই দলে ছিলেন মিঠু দাস, রাজেশ দাস, বিশ্বনাথ দাস, গোপাল দাস এবং বাবলু দাস।

কাছে পৌঁছাতেই দেখা যায়, স্রোতের সঙ্গে লড়াই করতে করতে শাবকটি তখন চরম ক্লান্ত। জীবনের শেষ বিন্দু দিয়ে খাবি খাচ্ছে। মৎস্যজীবীরা পরম যত্নে ভারী শাবকটিকে জল থেকে টেনে নৌকায় তোলেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা শাবকটির তখন আর উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। সম্পূর্ণ নিঃশেষিত অবস্থায় ছোট্ট হাতিটি নৌকার পাটাতনে একপাশে লুটিয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

নৌকাটি তীরে পৌঁছানোর পর শাবকটিকে শুকনা ডাঙায় নামিয়ে দেওয়া হয়। সাময়িক বিশ্রাম পেয়ে সে কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু বন বিভাগের কর্মীদের মনে তখন নতুন এক শঙ্কার জন্ম নিয়েছে।

বৈকুণ্ঠপুরের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুদিত কুমার জানান, উদ্ধারকারীদের মনে ভয় ছিল যে মানুষের দীর্ঘক্ষণ স্পর্শের কারণে মা হাতিটি হয়তো তার সন্তানকে আর মেনে নেবে না। বন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় মানুষের গন্ধ পেলে মা শাবককে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু সব শঙ্কা আর নিয়মকে হার মানায় মাতৃস্নেহ। ডাঙায় নামার পর শাবকটি যখন গুটিগুটি পায়ে তার মায়ের দিকে এগিয়ে যায়, তখন এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। মা হাতিটি কোনো দ্বিধা ছাড়াই সন্তানকে পরম মমতায় কাছে টেনে নেয় এবং দুধ পান করায়। বর্তমানে মা ও শাবক উভয়েই বন বিভাগের নিরাপদ নজরদারিতে রয়েছে। এশিয়ান হাতি, চিতা বাঘ এবং নানা প্রজাতির পাখির জন্য বিখ্যাত বৈকুণ্ঠপুর বন বিভাগের এই ঘটনা বন্য প্রাণী সংরক্ষণে মানুষের ইতিবাচক ভূমিকার এক অনন্য উদাহরণ।

আরও পড়ুন

বন্য প্রাণীদের বিপদে মানুষের এমন মমত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসার ঘটনা মন ভালো করে দেয়। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল গত আগস্ট মাসের শেষের দিকে। উত্তর প্রদেশে নেপাল সীমান্তের কাছে কড়িয়ালা নদীতে প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়েছিল পাঁচটি হাতির একটি দল।

তিনটি পূর্ণবয়স্ক ও দুটি শাবক নিয়ে গঠিত দলটি যখন স্রোতের তোড়ে একটি ব্যারাজের দিকে ভেসে যাচ্ছিল, তখন কাতারনিয়াঘাট বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যের রেঞ্জ কর্মকর্তারা দ্রুত একটি সাহসী পদক্ষেপ নেন। তাঁরা স্রোতের গতি কমানোর জন্য ব্যারাজের একটি গেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। পানির তোড় কমে আসতেই পূর্ণবয়স্ক হাতিগুলো তাদের শরীর দিয়ে ঢাল তৈরি করে শাবকদের নিরাপদে তীরে তুলে আনে। এরপর পুরো দলটি ধীরে ধীরে বনের গভীরে মিলিয়ে যায়।

বন্য প্রাণী ও মানুষের এই যে সহাবস্থান, এই যে একে অপরকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা; এগুলোই হয়তো প্রমাণ করে, প্রকৃতির এই বিশাল ক্যানভাসে প্রতিটি প্রাণের স্পন্দনই সমান মূল্যবান।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

আরও পড়ুন